সন্তান কি অট্রোভার্ট, মিলিয়ে নিন বৈশিষ্ট্য

রবিউল কমল
রবিউল কমল

সব শিশু এক রকম নয়। কেউ খুব আড্ডা দিতে ভালোবাসে, আবার কেউ একটু চুপচাপ থাকে। কেউ সবার সঙ্গে খেলতে পছন্দ করে, আবার কেউ একজন প্রিয় বন্ধুর সঙ্গেই বেশি সময় কাটাতে চায়। কিন্তু কিছু শিশু আছে, যারা কখনো খুব প্রাণবন্ত থাকে, আবার কিছুক্ষণ পরই একা থাকতে চায়। মনোবিজ্ঞানীরা এমন শিশুদের ‘অট্রোভার্ট’ বলে থাকেন।

অট্রোভার্ট শিশুরা পুরোপুরি অন্তর্মুখী নয়, আবার পুরোপুরি বহির্মুখীও নয়। কখনো তারা বন্ধুদের সঙ্গে মজা করতে পারে, গল্প করতে পারে, আড্ডার প্রাণ হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু পরে আবার নিজের ঘরে গিয়ে চুপচাপ বই পড়তে বা ছবি আঁকতে ভালোবাসে। তাই অনেক সময় বড়রা বুঝতে পারেন না, আসলে তারা কী চায়?

এ ধরনের শিশুরা অনেক সময় এমন আচরণ করে, যা দেখে অন্যরা একটু অবাক হয়ে যায়। কখনো তারা খুব মিশুক, আবার কখনো একদম নিরিবিলি। কিন্তু এতে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। তাদের ভাবনা ও অনুভূতির ধরন একটু আলাদা। যদি বাবা-মা, শিক্ষক বা বড়রা বিষয়টি বুঝতে পারেন, তাহলে এ ধরনের শিশুরা আরও স্বস্তিতে বড় হতে পারে।

অট্রোভার্ট মানে কী?

যুক্তরাষ্ট্রের মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ লোরেন মুরহেড বলেন, অট্রোভার্ট ও অ্যাম্বিভার্ট এক নয়।

অ্যাম্বিভার্ট শিশুরা একা থাকতেও পছন্দ করে, আবার বন্ধুদের সঙ্গেও আনন্দ পায়। কিন্তু অট্রোভার্ট শিশুরা অনেক সময় অনেকের মধ্যে নিজেকে একটু আলাদা বা অন্যরকম মনে করে। স্প্যানিশ ‘অট্রো’ শব্দটির মানে হলো ‘অন্য’।

প্রতীকী ছবি, সংগৃহীত
প্রতীকী ছবি, সংগৃহীত

তবে এর মানে এই নয় যে, তারা কারও সঙ্গে মিশতে পারে না। বরং তারা খুব অনুভূতিশীল ও আবেগপ্রবণ হয়। তারা এমন বন্ধু ও সম্পর্ক পছন্দ করে, যেখানে সত্যিকারের বন্ধুত্ব ও বোঝাপড়া থাকে।

অট্রোভার্ট শিশুরা কেমন হয়

কৈশোর মনোবিজ্ঞানী এবং প্যারেন্টিং টিনস উইদ ড. ক্যাম পডকাস্টের উপস্থাপক ক্যমেরন কাসওয়েল বলেন, অট্রোভার্ট শিশুরা সাধারণত অনেকের সঙ্গে মেশার চেয়ে একজন বা দুজন ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে বেশি পছন্দ করে। তারা হয়তো অনেকের সঙ্গে মিশবে না। কিন্তু একজন ভালো বন্ধুকে বাসায় ডেকে গল্প করতে, সিনেমা দেখতে বা একসঙ্গে সময় কাটাতে খুব ভালোবাসবে।
স্কুলেও তারা অনেক সময় পুরো ক্লাসের সবার সঙ্গে না মিশে একজন শিক্ষক বা কয়েকজন বন্ধুর কাছাকাছি থাকতে স্বস্তি পায়। খুব বেশি শব্দ বা ভিড় তাদের পছন্দ না।

বাসায় ফিরে তারা একটু একা থাকতে চাইতে পারে। কেউ বই পড়ে, কেউ ছবি আঁকে, কেউ গান শোনে, আবার কেউ নিজের পছন্দের খেলনা বা কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে। এটা কিন্তু রাগ করে দূরে সরে যাওয়া নয়। এভাবেই তারা মানসিক শান্তি পায়।

পাড়ায় খেলতেও তারা একটু আলাদা হতে পারে। অন্যদের দেখে হাসবে, কথা বলবে, কিন্তু অনেকের সঙ্গে বা বড় দলে খেলতে সবসময় স্বস্তি নাও পেতে পারে। বরং একজন প্রিয় বন্ধুর সঙ্গে খেলতে তারা বেশি ভালোবাসে।

প্রতীকী ছবি, সংগৃহীত
প্রতীকী ছবি, সংগৃহীত

অট্রোভার্ট শিশুকে কীভাবে সাহায্য করবেন?

প্রতিটি শিশু নিজের মতো করে বড় হয়। তাই সবাইকে একই রকম হতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। আপনার শিশু যেমন, তাকে তেমনভাবেই ভালোবাসুন।

মনোবিজ্ঞানী অ্যানি জোসেপসন বলেন, ‘সব শিশুরই যে সবার সঙ্গে মিশে যেতে হবে, এমন নয়। তবুও তারা খুব সুন্দর সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে। তাই তাদের অনুভূতির মূল্য দিন।’

তার ভাষ্য, কিছু শিশু একা একা কাজ করতে পছন্দ করে। কেউ আবার নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হতে বাবা-মায়ের সাহায্য চায়। এটা খুব স্বাভাবিক।

যদি আপনার শিশু বলে, ‘আমি একটু একা থাকতে চাই’, তাহলে তার কথা শুনুন। তবে তাকে ধীরে ধীরে অন্যদের সঙ্গে মিশতেও উৎসাহ দিন।

প্রতীকী ছবি, সংগৃহীত
প্রতীকী ছবি, সংগৃহীত

অট্রোভার্ট হওয়া কোনো সমস্যা নয়। এটা কেবল এক ধরনের স্বভাব।

তাই শিশুকে বলুন, ‘তুমি যেমন, তেমনভাবেই সুন্দর’। তাহলে সে নিজের ওপর আত্মবিশ্বাস পাবে।

শিশু যদি একা বই পড়ে, ছবি আঁকে বা খেলতে ভালোবাসে, তাহলে ভাববেন না সে কষ্টে আছে। অনেক অট্রোভার্ট শিশু একা নিজের পছন্দের কাজ করেই আনন্দ পায়।

তবে যদি সে সবসময় মন খারাপ করে থাকে, বন্ধুদের এড়িয়ে চলে বা আগের পছন্দের কাজগুলো আর করতে না চায়, তখন বিষয়টি খেয়াল করা দরকার।

স্কুল থেকে ফিরে অনেক অট্রোভার্ট শিশু একটু শান্ত থাকতে চায়। তাই বাসায় ফিরেই অনেক প্রশ্ন বা কাজের চাপ না দেওয়াই ভালো। তাকে একটু বিশ্রাম নিতে দিন। কিছুক্ষণ পর দেখবেন, সে আগের চেয়ে অনেক বেশি হাসিখুশি আর স্বাভাবিক হয়ে গেছে।

প্রতীকী ছবি, সংগৃহীত
প্রতীকী ছবি, সংগৃহীত

শিশুর সঙ্গে একান্ত সময় কাটানো খুব দরকার। তখন তারা সহজে মনের কথা বলতে পারে। গল্প করতে করতে হাঁটা, একসঙ্গে রান্না করা বা গাড়িতে বসে কথা বলা—এসব সময় শিশুরা সবচেয়ে বেশি মন খুলে কথা বলে।

মূল কথা হলো, সব শিশুর অনেক বন্ধু থাকতে হবে, এমন নয়। একজন সত্যিকারের ভালো বন্ধু থাকাও অনেক বড় বিষয়। অট্রোভার্ট শিশুরা সাধারণত গভীরভাবে চিন্তা করতে পারে, মন দিয়ে কাজ করতে পারে এবং বন্ধু হিসেবে খুব আন্তরিক হয়।

তাই মনে রাখবেন, আপনার শিশুর শান্ত স্বভাব কোনো দুর্বলতা নয়। বরং সেটাই তার সবচেয়ে বড় শক্তি। সুতরাং এটা নিয়ে বিব্রত হবেন না। তাকে তার মতো করে বেড়ে উঠতে দিন।