ফুটবলের মৃত্যুর দিন: এক অপূর্ণ সৌন্দর্যের বিলাপ
সালটা ১৯৮২, ৫ জুলাই।
গ্যালারিতে তখন হলুদ বসন্ত, সাম্বার উদ্দাম ছন্দে মেতে আছে হাজারো প্রাণ। মাঠে নামল এমন এক দল, যাদের পায়ে ফুটবল কেবল চামড়ার গোলক ছিল না, ছিল শিল্পের এক অধরা মায়া। টেলে সান্তানার সেই ব্রাজিল দল, যাদের বলা হয় ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দর, সবচেয়ে রোমান্টিক, অথচ সবচেয়ে বিষাদমাখা এক অধ্যায়। তারা মাঠে আসত না কোনো যুদ্ধ জয় করতে, তারা আসত সবুজ ক্যানভাসে পা দিয়ে কবিতা লিখতে।
কিন্তু কে জানত, সেদিন সারিয়ার মাঠে শুধু একটি ম্যাচের নিষ্পত্তি হবে না, বরং রচিত হবে সুন্দরতম এক স্বপ্নের নির্মম এক অপমৃত্যু!
সেই দলের প্রতিটি খেলোয়াড় ছিলেন এক একজন নিপুণ ভাস্কর। 'জোগা বোনিতো' বা সুন্দর ফুটবলের যে দর্শন পেলে-গারিঞ্চারা পৃথিবীতে রেখে গিয়েছিলেন, তার শেষ এবং সবচেয়ে নিখুঁত রূপায়ণ ছিল এই দলটি।
জিকো, যাকে বিশ্ব ভালোবেসে ডাকত 'সাদা পেলে' বলে; তার পায়ে বল গেলে মনে হতো যেন জাদুকরের হাতের কাঠি জীবন্ত হয়ে উঠেছে, প্রতিপক্ষের কঠিনতম রক্ষণভাগও তার এক চাউনিতে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ত। বলা হতো, তিনি জায়গা খুঁজতেন না, জায়গা তৈরি করতেন।
আর ছিলেন সক্রেতিস, মাথায় সাদা হেয়ারব্যান্ড, মুখে এলোমেলো দাড়ি, পেশায় চিকিৎসক আর মননে এক আপাদমস্তক দার্শনিক। তিনি মাঠে দৌড়াতেন না, যেন রাজকীয় চালে হেঁটে বেড়িয়ে পুরো মাঠের দখল নিতেন। তার পায়ের গোড়ালির আলতো ছোঁয়ায় বল যখন সতীর্থের কাছে যেত, গ্যালারির দর্শকরা যেন মুহূর্তের জন্য নিশ্বাস নিতে ভুলে যেত।
মাঝমাঠের আরেক সম্রাট ছিলেন ফ্যালকাও, যাকে বলা হতো 'রোমের রাজা'। যেন একজন কবি, যার প্রতিটি স্পর্শে ফুটে উঠত সঙ্গীত। তিনি সময়কে ধীরে করতেন।
চারপাশে ঝড় উঠলেও তার পায়ে বল মানে এক অদ্ভুত শান্তি, একটি নিঃশব্দ স্রোত, যা নিজের মতো বয়ে যায়। যখন তিনি শট নিতেন,
সেই নীরব কবি হঠাৎ বজ্র হয়ে উঠতেন।
এদার, চেরেজো -প্রত্যেকেই ছিলেন এক একটি সিম্ফনির অবিচ্ছেদ্য অংশ।
তারা বিশ্বাস করতেন, গোল করাটা ফুটবলের উদ্দেশ্য হতে পারে, কিন্তু আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে সেই গোল তৈরির শৈল্পিক পথচলায়। তারা চাইতেন প্রতিপক্ষকে শুধু হারাতে নয়, জাদুতে মুগ্ধ করে পরাস্ত করতে।
কিন্তু বিধিলিপি বড়ই অদ্ভুত আর নিষ্ঠুর। সেমিফাইনালে ওঠার সেই অঘোষিত ফাইনালে তাদের সামনে এসে দাঁড়াল ইতালি।
একদিকে শিল্পের পূজারি ব্রাজিল, অন্যদিকে জমাট রক্ষণ আর হিসেবি ফুটবলের অনুসারী ইতালি।
ব্রাজিলের দরকার ছিল কেবল একটি ড্র। কিন্তু ইতালির নীল জার্সিতে সেদিন মাঠে নেমেছিলেন পাওলো রসি নামের এক নিঃসঙ্গ এবং শীতল ঘাতক। ম্যাচ পাতানোর কলঙ্ক মাথায় নিয়ে নির্বাসন কাটিয়ে ফেরা রসি পুরো টুর্নামেন্টে ছিলেন নিজের ছায়ায় বন্দি। কিন্তু সারিয়ার সেই তপ্ত বিকেলে তিনি যেন সাক্ষাৎ যমদূত হয়ে আবির্ভূত হলেন ব্রাজিলিয়ান শিল্পের সামনে।
ম্যাচের মাত্র পাঁচ মিনিটের মাথায় ব্রাজিলের রক্ষণের সামান্য ভুলে বল পেয়ে গেলেন রসি। চোখের পলকে, কোনো শিল্পের ধার না ধেরে, এক নিরেট শটে বল জড়িয়ে দিলেন জালে। স্তব্ধ হয়ে গেল হলুদ গ্যালারি।
তবে ব্রাজিল তো সহজে হার মানার পাত্র নয়। গোল খেয়ে তারা যেন আহত বাঘের মতো ফুঁসে উঠল, কিন্তু তাদের গর্জনে ছিল না কোনো রুক্ষতা, ছিল কেবল শৈল্পিক উন্মাদনা। বারো মিনিট পরেই জিকোর পা থেকে জন্ম নিল এক অবিস্মরণীয় মুহূর্ত। ইতালির তিন-চারজন খেলোয়াড়কে বোকা বানিয়ে তিনি বল বাড়ালেন সক্রেতিসের দিকে। দিনো জফ নামক ইতালিয়ান প্রাচীরকে ফাঁকি দিয়ে, প্রায় অসম্ভব এক কোণ থেকে বল জালে জড়ালেন সক্রেতিস।
স্কোর ১-১। গ্যালারিতে আবার সাম্বার মাতাল সুর।
কিন্তু সান্তানার এই রোমান্টিক দলটির এক বড় দুর্বলতা ছিল, তারা রক্ষণাত্মক কৌশল বুঝত না, তারা কেবল জানত ফুল ফোটাতে। ম্যাচের পঁচিশ মিনিটে আবার সেই রসি। আবার ব্রাজিলের রক্ষণের এক ক্ষমার অযোগ্য ভুল, আর বল ফের জালে। ২-১ ব্যবধানে পিছিয়ে থেকে প্রথমার্ধ শেষ করল শিল্পের পূজারিরা।
দ্বিতীয়ার্ধে মাঠে নেমে ব্রাজিল যেন শিল্পের চূড়ান্ত প্রদর্শনী শুরু করল। ইতালির পেনাল্টি বক্সে একের পর এক ঢেউ আছড়ে পড়তে লাগল। ৬৮ মিনিটের মাথায় ফ্যালকাওয়ের পা থেকে এল সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত। ডি-বক্সের ঠিক বাইরে থেকে নেওয়া তাঁর এক বুলেট গতির শট ইতালির জাল ছিন্নভিন্ন করে দিল। ফ্যালকাওয়ের সেই বুনো উদযাপন, দুই হাত পাখির ডানার মতো প্রসারিত করে, কপালের শিরা ফুলিয়ে চিৎকার করে ছুটে চলা, ফুটবল রোমান্টিকদের হৃদয়ে আজও তা এক অমর ভাস্কর্য হয়ে খোদাই করা আছে।
স্কোর ২-২। এই ফলাফল ধরে রাখলেই ব্রাজিল চলে যাবে পরের পর্বে।
কিন্তু ওই যে, তারা তো হিসাব কষে বাঁচার জন্য মাঠে নামেনি! সান্তানার দল রক্ষণ জমাট করার বদলে চাইল আরও গোল করতে, আরও সৌন্দর্য ছড়াতে। আর এই অতি-রোমান্টিসিজমই তাদের ডেকে আনল চিরস্থায়ী বিষাদ।
ম্যাচের ৭৪ মিনিটে একটি কর্নারের জটলা থেকে বল পেয়ে গেলেন সেই পাওলো রসি। নিঃসঙ্গ শিকারি পূর্ণ করলেন তার হ্যাটট্রিক, আর সেই সাথে কফিনের শেষ পেরেকটি ঠুকে দিলেন ব্রাজিলের অমরত্বের স্বপ্নে।
৩-২ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ার পর ব্রাজিল মরিয়া হয়ে চেষ্টা করেছে ঠিকই, কিন্তু চল্লিশ বছর বয়সী দিনো জফের বিশ্বস্ত হাত আর ইতালির জমাট রক্ষণের কাছে সেদিন পরাস্ত হতে হয় সৌন্দর্যকে।
রেফারির শেষ বাঁশি যখন বাজল, সারিয়া স্টেডিয়ামের সবুজ ঘাস যেন কান্নায় ভারী হয়ে উঠল। ড্রেসিংরুমে ফিরে ব্রাজিলিয়ান ফুটবলাররা ছিলেন বাকরুদ্ধ। কারো মুখে কোনো কথা নেই, কেবল শূন্য দৃষ্টি। সেই নিস্তব্ধতা ভেঙে সক্রেতিস সেদিন এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেছিলেন, 'আজ ফুটবলের মৃত্যু হলো।'
হ্যাঁ, সেদিন সারিয়ার মাঠে সত্যিই ফুটবলের মৃত্যু হয়েছিল। জিকো, সক্রেতিস, ফ্যালকাওদের সেই হার বিশ্বকে শিখিয়েছিল এক নির্মম সত্য, কেবল সুন্দর হলেই জেতা যায় না, বেঁচে থাকার জন্য রুক্ষ এবং হিসেবি হতে হয়। সেই ম্যাচের পর থেকে ফুটবল ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছে ট্যাকটিক্স আর পেশিশক্তির খেলায়।
কিন্তু ১৯৮২ সালের সেই ব্রাজিল দল কোনো সোনালি ট্রফি না জিতলেও, তারা জয় করে নিয়েছিল অনন্তকালের ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়। বর্তমান সময়ের কোনো দর্শক যখন চোখ বন্ধ করে সেই ম্যাচের কথা ভাবে, তাদের চোখে ভাসে না কোনো পরাজয়ের গ্লানি, ভাসে কেবল শিল্পের এক অপূর্ব ক্যানভাস, যা অকালে মুছে গিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু রেখে গিয়েছিল সাহিত্যের ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দর, সবচেয়ে কাব্যিক এক ট্র্যাজেডি।