গল্প

আমার অনেক পাখি আছে

আহমেদ খান হীরক
আহমেদ খান হীরক

বাবাকে বললাম, ‘বাবা, আমাকে একটা পাখি এনে দাও।’

বাবা তখন দেখছিল মোবাইল। রিলস না কী বলে, ওইসব৷ মাথা না তুলেই বলল, ‘ঠিক আছে।’

আমি হয়ে গেলাম খুশি। সেদিন ইশকুলে বন্ধুদের বললাম, ‘বাবা আমাকে পাখি এনে দেবে।’

জয়তু বলল, ‘কী পাখি দেবে রে?

তাই তো! বাবা আমাকে কী পাখি এনে দেবে? সেদিন সন্ধ্যায় বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘বাবা, আমাকে কী পাখি দেবে?’

বাবা ব্যস্ত তখন বই পড়ায়। মাথা না তুলেই বলল, ‘তুমি যে পাখি চাও!’

কিন্তু কী পাখি বলা যায়? আমি আসলে কী পাখি চাই? ইশশ! নিজেই তো কিছু জানি না এখনো!

পরের দিন ছুটি। ইশকুল নেই। একা বসে আছি বারান্দায়৷ আকাশ দেখি। আসলে আকাশ না, দেখছি আকাশের পাখি৷ দেখলাম একটা বড় পাখি। সামনের ঠোঁটটা একটু বাঁকানো। আর কী যে দারুণ ওড়ে!

আম্মুকে বললাম, ‘আম্মু, ওইটা কী পাখি?’

‘ওইটা তো চিল!’

‘আচ্ছা। বাবাকে তাহলে বলব চিল পাখি আনতে।’

আম্মু ফিক করে হেসে দিলো, ‘ধুর! তোর বাবা চিল পাবে কোথায়?’

ওহহ, চিল পাওয়া যায় না? ঠিক আছে। তাহলে অন্য পাখি খুঁজি। কী পাখি? কী পাখি? ওই তো...

রাইসাদের কার্নিশে এসে বসেছে। পুরো শরীর চকচকে কালো। ঠোঁটটা মোটা। গলার কাছটা ছাই রঙ। ওই পাখিকে তো আমি চিনি। কা কা করে ডাকে। ওর নাম কাক। আচ্ছা ওকে একটু ডাকি তো।

‘এই কাক, তুমি থাকবে আমার সাথে?’

কাক তো শুনলোই না, উল্টো কা কা করে উড়ে গেল। যাহ!

আর কী পাখি আছে? ওই যে.. ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ করে উড়ছে। এক জোড়া। ঘিয়ে ঘিয়ে শরীরে রঙ। ছোট্ট ছোট্ট পা। লাফিয়ে লাফিয়ে ওড়ে। আম্মু বলল, ‘ওগুলো চড়ুই!’

‘ও চড়ুই ভাই, শোনো না, তোমরা থাকবে আমার সাথে?’

ওমা! একটু তাকিয়েই উড়ে গেল ফুড়ুৎ করে।

আমি আবার বারান্দায়। তাকিয়ে আছি, তাকিয়ে আছি। নাহ! আর তো কোনো পাখি দেখিই না!

রাতে বাবাকে বললাম, ‘বাবা, কী পাখি নেব বলো তো, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না!’

বাবা তখন টিভি দেখছিল। না তাকিয়েই বলল, ‘তুমিই ভেবে দেখো কেমন পাখি নেবে। ছোট পাখি না বড় পাখি... নাকি ইয়াব্বড় পাখি!’

আমি সারা রাত ভাবলাম। ইয়াব্বড় পাখি কেমন হবে? চিলের থেকেও বড়? আম্মু বলল, ‘একটা ইয়াব্বড় পাখি আছে অবশ্য। উটপাখি।’

আম্মু তার মোবাইলে উটপাখির ছবি দেখালো। সত্যিই কী যে বড় পাখি! আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম।

আম্মু বলল, ‘উটপাখি উড়তে পারে না, জানো তো? কেবল দৌড়ায়! আর ঝড় হলে বালির ভেতর মাথা গুঁজে থাকে!’

‘বাবাকে তাহলে বলো উটপাখি আনতে!’

‘কিন্তু বাংলাদেশে তো উটপাখি নেই।’

হঠাৎ কী হলো, আমার খুব কান্না পেল। একটা পাখিও তো আমি পাচ্ছি না। আম্মু আমাকে জাপটে ধরে বলল, ‘আরে আরে! কাঁদে কেন আমার ছানাপোনাটা। ঠিক আছে, তোমার আব্বুকে বলব পাখি আনতে!’

পরের দিন ঘটল মজার এক ঘটনা। আব্বু বাসায় ফিরতেই বলল, ‘আজ থেকে আমাদের সাথে পাখিরা থাকবে। ছোট পাখি, বড় পাখি আর ইয়াব্বড় পাখি!’

‘কিন্তু কীভাবে?’

বাবা বলল, ‘চলো বারান্দায়!’

বাবা মোবাইল ছেড়ে, বই ছেড়ে, টিভি ছেড়ে আমার সাথে বসল বারান্দায়। আম্মু নিয়ে এলো ছয়টি বাটি৷ দুই বাটিতে পানি। বাকি বাটিতে ভাত, চাল, ছোলা আরও কী কী!

বাবা বলল, ‘এবার দেখো, পাখিরা সবাই আমাদের কাছে আসবে।’

সত্যি সত্যি পাখি আসতে শুরু করল আমাদের বারান্দায়৷ প্রথম প্রথম তারা ভয় পেত। তারপর গেল কয়েক দিন। এখন পাখিরা বারান্দায় লাফায়, পানি খায়, খাবার খায়। আরও কিচিরমিচির করে কত কী যে বলে! বাবা ও আমি বসে বসে তাদের কথা শুনি। কী যে মজা!

বাবা আমাকে পাখি চিনিয়ে দেয়, চড়ুই আছে, বাবুই আছে, শালিক আছে, কবুতরও আছে। একদিন তো চিলও এলো। মাঝে মাঝেই আসে একটা চিল।

বাবা বলেছে, ‘কোনো একদিন দূরদেশ থেকে উটপাখিও চলে আসবে আমাদের বারান্দায়।’

আমি সেইদিনের অপেক্ষায় আছি। কী দারুণ একটা ব্যাপার হবে তখন, তাই না?