মেঘের অনেক রঙ, অনেক গল্প

স্টার অনলাইন ডেস্ক

আকাশের দিকে তাকালে আমরা কত রকমের মেঘ দেখি! কোনো মেঘ তুলোর মতো সাদা ও নরম, কোনো মেঘ আবার চ্যাপ্টা। কিছু মেঘ সূর্য ওঠা বা ডোবার সময় লাল, কমলা কিংবা গোলাপি রঙে রঙিন হয়ে ওঠে। আবার কিছু মেঘ দেখলেই মনে হয়, একটু পরেই বৃষ্টি নামবে।

মেঘ কেবল আকাশকে সুন্দর করে না, পৃথিবীর আবহাওয়ার জন্যও খুব গুরুত্বপূর্ণ। বৃষ্টি, তুষারপাত, শিলাবৃষ্টি, বজ্রঝড় সবকিছুর সঙ্গেই মেঘের সম্পর্ক রয়েছে। তাই আবহাওয়াবিদরা মেঘ নিয়ে অনেক গবেষণা করেন।

মেঘ

মেঘ আসলে কী

সহজভাবে বললে, মেঘ হলো অসংখ্য ক্ষুদ্র জলকণা বা বরফকণার একটি বড় দল। এই কণাগুলো এত ছোট যে তারা বাতাসে ভেসে থাকতে পারে।

কখনো কখনো মেঘের মধ্যে ধুলা বা ধোঁয়ার ক্ষুদ্র কণাও থাকে। তবে বেশিরভাগ মেঘই তৈরি হয় পানি দিয়ে।
একটি মেঘকণা এতই ছোট যে, খালি চোখে তা দেখা যায় না। লাখো-কোটি ক্ষুদ্র কণা একসঙ্গে জড়ো হলেই আমরা মেঘ দেখতে পাই।

অল্টোকিউমুলাস মেঘ
অল্টোকিউমুলাস মেঘ

মেঘ তৈরি হয় কীভাবে

মেঘের গল্প শুরু হয় সূর্য থেকে। সূর্যের তাপে নদী, পুকুর, হ্রদ, সমুদ্র এমনকি ভেজা মাটির পানিও গরম হয়। তখন পানির কিছু অংশ বাষ্প হয়ে বাতাসে উঠে যায়। এই অদৃশ্য গ্যাসকে বলা হয় জলীয়বাষ্প।

জলীয়বাষ্প উপরে উঠতে থাকে। যত উপরে ওঠে, তত ঠাণ্ডা হতে থাকে। একসময় এই বাষ্প আবার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জলকণায় পরিণত হয়। কোটি কোটি জলকণা একসঙ্গে জড়ো হয়ে তৈরি করে মেঘ।

মেঘ ভেসে থাকে কেন

অনেকেই ভাবেন, মেঘ এত বড় হলে আকাশে ভাসে কীভাবে? আসলে মেঘের ভেতরের জলকণাগুলো খুবই ছোট ও হালকা। গরম বাতাস ওপরের দিকে উঠতে থাকে এবং সেই বাতাস জলকণাগুলোকে ভাসিয়ে রাখে।

একটি বড় মেঘের ওজন হাজার হাজার হাতির সমান হতে পারে। কিন্তু তার ভেতরের কণাগুলো এত ছোট যে, পুরো মেঘটিই বাতাসে ভেসে থাকতে পারে।

নিম্বোস্ট্র্যাটাস মেঘ
নিম্বোস্ট্র্যাটাস মেঘ

সব মেঘ কি পানি দিয়ে তৈরি

না। আকাশের অনেক উঁচুতে তাপমাত্রা এত কম থাকে যে, সেখানে পানি তরল অবস্থায় থাকতে পারে না। তখন তা বরফকণায় পরিণত হয়।

এ কারণে আকাশের সবচেয়ে উঁচু মেঘগুলো দেখতে তুলোর মতো নয়। সেগুলো অনেকটা সাদা পালকের মতো দেখায়।

কুয়াশাও কি মেঘ

হ্যাঁ, কুয়াশাও এক ধরনের মেঘ। পার্থক্য শুধু এই যে, সাধারণ মেঘ আকাশে থাকে। আর কুয়াশা মাটির কাছাকাছি তৈরি হয়।

শীতের সকালে আমরা যখন চারপাশ ঝাপসা দেখি, তখন আসলে একটি মেঘের ভেতরেই হাঁটি।

মেঘের নানা রূপ

সব মেঘ একরকম নয়।

গরমের দিনে আকাশে যে সাদা, ফোলা-ফোলা মেঘ দেখা যায়, সেগুলোকে বলা হয় কিউমুলাস মেঘ। এগুলো দেখতে অনেকটা তুলার স্তূপের মতো।

কিউমুলাস মেঘ
কিউমুলাস মেঘ

কিছু মেঘ আবার আকাশজুড়ে পাতলা চাদরের মতো ছড়িয়ে থাকে। এগুলোকে বলা হয় স্ট্র্যাটাস মেঘ।

আর খুব উঁচুতে থাকা চিকন, পালকের মতো মেঘকে বলা হয় সিরাস মেঘ।

একই আকাশে একসঙ্গে অনেক ধরনের মেঘও দেখা যেতে পারে।

পৃথিবীতে এমন কিছু মেঘ আছে, যেগুলো সাধারণ মেঘের চেয়ে অনেক বেশি উঁচুতে তৈরি হয়। এদের বলা হয় নকটিলুসেন্ট মেঘ।

এই মেঘগুলো এত উঁচুতে থাকে যে সূর্য ডুবে যাওয়ার পরও সূর্যের আলো পায়। তাই রাতের আকাশে এগুলো নীলাভ আলোয় ঝলমল করতে দেখা যায়।

বিজ্ঞানীরা মনে করেন, মহাকাশ থেকে আসা উল্কাপিণ্ড পুড়ে যে ক্ষুদ্র ধুলা তৈরি হয়, তার চারপাশে বরফ জমে এসব মেঘ তৈরি হতে পারে।

আগুন থেকেও মেঘ তৈরি হয়!

শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও বড় দাবানল থেকেও মেঘ তৈরি হতে পারে।

যখন বিশাল এলাকায় আগুন লাগে, তখন প্রচুর গরম বাতাস ও ধোঁয়া আকাশে উঠে যায়। কখনো কখনো সেগুলো মিলে বিশাল মেঘ তৈরি করে।

এই মেঘ থেকে বজ্রপাত, ঝড়ো বাতাস, এমনকি বিরল ক্ষেত্রে আগুনের ঘূর্ণিঝড়ও তৈরি হতে পারে।

স্ট্র্যাটাস মেঘ
স্ট্র্যাটাস মেঘ

বৃষ্টি হয় কীভাবে

মেঘের ভেতরের জলকণাগুলো সবসময় একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খায়। ধীরে ধীরে তারা বড় হতে থাকে। যখন কোনো জলকণা এত ভারী হয়ে যায় যে, বাতাস তাকে আর ধরে রাখতে পারে না, তখন সেটি নিচে পড়ে যায়। 

অনেকগুলো ফোঁটা একসঙ্গে পড়লেই বৃষ্টি হয়।

তুষার ও শিলাবৃষ্টি কীভাবে হয়

শীতল পরিবেশে জলকণা বরফে পরিণত হয়। অনেক বরফকণা একসঙ্গে জুড়ে তৈরি করে তুষারকণা। এভাবেই তুষারপাত হয়।

আবার বজ্রমেঘের ভেতরে জলকণা বারবার ওপর-নিচে ওঠানামা করতে করতে বরফের স্তর জমে। একসময় তা বড় শিলাখণ্ডে পরিণত হয়। এরপর সেগুলো মাটিতে পড়ে শিলাবৃষ্টি হয়।

সিরাস মেঘ
সিরাস মেঘ

বজ্রমেঘে কী ঘটে

বজ্রঝড়ের মেঘকে বলা হয় কিউমুলোনিম্বাস মেঘ।

এগুলো সাধারণ মেঘের চেয়ে অনেক বড় হয়। কখনো কখনো ১৬ কিলোমিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে।

এই মেঘের ভেতরে শক্তিশালী বাতাস, জলকণা, বরফকণা ও বিদ্যুৎ একসঙ্গে কাজ করে। ফলে বজ্রপাত হয়।

সবচেয়ে শক্তিশালী বজ্রমেঘগুলো ঘুরতেও পারে। এসব ঘূর্ণায়মান মেঘ থেকেই কখনো কখনো টর্নেডো তৈরি হয়।

মজার বিষয় হলো, সব মেঘ ঝড় বাড়ায় না। অনেক সময় মেঘ সূর্যের আলো আটকে দেয়। ফলে মাটি কম গরম হয়।

মাটি কম গরম হলে পানি কম বাষ্প হয়ে আকাশে ওঠে। আর বাতাসে কম আর্দ্রতা থাকলে বড় ঝড় তৈরি হওয়াও কঠিন হয়ে যায়।

কিউমুলোনিম্বাস মেঘ
কিউমুলোনিম্বাস মেঘ

তাই আবহাওয়াবিদেরা বলেন, অনেক বড় ঝড়ের শুরু হয় উজ্জ্বল রোদেলা দিন থেকে। কারণ সূর্যের তাপ বাতাসকে গরম করে উপরে উঠতে সাহায্য করে। সেই উষ্ণ বাতাসই পরে বড় মেঘ ও শক্তিশালী ঝড় তৈরির শক্তি জোগায়।

আমরা প্রতিদিন মেঘ দেখি। কিন্তু এই সাদা তুলোর মতো জিনিসগুলোর ভেতরে লুকিয়ে আছে বিজ্ঞান। কখনো তারা বৃষ্টি হয়ে ফসলের উপকার করে, কখনো বজ্রঝড়ের জন্ম দেয়, আবার কখনো সূর্যাস্তের আকাশকে রঙিন করে তোলে।

তাই মেঘ কেবল আকাশের সৌন্দর্য নয়, পৃথিবীর জলচক্র, আবহাওয়া ও জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সূত্র: সায়েন্স নিউজ, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক