বাবা-মায়ের মোবাইল আসক্তি সন্তানের ওপর যেসব প্রভাব ফেলে

স্টার অনলাইন ডেস্ক

স্মার্টফোন এখন আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। অফিসের কাজ, ব্যাংকিং, চিকিৎসকের অ্যাপয়েন্টমেন্ট, কেনাকাটা কিংবা প্রিয়জনের সঙ্গে যোগাযোগ—সবই এখন হাতের মুঠোয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সন্তান যখন আমাদের সামনে থাকে, তখন বারবার ফোনে ডুবে যাওয়ার মাধ্যমে আমরা তাকে কী বার্তা দিচ্ছি? এতে কি তার মানসিক বিকাশে প্রভাব পড়ছে? কিংবা তার নিরাপত্তা কি ঝুঁকির মুখে পড়ছে?

মনোবিজ্ঞানী ও শিশু বিকাশ বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব প্রশ্নের উত্তর আমাদের প্রত্যেক অভিভাবকের জানা জরুরি।

সন্তান কী ভাবে

শিশু শিক্ষা নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান সহজের হাসিব সাইফ বলেন, শিশুর বেড়ে ওঠার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলোর একটি হলো বাবা-মায়ের মনোযোগ। ছোট শিশুরা কথা, হাসি, চোখের দৃষ্টি এবং মুখের অভিব্যক্তির মাধ্যমে পৃথিবীকে চিনতে শেখে। তারা নিরাপত্তা, ভালোবাসা ও আত্মবিশ্বাস পায় বাবা-মায়ের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ থেকেই।

কিন্তু যখন বাবা-মা বারবার ফোনের দিকে তাকান, তখন শিশুরা ভাবতে পারে, ফোনটাই যেন তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
দীর্ঘদিন এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে শিশুর মধ্যে আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি কিংবা মনোযোগ আকর্ষণের জন্য অস্বাভাবিক আচরণও দেখা দিতে পারে বলেন হাসিব সাইফ।

তিনি পরামর্শ দেন, তাই দিনের কিছু সময় ফোন পুরোপুরি দূরে রাখা ভালো। যেমন খেলার সময়, ঘুমানোর আগে কিংবা পরিবারের সঙ্গে গল্প করার সময়। কারণ এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই সন্তানের মনে গভীরভাবে প্রভাব ফেলে।

ছবি: সংগৃহীত
শিশুর বেড়ে ওঠার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলোর একটি হলো বাবা-মায়ের মনোযোগ। 

ফোন ব্যবহার লুকিয়ে নয়, বুঝিয়ে

অনেক বাবা-মা সন্তান কাছে এলে দ্রুত ফোন লুকিয়ে ফেলেন বা বলেন, ‘কই কিছু না তো!’

শিশুবিশেষজ্ঞ সুমাইয়া মিম মনে করেন, এটি খুব কার্যকর পদ্ধতি নয়। বরং শিশুকে সহজ ভাষায় বলা যেতে পারে, ‘আমি এখন অফিসের জরুরি মেসেজের উত্তর দিচ্ছি’ অথবা ‘দাদু ওষুধ খেয়েছে কিনা খবর নিচ্ছি’।

এতে শিশু বুঝতে শেখে যে, ফোন কেবল বিনোদনের বস্তু নয়; প্রয়োজনীয় কাজের জন্যও ব্যবহার করা হয়। একই সঙ্গে প্রযুক্তি নিয়ে পরিবারের মধ্যে খোলামেলা আলোচনার পরিবেশ তৈরি হয়।

প্রশ্ন যখন নিরাপত্তার

মোবাইল ফোনে ব্যস্ত থাকার সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলোর একটি হলো শিশুর নিরাপত্তা।

সুমাইয়া মিম বলেন, পার্কে খেলতে গিয়ে, রাস্তা পার হওয়ার সময় কিংবা ঘরের ভেতরেও কয়েক সেকেন্ডের অসাবধানতা বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। শিশুদের আচরণ খুব দ্রুত বদলে যায়। তাই তাদের দেখভালের সময় ফোনে ডুবে থাকা কখনোই নিরাপদ নয়।

তার ভাষ্য, অভিভাবকত্বের দায়িত্ব থেকে কয়েক মিনিটের জন্যও ছুটি নেওয়া যায় না। সন্তানের পাশে থাকলে দৃষ্টি ও মনোযোগ দুটোই যেন তার দিকেই থাকে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

ছবি: সংগৃহীত
শিশুরা আমাদের কথা যতটা শোনে, তার চেয়েও বেশি দেখে।

শিশুরা দেখে, তারপর অনুকরণ করে

শিশুরা আমাদের কথা যতটা শোনে, তার চেয়েও বেশি দেখে। যদি তারা দেখে মন খারাপ হলেই বাবা বা মা ফোন হাতে নেন, একা লাগলেই সোশ্যাল মিডিয়ায় সময় কাটান, অথবা অবসর পেলেই স্ক্রল করেন—তাহলে তাদের মধ্যেও একই অভ্যাস গড়ে উঠতে পারে।

হাসিব সাইফ বলেন, বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর অ্যালগরিদম এমনভাবে তৈরি, যেন মানুষ দীর্ঘ সময় সেখানে আটকে থাকে। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের পক্ষেই যেখানে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন, সেখানে একটি শিশুর জন্য তা আরও বেশি চ্যালেঞ্জিং।

তাই শিশুর হাতে ফোন দেওয়ার আগেই নিজের ফোন ব্যবহারের অভ্যাস ঠিক করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

প্রযুক্তি শত্রু নয়

ফোন ব্যবহার মানেই খারাপ, এমন ধারণাও সঠিক নয়।

ফোন আমাদের জীবনকে সহজ করেছে। প্রয়োজনীয় তথ্য জানা, চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ, শিক্ষামূলক ভিডিও দেখা, নতুন কিছু শেখা কিংবা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ ইত্যাদি স্মার্টফোনের ইতিবাচক ব্যবহারের উদাহরণ।

সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন প্রয়োজন শেষ হওয়ার পরও আমরা উদ্দেশ্যহীনভাবে স্ক্রল করতে থাকি।

সুমাইয়া মিম বলেন, কিছু বিষয় সবসময় মাথায় রাখা দরকার। যেমন—এখন কেন ফোন ব্যবহার করছি, এখন ফোন ব্যবহার করাটা দরকার কি না কিংবা সন্তান এই মুহূর্তে মনোযোগ চাইছে কি না।

এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই আমাদের ফোন ব্যবহারের অভ্যাস বদলাতে সাহায্য করবে বলে জানান তিনি।

ছবি: সংগৃহীত
সন্তান বেড়ে ওঠে কেবল আমাদের শেখানো কথায় নয়, বরং তারা বড় হয় আমাদের প্রতিদিনের আচরণ দেখে।

সুমাইয়া মিম পরামর্শ দেন, এছাড়া কিছু সহজ অভ্যাসের পরিবর্তন আনা যেতে পারে। যেমন—পার্কে বা খেলার মাঠে গেলে ফোন পকেটে রাখা, অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা, খাওয়ার সময়, খেলার সময় ও পড়ার সময় ফোন ব্যবহার এড়িয়ে চলা।

তবে খুব প্রয়োজন হলে সন্তানকে বুঝিয়ে ফোন ব্যবহার করা এবং প্রতিদিন কিছু সময় পুরো পরিবার মিলে ফোনবিহীন কিছু মুহূর্ত কাটানো যেতে পারে জানান তিনি।

সন্তান বেড়ে ওঠে কেবল আমাদের শেখানো কথায় নয়, বরং তারা বড় হয় আমাদের প্রতিদিনের আচরণ দেখেও। তাই আমরা যদি চাই তারা প্রযুক্তিকে সচেতনভাবে ব্যবহার করুক, তাহলে সেই শিক্ষার শুরু হতে হবে পরিবার থেকেই।