শিশুকে সঞ্চয় শেখানোর সহজ উপায় ‘তিন বয়াম পদ্ধতি’
‘মা, ওই খেলনাটা কিনে দাও না!’
‘বাবা, আমার একটা নতুন ফুটবল চাই!’
এ ধরনের আবদার প্রায় সব শিশুই করে। আর বেশিরভাগ বাবা-মা কখনো হয়তো কিনে দেন। কেউ কেউ আবার না করেন। কিন্তু খুব কম পরিবারই সন্তানের সঙ্গে টাকা নিয়ে কথা বলে। যেমন—টাকা কী, কোথা থেকে আসে, কেন জমাতে হয়, আর কেন কিছু টাকা অন্যের জন্য রাখা উচিত।
আসলে আর্থিক গুরুত্ব শেখাতে বিশেষ কোনো ক্লাসরুমের দরকার নেই। দরকার নেই কঠিন কোনো নিয়মেরও। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, তিনটি সাধারণ কাচের পাত্র শিশুকে টাকার সঠিক ব্যবহার শেখানোর জন্য যথেষ্ট। এই পদ্ধতির নাম ‘থ্রি জার মেথড’ বা ‘তিন বয়াম’ পদ্ধতি।
কবে, কোথায় এই ধারণার শুরু হয়েছিলন তা জানা যায় না। তবে গল্পটা শুরু হয়েছিল এক ছোট্ট মেয়েকে দিয়ে। একদিন নয় বছরের মেয়েটি তার বাবা-মায়ের কাছে হাতখরচ চাইল। বাবা চাইলে তাকে কিছু টাকা দিয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি ভাবলেন, শুধু টাকা দিলেই হবে না, মেয়েটিকে টাকার গুরুত্ব শেখাতে হবে। তাই পরিবারের সবাই মিলে বসে একটি সহজ পরিকল্পনা করলেন।
মেয়েটি বয়স অনুযায়ী কিছু ছোটখাটো কাজ করবে। যেমন নিজের ঘর গুছিয়ে রাখা, গাছে পানি দেওয়া বা অন্য কিছু দায়িত্ব পালন করা। বিনিময়ে সে প্রতি সপ্তাহে কিছু টাকা পাবে। এরপর সেই টাকাগুলো রাখার জন্য আনা হলো তিনটি কাচের পাত্র। প্রতিটি পাত্রের আলাদা কাজ। সেই আলাদা কাজগুলো নিয়েই এই লেখা।
থ্রি জার মেথড
এই পদ্ধতিটি খুব সহজ। শিশুর জন্য তিনটি স্বচ্ছ কাচের জার বা পাত্র নিন। প্রতিটির ওপর আলাদা নাম লিখে দিন—খরচের জার, সঞ্চয়ের জার এবং দানের জার।
খরচের জার
এটি হবে শিশুর আনন্দের জার। নতুন খেলনা, আইসক্রিম, গল্পের বই, সিনেমার টিকিট বা ছোটখাটো যেকোনো ইচ্ছার জন্য সে এখানকার টাকা ব্যবহার করতে পারবে।
এই জার শিশুকে শেখাবে আয়ের টাকা সীমিত ও খরচ করলে শেষ হয়ে যায়। তাই একটি খেলনা কিনলে অন্যটি কেনার জন্য আরও অপেক্ষা করতে হবে।
ধীরে ধীরে শিশু তার দরকারি খরচ করতে শেখে। এভাবেই তার মধ্যে সচেতনভাবে খরচ করার অভ্যাস গড়ে ওঠে।

সঞ্চয়ের জার
এই জারটি শিশুর ভবিষ্যতের জন্য। ধরা যাক, সে একটি দামি সাইকেল কিনতে চায়। কিন্তু আজই সেটা কেনার মতো টাকা নেই।
তাহলে কী করবে?
অপেক্ষা করবে, টাকা জমাবে, তারপর ধীরে ধীরে লক্ষ্যের দিকে এগোবে।
এই জার শিশুদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি শিক্ষা দেয়। আর তা হলো চাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সবকিছু পাওয়া যায় না। কিছু জিনিস পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হয়, দীর্ঘদিন ধরে টাকা জমাতে হয়।
অনেক পরিবার এই জার ভরে গেলে শিশুকে নিয়ে ব্যাংকে যায়। সেখানে তার নামে একটি সঞ্চয় হিসাব খোলা হয়। এতে শিশু বুঝতে পারে, টাকা কেবল খরচ করার জিনিস নয়, জমিয়েও রাখতে হয়।
কিছু বাবা-মা আবার শিশুকে সহায়তা করে টাকা জমাতে উৎসাহ দেন। শিশু যদি ৫০০ টাকা জমায়, তারা নিজেরা আরও ৫০০ টাকা যোগ করেন। ফলে সে চোখের সামনে দেখে তার সঞ্চয় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। এতে সঞ্চয়ের প্রতি আরও উৎসাহ পায়।

দানের জার
এটাই এই পদ্ধতির সবচেয়ে সুন্দর অংশ। এই জারের টাকা নিজের জন্য নয়, অন্যের জন্য। কোনো অসহায় শিশুর জন্য, পথপ্রাণীর জন্য, গাছ লাগানোর উদ্যোগের জন্য, কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য।
জারটি পূর্ণ হলে শিশুকে সঙ্গে নিয়ে খোঁজ করুন, কোথায় এই টাকা দেওয়া যায়। সম্ভব হলে তাকে নিয়ে সরাসরি সেই জায়গায় যান।
যখন একটি শিশু নিজের সঞ্চিত টাকা অন্য কাউকে দিয়ে হাসিমুখ দেখতে পায়, তখন সে শুধু দান করা শেখে না; সহমর্মিতাও শেখে।
যে বাবা এই পদ্ধতি চালু করেছিলেন, তিনি মেয়েকে প্রতি সপ্তাহে পাঁচ ডলার করে দিতেন। প্রথমে এক ডলার যেত সঞ্চয়ের জারে। এক ডলার যেত দানের জারে। বাকি তিন ডলার থাকত খরচের জন্য।
বাবার ধারণা ছিল, মেয়েটি নিশ্চয়ই সবসময় তিন ডলার নিজের আনন্দের জারেই রাখবে।
কিন্তু একদিন মেয়েটি বলল, ‘আমার তো এখন খরচের টাকা আছে। এই টাকা সঞ্চয়ের জারে রাখি।’
কখনো আবার বলেছে, ‘এটা দানের জারে রাখব।’
বাবা পরে লিখেছিলেন, আর্থিক পরামর্শক হিসেবে বিষয়টি তার ভালো লেগেছিল। কারণ কেউ তাকে জোর করেনি। সে নিজেই সব সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

কীভাবে শুরু করবেন
প্রথমে শিশুকে বোঝান টাকা কী। টাকা কোথা থেকে আসে। মানুষ কেন কাজ করে। কেন সব টাকা খরচ করা যাবে না। মুদ্রা, নোট, ব্যাংক কার্ড, মোবাইল ব্যাংকিং সবকিছু সহজ ভাষায় পরিচয় করিয়ে দিতে পারেন।
তারপর তিনটি জার সাজিয়ে দিন। প্রতিবার টাকা পেলেই তাকে জিজ্ঞেস করুন—
‘কত খরচ করবে?’
‘কত জমাবে?’
‘কত অন্যের জন্য রাখবে?’
ধীরে ধীরে দেখবেন, সে শুধু টাকা গুনতে শিখছে না; জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কিছু মূল্যবোধও শিখছে।
শেষ কথা হলো, আমরা সন্তানদের পড়তে শেখাই, লিখতে শেখাই, ভালো মানুষ হতে শেখাই। কিন্তু টাকার সঠিক ব্যবহার শেখানোর বিষয়টি অনেক সময় ভুলে যাই। অথচ অর্থ ব্যবস্থাপনা এমন একটি দক্ষতা, যা তার সারা জীবন কাজে লাগবে।
সূত্র: ফোর্বস, বিজনেস ইনসাইডার, বনজায়.ওআরজি


