পাখির নাম টিনটিন
সাসার বয়স বারো বছর। সে ক্লাস সিক্সে পড়ে। সাসা ফুল ভালোবাসে, গাছ ভালোবাসে। আর ভালোবাসে পাখি ও প্রাণীদের। একদিন এক ছোট ঘটনা সাসার জন্য অনেক বড় ঘটনা হয়ে এলো।
শিশুকিশোরদের জন্য লেখা বেশকিছু বই ও ছোট এক বাক্স নিয়ে বাসায় এলো মামা। সেই বাক্স খুলতেই ভেতরে দেখা গেল ভীষণ সুন্দর রঙিন পাখি। পাখির গায়ের রং সবুজ, মাথায় হলুদ রং। শরীর খুব ছোট। এখনো পালক পুরোপুরি গজায়নি। পাখির চোখ দুটো বড় ও ভয়ভরা।
মামা বললেন, ‘সাসা, তুমি যে বই পড়তে ভালোবাসো, ক্লাসের পড়া নিয়মিত করো, স্কুলে ভালো রেজাল্ট করো—সেজন্য বইগুলোর সাথে এই পাখি তোমার গিফট।’
সাসা বাক্সের ভেতর তুলোর ওপর বসে থাকা পাখির দিকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকে।
মামা বললেন, ‘এই পাখি এখন নিজে খেতে পারবে না। তোমাকেই খাওয়াতে হবে।’
সাসা পাখির দিকে হাত বাড়িয়েছে। অমনি পাখি তার আঙুলে ঠোঁট ঠেকাল। সাসাকে ভয় পায়নি।
মামা বললেন, ‘পাখির নাম রাখা দরকার।’
খুশি মুখে সাসা বলল, ‘পাখির নাম টিনটিন।’
সাসা আয়োজন করে টিনটিনের খাওয়ার ব্যবস্থা করেছে। সিরিঞ্জে খাবার নিয়ে টিনটিনকে খাওয়ায়। পাখির খাঁচা পরিষ্কার রাখে। আর সময়মতো পাখির যত্ন নেয়। সাসার দিনগুলো এই ছোট্ট পাখি নিয়ে বদলাতে থাকে।
দিন যায়, মাস যায়। টিনটিন বড় হচ্ছে। তার শরীরে পালক গজিয়েছে। ডানা আগের চেয়ে শক্ত হয়েছে। এখন সে আর আগের ছোট্ট পাখিটি নেই। টিনটিন উড়ে এসে ঘরের জানালার বসে। বাইরের দিকে তাকিয়ে আপন মনে ডেকে ওঠে, ‘ট্যা ট্যা ট্যা।’
সাসা একদিন খেয়াল করল টিনটিন সকাল হলেই খাঁচা থেকে বের হয়ে জানালায় গিয়ে বসে। ডানা ঝাপটায়। আবার খাঁচায় ফিরে আসে। টিনটিন কখনো সাসার হাতের ওপর এসে বসে। কাঁধে ওঠে। কিছুক্ষণ পর উড়ে গিয়ে আবার জানালার ওপর বসে। বাইরের দিকে তাকিয়ে ডাকতে থাকে, ‘ট্যা ট্যা ট্যা।’
একদিন বিকেলে টিনটিন ঘরের জানালায় বসেছিল। বাইরে তখন হালকা বাতাসে গাছের ডালগুলো নড়ছিল। আকাশে একঝাঁক পাখি উড়ে যাচ্ছিল। তারাও ডেকে উঠল, ‘ট্যা ট্যা ট্যা।’
টিনটিন অনেকক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর মাথা ঘুরিয়ে সাসার দিকে তাকায়। সাসা জানালার পাশে টিনটিনের কাছে দাঁড়িয়েছিল।
একদিন সকালে সাসা ঘুম থেকে উঠে খাঁচার দিকে তাকিয়ে থমকে যায়। খাঁচার দরজা খোলা। ভেতরে টিনটিন নেই। সাসা ঘরের চারপাশে তাকায়। টিনটিন ঘরের কোথাও নেই। রান্নাঘর, ড্রয়িংরুম, ওপাশের বারান্দা সব জায়গায় টিনটিনকে খুঁজতে থাকে সাসা। কিন্তু টিনটিনকে বাসার কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। সাসা গিয়ে ঘরের জানালার পাশে দাঁড়ায়। অমনি সাসার চোখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। টিনটিন জানালার কার্নিশে বসে আছে। সে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে। আকাশে অনেক পাখি উড়ছে।
সাসা নরম সুরে ডাকল, ‘টিনটিন।’
টিনটিন মাথা ঘুরিয়ে সাসার দিকে তাকাল। ডানা মেলে উড়ে এসে বসেছে সাসার হাতে।
সাসা খেয়াল করেছে টিনটিনের আচরণ কেমন যেন বদলে গেছে। সে এখন আর সারাক্ষণ খাঁচার ভেতরে থাকে না। আবার বাড়ির বাইরেও উড়ে যায় না। কখনো সে ঘরের ভেতর টেবিলের পাশে বসে থাকে। কখনো জানালায় গিয়ে বসে। কখনো খাঁচার ভেতরে নিজে থেকেই ঢুকে পড়ে। তবে কিছুক্ষণ পর খাঁচা থেকে বেরিয়ে আসে।
ইচ্ছে করেই সাসা এখন পাখির খাঁচার দরজা আর বন্ধ রাখে না। তার মনে হয়েছে টিনটিনকে সে আটকে রাখতে চায় না। এটা টিনটিনের থাকার জায়গা না। থাকতে চাইলে থাকবে, যদি তার খাঁচায় থাকতে ইচ্ছে না করে তাহলে থাকবে না। বাইরে গিয়ে অন্য পাখিদের সাথে আকাশে উড়ে বেড়াবে।
প্রতিদিন সকালে খাঁচা থেকে টিনটিনের আওয়াজ শোনা যায়। সাসা কাছে গেলেই ডানা নাড়ে। খাঁচার ভেতর আনন্দ নিয়ে ছোটাছুটি করে। সেদিন খাঁচার সামনে গিয়ে সাসা অবাক।
টিনটিন ঘাড় গুঁজে চুপচাপ খাঁচার এক কোনায় বসে আছে। খাঁচার দিকে মুখ বাড়িয়ে সাসা হাসিমুখে বলল, ‘ঘটনা কী টিনটিন, আজ এখনো ঘুমাচ্ছ যে!’
টিনটিন কোনো সাড়া দিলো না।
সাসা খাঁচার তারে আঙুল দিয়ে শব্দ করল। এমন শব্দ শুনলে টিনটিন নড়ে ওঠে। আজ টিনটিন নড়ল না।
সাসা ভয় পাচ্ছে। কেন তার ভয় লাগছে, কীসের ভয় বুঝতে পারছে না। তাড়াতাড়ি খাঁচার দরজা খুলে ভেতরে হাত বাড়াল। হাতের তালুতে পাখিকে নিয়ে এসেছে। টিনটিন তার হাতের তালুতে চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। তার শরীরে কোনো নড়াচড়া নেই। একদম নিস্তব্ধ।
কয়েক সেকেন্ড সাসা ঘটনা কিছুই বুঝতে পারল না। বিস্ময় নিয়ে পাখির দিকে তাকিয়ে থাকল। এক সময় খুব আস্তে ডাকল, ‘টিনটিন!’
টিনটিন কোনো সাড়া দিলো না।
সাসা আবার ডাকল। এবার একটু জোরে, ‘টিনটিন!’
টিনটিন কোনো উত্তর দিলো না।
নীরব হয়ে শুয়ে আছে।
সাসা গিয়ে বাড়ির পেছনের আমগাছের নিচে খানিকটা জায়গা পরিষ্কার করল। সেখানে ছোট গর্ত খুঁড়েছে। টিনটিনকে হাতের ওপর নিয়ে তার দিকে তাকাল। তারপর টিনটিনকে মাটির গর্তের ভেতর শুইয়ে দিয়েছে। মাটি দিয়ে গর্ত ভরাট করেছে।
টিনটিনের চোখ উপচে পানি বেরিয়ে আসছে। চোখ থেকে গাল বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল টিনটিনকে রাখা মাটির গর্তের ওপর।
মাথার ওপরে অনেকগুলো পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে। সাসা হাত দিয়ে চোখ মুছে উপরে তাকাল। মাথার ওপরে আকাশে একঝাঁক পাখি উড়ছে। তারা ডেকে যাচ্ছে, ‘ট্যা ট্যা ট্যা।’
সাসার মনে হলো টিনটিন আকাশের ওই পাখিদের সাথে মিশে গেছে। সে আজ খাঁচা থেকে বের হয়ে মুক্ত আকাশে ডানা মেলে উড়ে বেড়াচ্ছে আর ডাকছে, ‘ট্যা ট্যা ট্যা।’
সাসা আমগাছের কাছ থেকে বাড়ির দিকে হেঁটে যাচ্ছে। তার মাথার ওপর মুক্ত আকাশে হাজার হাজার পাখি ডানা মেলে উড়ে বেড়াচ্ছে। মনের আনন্দে ডেকে যাচ্ছে, ‘ট্যা ট্যা ট্যা।’
সেখানে দাঁড়িয়ে সাসা আকাশের দিকে মুখ তুলে তাকাল। মুক্ত আকাশে ডানা মেলা হাজার হাজার পাখির দিকে তাকিয়ে নিজের মনে বলল, ‘আমার টিনটিন।’
সাসা হাসছে। তার মনে আনন্দ। তার টিনটিন আজ খাঁচা থেকে মুক্ত হয়ে আকাশে ডানা মেলে উড়ে যাচ্ছে।