যেসব বৈশিষ্ট্য দেখে বুঝবেন সন্তান ‘অ্যাম্বিভার্ট’

রবিউল কমল
রবিউল কমল

কখনো সে বন্ধুদের আড্ডার প্রাণ। আবার কখনো তার দিনের পর দিন কারও ফোন ধরতে ইচ্ছে করে না। কখনো নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হতে ভালো লাগে, আবার কখনো নিজের ঘর, একটি বই ও এক চা বা কাপ কফিই যেন পুরো পৃথিবী। যদি এমনটা তার ক্ষেত্রে ঘটে, তাহলে সে অন্তর্মুখী বা বহির্মুখী কোনোটিই নয়। সে হতে পারে একজন ‘অ্যাম্বিভার্ট’।

আমরা সাধারণত মানুষকে দুই ভাগে ভাগ করি—অন্তর্মুখী (ইন্ট্রোভার্ট) ও বহির্মুখী (এক্সট্রোভার্ট)। কিন্তু বাস্তবে অনেকে এই দুই বৈশিষ্ট্যের মাঝামাঝি অবস্থান করেন। পরিবেশ, পরিস্থিতি কিংবা মানসিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে কখনো তারা অন্তর্মুখী, আবার কখনো বহির্মুখী হয়ে ওঠে। মনোবিজ্ঞানে এই ধরনের ব্যক্তিত্বকে বলা হয় অ্যাম্বিভার্ট।

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

এর বাইরে আরেক ধরনের মানুষ আছে, যাদের বলা হয় ‘অট্রোভার্ট’। তবে ‘অট্রোভার্ট’ ও অ্যাম্বিভার্ট এক নয়। অট্রোভার্ট শিশুরা অনেক সময় অনেকের মধ্যে নিজেকে একটু আলাদা বা অন্যরকম মনে করে। স্প্যানিশ ‘অট্রো’ শব্দটির মানে হলো ‘অন্য’।

শিশু বিশেষজ্ঞ মনোবিজ্ঞানী সুমাইয়া মিম বলেন, অ্যাম্বিভার্টদের বোঝা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। একদিন তারা প্রাণ খুলে গল্প করে, আরেকদিন চুপচাপ নিজের জগতে ডুবে থাকে। কেউ কেউ তাদের অহংকারী, অমিশুক বা উদাসীন মনে করে। অথচ বাস্তবে তারা নিজের মনোবল ও মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করে।

তিনি আরও বলেন, অ্যাম্বিভার্টদের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো তারা মানুষকে ভালোবাসে, আবার নির্জনতাকেও পছন্দ করে।
অ্যাম্বিভার্টরা কখনো বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, ভ্রমণ কিংবা পার্টিতে ভীষণ আনন্দ করে। আবার হঠাৎ ফোন বন্ধ করে বই, গান বা নিজের চিন্তার ভুবনে হারিয়ে যেতে চায়। সেই সময় তারা কারও সঙ্গে কথা বলতে চায় না, কোনো পরিকল্পনাও রাখতে চায় না। এটা রাগ নয়, অভিমানও নয়। বরং এটাকে তারা নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার সময় মনে করে।

চিন্তার জগতে ডুবে থাকা

অ্যাম্বিভার্টদের মস্তিষ্ক যেন কখনোই বিশ্রাম নেয় না। তারা প্রায় সব সময়ই কিছু না কিছু ভাবে। গতকাল কী হলো, আগামীকাল কী হবে, কোনো কথোপকথনে ভুল কিছু বলে ফেলল কি না, ভবিষ্যতের পরিকল্পনা, এমন অসংখ্য ভাবনা তাদের মাথায় ঘুরতে থাকে।

শিশুশিখন প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ করা হাসিব সাইফ বলেন, অনেক সময় তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা চুপচাপ বসে থাকে। বাইরে থেকে দেখে মনে হতে পারে, সে কিছুই করছে না। অথচ ভেতরে ভেতরে তার মধ্যে চিন্তার বিশাল জগত কাজ করে।

সহজে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না

‘বাইরে যাব, না কি বাসায় থাকব?’

হাসিব সাইফ বলেন, অন্যদের কাছে এই প্রশ্নটি খুব সহজ মনে হলেও একজন অ্যাম্বিভার্টের জন্য ছোটখাটো মানসিক লড়াই। কারণ, তাদের ভেতরে একই সঙ্গে দুই ধরনের প্রবণতা কাজ করে। একদিকে মানুষের সঙ্গে মিশতে ইচ্ছে করে, অন্যদিকে একা থাকার আকাঙ্ক্ষাও টানে। ফলে সিদ্ধান্ত নিতে সময় লাগে, আর সেই সিদ্ধান্তই অনেক সময় মানসিক ক্লান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

একা থাকতে ভালো লাগে, তবে একাকীত্ব নয়

অ্যাম্বিভার্টরা একা থাকতে পারে, কিন্তু একাকীত্ব পছন্দ করে না। তারা নিজের সময়কে ভালোবাসে। একটি বই, সিনেমা, প্রিয় গান কিংবা নিজের কোনো শখ নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিতে পারে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, তারা মানুষকে অপছন্দ করে।

সুমাইয়া মিম বলেন, বরং যখন প্রয়োজন হয়, তখন আবার বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে বা নতুন কোথাও ঘুরতে যাওয়ার ইচ্ছেও জাগে। নতুন জায়গা দেখতে কিংবা নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হতে তাদের আপত্তি নেই।

সুমাইয়া মিমের ভাষায়, প্রথমবার কোনো অচেনা পরিবেশে গেলে একজন পরিচিত মানুষ পাশে থাকলে তারা অনেক স্বস্তি পায়। অন্যথায় সাধারণত ভিড়ের এক কোণে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে এবং কেউ কথা না বললে নিজেরা সহজে আলাপ শুরু করে না।

তারা দারুণ শ্রোতা

অ্যাম্বিভার্টদের সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি হলো, সবার কথা শোনে।

হাসিব সাইফ বলেন, তারা নিজের চেয়ে অন্যের কথা শুনতেই বেশি পছন্দ করে। কেউ মন খুলে কথা বলতে চাইলে ধৈর্য নিয়ে শোনে, সঙ্গে সঙ্গে বিচার না করে বোঝার চেষ্টা করে।

তাই অনেকেই নিজের ব্যক্তিগত সমস্যার কথা একজন অ্যাম্বিভার্ট বন্ধুকেই আগে বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে বলে জানান তিনি।

What the Heck Is an Introvert, Anyway? Am I One?
ছবি: সংগৃহীত

আড্ডায় নীরব, ব্যক্তিগত আলাপে প্রাণবন্ত

দশজনের আড্ডায় তারা হয়তো খুব বেশি কথা বলে না।

সুমাইয়া মিম বলেন, অ্যাম্বিভার্টরা একজন ঘনিষ্ঠ মানুষের সঙ্গে একান্তে বসলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করতে পারে। ব্যক্তিগত আলোচনা, জীবন, বই, স্বপ্ন, অনুভূতি কিংবা ভবিষ্যৎ এসব বিষয় নিয়ে কথা বলতে তারা বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।

তবে ছোটখাটো সৌজন্যমূলক আলাপ তাদের কাছে খুব একটা আকর্ষণীয় নয় বলে জানান তিনি।

সত্যিকারের বন্ধুত্বকে গুরুত্ব দেয়

অ্যাম্বিভার্টরা অসংখ্য পরিচিত মানুষ নয়, বরং অল্প কয়েকজন সত্যিকারের বন্ধুকে গুরুত্ব দেয়।

মিম জানান, তারা বন্ধুদের সঙ্গে সবসময় যোগাযোগ করার বাধ্যবাধকতার মধ্যে থাকতে চায় না। তবে প্রয়োজনের সময় একজন আরেকজনের পাশে থাকে। সম্পর্ক ধরে রাখতে অতিরিক্ত সামাজিকতা তাদের একেবারেই অপছন্দ।

এজন্য অনেকে ভাবে, বিয়ের অনুষ্ঠানে তো খুব আনন্দ করছিল! তাহলে পরদিন ফোন ধরছে না কেন?

আসলে সামাজিক পরিবেশে দীর্ঘ সময় কাটানোর পর অ্যাম্বিভার্টদের মানসিক শক্তি অনেকটা কমে যায়। তাই তারা কিছুটা সময় নিজের মতো থাকতে চায়। এ সময় তারা কারও ওপর রাগ করে না, কাউকে এড়িয়ে চলতেও চায় না। তারা ভাবে, এটি মনোবল ফিরে পাওয়ার একটি উপায়।

Surviving and Thriving as an Introvert at your job
ছবি: সংগৃহীত

সহমর্মী

অ্যাম্বিভার্টরা সাধারণত কোনো বিষয়কে একপেশেভাবে দেখে না।

সুমাইয়া মিম বলেন, কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বা কাউকে বিচার করার আগে তারা বিভিন্ন দিক বিবেচনা করে। অন্যের জায়গায় নিজেকে কল্পনা করার ক্ষমতা তাদের তুলনামূলক বেশি থাকে। এ কারণেই তারা অনেক সময় ভালো বন্ধু, দক্ষ সহকর্মী এবং ভালো শ্রোতা হয়ে ওঠে।

আপনার সন্তানের মধ্যে এ ধরনের বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে। হতে পারে সে অ্যাম্বিভার্ট। তবে চিন্তার কোনো কারণ নেই। কারণ মনোবিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবীর অনেক মানুষই পুরোপুরি অন্তর্মুখী বা পুরোপুরি বহির্মুখী নয়। অনেক মানুষ এই দুই বৈশিষ্ট্যের মাঝামাঝি অবস্থান করে। তাই একদিন প্রাণবন্ত, আরেকদিন নিরিবিলি থাকতে চাওয়াটা অস্বাভাবিক নয়।

তারা পরামর্শ দেন সন্তানকে কোনো নির্দিষ্ট ছকে ফেলার প্রয়োজন নেই। সে যদি কখনো মানুষের ভিড়ে আনন্দ পায়, আবার কখনো নিজের জগতে শান্তি খুঁজে পায়, তাহলে সেটিই তার স্বাভাবিক ব্যক্তিত্ব।