রয়টার্সের বিশ্লেষণ

যেভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘ছাড় দিতে’ বাধ্য করছে ইরান

স্টার অনলাইন ডেস্ক

মধ্যপ্রাচ্যের বাণিজ্যপথ, নৌপথ ও জ্বালানি অবকাঠামোকে চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার বানিয়ে ইরান মনে করছে, তারা ওয়াশিংটনের চেয়ে বেশি সময় টিকে থাকতে পারবে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য মুখোমুখি অবস্থান ধরে রাখার মূল্যও ধীরে ধীরে বাড়বে। উপসাগরীয় অঞ্চলের কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকরা এমনটাই বলেছেন বার্তাসংস্থা রয়টার্সকে।

তাদের মতে, সামরিক বিজয়ের চেষ্টা না করে তেহরান এমন একটি কৌশল নিয়েছে, যেখানে ধাপে ধাপে উত্তেজনা বাড়ানো হবে, কিন্তু পূর্ণমাত্রার যুদ্ধও এড়ানো হবে।

বিশ্লেষকদের ভাষ্য, এর লক্ষ্য হলো যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বোঝানো যে, হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরানের দাবি মেনে নেওয়ার চেয়ে সংকট সামাল দেওয়ার খরচই বেশি।

তেহরানের বার্তা হলো, ওয়াশিংটন যদি হরমুজে ইরানের আরও বড় ভূমিকা মেনে না নেয়, তাহলে সংঘাত উপসাগরের বাইরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।

ইরানের বিশ্বাস, গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ও জ্বালানি স্থাপনাগুলোকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারলে ভবিষ্যতের যেকোনো আলোচনায় তারা আরও শক্তিশালী অবস্থানে থাকবে।

ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের মাইকেল নাইটস রয়টার্সকে বলেন, ‘শুরু থেকেই ইরান এমনভাবে উত্তেজনা বাড়ানোর চেষ্টা করেছে, যাতে প্রতি সপ্তাহে নতুন কিছু সামনে আসে—নতুন ভৌগোলিক এলাকা, নতুন ধরনের অস্ত্র বা নতুন লক্ষ্যবস্তু।’

তিনি আরও বলেন, ‘তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলকে ক্ষতি করার সক্ষমতা নয়, বরং তারা পুরো অঞ্চল ও বৈশ্বিক অর্থনীতিকে চাপে ফেলতে পারে।’

ওমানের মুসান্দাম উপদ্বীপ থেকে দেখা হরমুজ প্রণালিতে চলাচলরত জাহাজ। ১৬ জুন, ২০২৬। ফাইল ছবি: রয়টার্স

হরমুজের বাইরেও হুমকি

যুদ্ধের আগে বিশ্বের ব্যবহৃত মোট তেলের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো। সেখানে নৌ চলাচল ব্যাহত করার সক্ষমতা দেখানোর পর তেহরান ইঙ্গিত দিয়েছে, শুধু হরমুজ নয়, অন্য গুরুত্বপূর্ণ নৌপথও তাদের কৌশলের অংশ হতে পারে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, লোহিত সাগর ও সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামোর প্রতি হুমকিও দেখাচ্ছে, বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যাহত করার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ বাড়ানোর বৃহত্তর পরিকল্পনা নিয়েছে ইরান।

উপসাগরীয় এক সূত্রের ভাষ্য, এই কৌশল ইরানের বিপ্লবী গার্ডের কমান্ডারদের এমন এক বিশ্বাসের প্রতিফলন, যেখানে তারা মনে করেন, তারা আরও বেশি কিছু আদায় করতে পারবেন।

তাদের ধারণা, নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরেকটি মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের গভীরে যেতে চাইবেন না।

ওই সূত্র বলেন, ‘ইরানিরা বিশ্বাস করে, যুদ্ধের পরিধি বাড়াতে থাকলে শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প ছাড় দিতে বাধ্য হবেন। ট্রাম্প মনে করেন, তিনি ইরানকে কঠোরভাবে আঘাত করে আলোচনায় আনতে পারবেন। কিন্তু ইরান নতি স্বীকার করবে না।’

ইয়েমেনের বাব আল-মান্দেব প্রণালির উপকূলের কাছে ভাসছে নৌকা। ২ এপ্রিল, ২০২৬। ছবি: রয়টার্স

ছাড় আদায়ে উত্তেজনা বাড়ানোর কৌশল

এই হিসাবের ওপরই তেহরানের আলোচনার কৌশল দাঁড়িয়ে আছে।

ট্রাম্প বলেছেন, সোমবার ইরানের সঙ্গে আলোচনা হবে। এর আগে তিনি বলেছিলেন, হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার বিষয়ে সমঝোতার আশায় তিনি একটি হামলা স্থগিত করেছিলেন। তবে তেহরান বলেছে, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের কোনো আলোচনা চলছে না।

ইরানের একজন জ্যেষ্ঠ সূত্র রয়টার্সকে জানান, দেশটির নেতৃত্ব মনে করে, অতীতে নমনীয়তা দেখানোর চেষ্টা কেবলই ওয়াশিংটনের চাপ বাড়িয়েছে। তাই অর্থবহ আলোচনায় যাওয়ার আগে নিজেদের চাপ সৃষ্টির সক্ষমতা দেখানো জরুরি।

সূত্রটির ভাষ্য, তেহরানের মূল্যায়ন অনুযায়ী ট্রাম্প ছাড় দেওয়াকে দুর্বলতা হিসেবে দেখেন এবং কেবল চাপের ভাষাই বোঝেন।1

ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো মাইকেল সিং বলেন, ইরান এখনো মনে করছে, উদ্যোগ তাদের হাতেই আছে। কারণ, ট্রাম্প প্রশাসন সামরিকভাবে কত দূর যেতে প্রস্তুত, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

মার্কিন ও ইরানের জাতীয় পতাকা, থ্রিডি প্রিন্ট করা তেলের ব্যারেল এবং ঊর্ধ্বমুখী শেয়ারবাজারের গ্রাফ—যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্ক ও তেলের বাজারকে প্রতীকীভাবে তুলে ধরা এই অলংকরণচিত্র। ২৩ মার্চ, ২০২৬। ছবি: রয়টার্স

তিনি বলেন, ‘ইরানিরা নিজেদের সুবিধা আরও বাড়ানোর চেষ্টা করছে। তারা প্রণালির ওপর সার্বভৌম কর্তৃত্ব এবং নৌপথে নির্বাচিত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়।’

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক কূটনীতিক ও ইরানবিশেষজ্ঞ অ্যালান আয়ার বলেন, তেহরান এমন একটি প্রতিরোধমূলক কৌশল অনুসরণ করছে, যার উদ্দেশ্য ওয়াশিংটনকে অবরোধ তুলে নিতে এবং সামরিক হামলা বন্ধ করতে বাধ্য করা।

তিনি বলেন, ‘তারা চায় না যুক্তরাষ্ট্র ঘটনাপ্রবাহের গতি নির্ধারণ করুক।’

এই বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ প্রশাসনিক কাঠামো।

আঞ্চলিক সূত্রগুলোর মতে, ওমান উপসাগরীয় দেশগুলোর সমর্থনে নৌপথ পরিচালনার একটি প্রস্তাব ইরানের কাছে দিয়েছে। এতে স্বেচ্ছাভিত্তিক ব্যবহার ফি নেওয়ার বিষয় রয়েছে।

তবে তেহরান চায় প্রণালির প্রশাসনিক কর্তৃত্ব এবং জাহাজ থেকে সেবা ফি আদায়ের ক্ষমতা তাদের হাতে থাকুক।

অন্যদিকে, ওয়াশিংটন যেকোনো ধরনের ফি আরোপের বিরোধিতা করছে। তাদের অবস্থান, হরমুজ আন্তর্জাতিক নৌপথ হিসেবেই থাকবে এবং তা ইরানের নিয়ন্ত্রণমুক্ত থাকতে হবে।

ইয়েমেনের সানায় মার্কিন-সৌদিবিরোধী এক সমাবেশে ক্ষেপণাস্ত্রের ছবি-সংবলিত ব্যানারের সামনে মঞ্চে দাঁড়িয়ে আছেন হুতি সমর্থকেরা। ৩১ জুলাই, ২০২৬। ছবি: রয়টার্স

দীর্ঘমেয়াদি চাপের কৌশল

ইরানের এই কৌশলের প্রভাব ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে।

হরমুজের বাইরেও হুমকি ছড়িয়ে পড়ায় আঞ্চলিক ও পশ্চিমা দেশগুলো এখন ইরানের ওপর আরও চাপ বাড়ানোর বদলে বাণিজ্যপথ ও জ্বালানি অবকাঠামো রক্ষায় বেশি মনোযোগ দিচ্ছে।

সৌদি আরবের নেতৃত্বে গঠিত সামুদ্রিক জোট তারই একটি উদাহরণ।

উপসাগরীয় সূত্রগুলোর মতে, এই জোটের উদ্দেশ্য ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়ানো নয়। বরং বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগি করা এবং সমুদ্রপথ সচল রাখা।

মাইকেল নাইটস এই উদ্যোগের সঙ্গে লোহিত সাগরে ইউরোপের ‘অ্যাসপিডিস’ মিশনের তুলনা করেন। সেই মিশনের লক্ষ্যও ছিল সামরিক ভারসাম্য বদলানো নয়, বরং বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখা।

তেহরানের কাছে এটিকে একটি সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ইরানের তেহরানের একটি ভবনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ছবি-সংবলিত একটি বিলবোর্ড। ১৮ জুলাই, ২০২৬। ছবি: মাজিদ আসগারিপুর/রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির সঙ্গে সরাসরি পাল্লা দিতে না পারলেও তারা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে যেতে বাধ্য করছে।

হরমুজ, বাব আল-মান্দেব (লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে) অথবা অন্য যেকোনো নৌপথে নতুন হুমকি তৈরি হলেই বৈশ্বিক বাণিজ্য সচল রাখতে আরও বেশি সম্পদ ব্যয় করতে হচ্ছে। মূলত এটি ধৈর্যের লড়াই।

ইরানের নেতারা মনে করেন, তারা অর্থনৈতিক চাপ যত দিন সহ্য করতে পারবেন, বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারে বারবার বিঘ্নের পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জোট সহ্য করতে পারবে তার চেয়ে কম সময়।

এই কৌশলের একটি কূটনৈতিক লক্ষ্যও রয়েছে।

প্রয়োজন হলে সংকট আরও বিস্তৃত করতে পারে—এটি দেখিয়ে ভবিষ্যতের যেকোনো আলোচনায় শর্ত নির্ধারণের ক্ষমতা নিজেদের হাতে রাখতে চায় তেহরান।

কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের রে তাকেহ বলেন,’যদি আলোচনা হয়, তাহলে শর্ত তারাই নির্ধারণ করতে চাইবে। দুই পক্ষই পাল্টাপাল্টি উত্তেজনা বাড়িয়ে চলেছে।’

তবে আপাতত কোনো পক্ষই পিছু হটার ইঙ্গিত দিচ্ছে না।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ওয়াশিংটন ও তেহরান একে অপরের দৃঢ়তা পরীক্ষা করে যাচ্ছে। ফলে সর্বোচ্চ কৌশলগত সুবিধা আদায়ের এই প্রতিযোগিতা শেষ পর্যন্ত এমন এক সংঘাতে রূপ নিতে পারে, যা কোনো পক্ষেরই পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে থাকবে না।