বৃষ্টির দিনে শিশুর ঘরবন্দি সময়কে আনন্দময় করার ৭ উপায়
বাইরে টুপটাপ বৃষ্টি পড়ছে। জানালার কাচ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে বৃষ্টির ফোঁটা। মাঠে যাওয়া যাবে না, পার্কেও নয়। একটু পরই বাড়ির ছোট্ট মানুষটি এসে বলবে, ‘মা, খুব বোর লাগছে!’ কিংবা ‘কিছুই করার নেই?’
আসলে বৃষ্টির দিন মানেই একঘেয়েমি নয়। বরং এ সময়টাকেই একটু কল্পনাশক্তি আর ঘরে থাকা কিছু সাধারণ জিনিস দিয়ে রঙিন করে তোলা যায়।
কার্ডবোর্ডের বাক্স, পুরোনো প্লাস্টিকের বোতল, রঙিন কাগজ, আঠা, কাঁচি, খবরের কাগজ কিংবা খালি টিনের কৌটা সেগুলোই হয়ে উঠতে পারে বৃষ্টির দিনের খেলার সঙ্গী।
এসব কাজ শুধু শিশুকে ব্যস্ত রাখবে না, বরং তার কল্পনাশক্তি, সৃজনশীলতা, মনোযোগ ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতাও বাড়াবে। আর বাবা-মা কিংবা দাদা-দাদি, নানা-নানির সঙ্গে কাটানো এই সময়গুলো একদিন হয়ে উঠবে তার শৈশবের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতির অংশ।
কার্ডবোর্ডের বক্স হোক গেম জোন
বাড়িতে অনলাইন গেমের ভক্ত কম নেই। তবে একদিন যদি শিশুকে বলা হয়, ‘আজ গেম খেলব না, গেম বানাব’, তাহলে কেমন হয়?
একটি পুরোনো কার্ডবোর্ডের বক্স নিন। এরপর আইসক্রিমের দুটি কাঠি, কিছু টেপ, কাগজ ও একটি মার্বেল বা ছোট বল দিয়ে বানিয়ে ফেলুন নিজের পিনবল মেশিন।
কার্ডবোর্ডের ভেতরে ছোট ছোট বাঁধা তৈরি করুন। কোথাও লিখে দিন ১০ নম্বর, কোথাও ২০, কোথাও আবার ৫০। এরপর মার্বেল ফেলে দেখুন, কার মার্বেল কোন জায়গায় গিয়ে থামে।
চাইলে পরিবারের সবাইকে নিয়ে ছোট্ট একটি প্রতিযোগিতাও আয়োজন করতে পারেন। তিন রাউন্ড শেষে যার স্কোর সবচেয়ে বেশি, সে হবে চ্যাম্পিয়ন।
শিশুরা খেলতে খেলতেই বুঝতে শিখবে বল কীভাবে গতি বদলায়, কোথায় ধাক্কা খেলে দিক পরিবর্তন করে। এভাবে অঙ্কও শেখানো যায়। প্রতিবারের স্কোর নিজেরাই যোগ করে হিসাব করতে বলুন।
সবচেয়ে বড় কথা, নিজের হাতে বানানো খেলনা দিয়ে খেলার আনন্দ কিন্তু দোকান থেকে কেনা খেলনার চেয়ে অনেক বেশি।
রিসাইকেল জিনিসে সৃজনশীলতা
খালি জুসের কার্টন, প্লাস্টিকের বোতল, পুরোনো ম্যাগাজিন, ডিমের ট্রে, টিস্যুর কাগজের রোল কিংবা টিনের কৌটা কি কেবল আবর্জনা? একদমই নয়। একদিন ঠিক করুন, আজ ঘরে নতুন কিছু কেনা হবে না। যা বানানো হবে, সবই হবে ফেলে দেওয়া জিনিস দিয়ে।
কার্ডবোর্ড দিয়ে বানানো যায় দরজার নামফলক। প্লাস্টিকের বোতল হয়ে যেতে পারে সুন্দর ফুলদানি। ডিমের ট্রে দিয়ে বানানো যায় শুঁয়োপোকা কিংবা ফুল। টিস্যুর রোল থেকে তৈরি হতে পারে দূরবীন। পুরোনো ম্যাগাজিন কেটে বানানো যায় রঙিন কোলাজ।
আরও মজার একটি কাজ করতে পারেন। পরিবারের প্রত্যেককে একটি করে পুরোনো জিনিস দিন। তারপর বলুন, ‘এটাকে নতুন কী বানানো যায়?’
এক ঘণ্টা পর সবাই নিজের তৈরি জিনিস নিয়ে হাজির হবে। শেষে ছোট্ট একটি প্রদর্শনী করুন। পরিবারের সদস্যরাই বিচারক হবেন।
এতে কেবল শিশুর সৃজনশীলতার বিকাশ হবে না। শিশুরা শিখবে ফেলনা জিনিস সব সময় অপ্রয়োজনীয় নয়। চাইলে সেগুলো কাজে লাগানো যায়।
ড্রয়িংরুমে ছোট্ট থিয়েটার
আপনার সন্তান কি গল্প বলতে ভালোবাসে? সব সময় কি কোনো না কোনো চরিত্রের অভিনয় করে? তাহলে এবার তার জন্য বানিয়ে ফেলুন একটি ছোট্ট থিয়েটার।
দুটি সিরিয়ালের বক্স, কিছু কার্ডবোর্ড ও রঙিন কাগজ দিয়ে খুব সহজেই তৈরি করা যায় একটি মঞ্চ। রঙ দিয়ে সাজিয়ে নিন। চাইলে ছোট্ট একটি পর্দাও বানাতে পারেন।
এরপর শুরু হোক গল্প বানানোর পালা। কেউ হবে রাজা, কেউ রাজকন্যা, কেউ ডাক্তার, কেউ শিক্ষক, কেউ আবার জঙ্গলের বাঘ বা দুষ্টু বানর। পুরোনো ওড়না, টুপি কিংবা কাপড় দিয়েই তৈরি হয়ে যাবে পোশাক।
নাটকের গল্প আগে থেকে ঠিক করারও দরকার নেই। একজন একটি বাক্য বলবে, পরেরজন সেটার সঙ্গে মিলিয়ে গল্প এগিয়ে নিয়ে যাবে। দেখবেন, কখন যে হাসতে হাসতে একটি মজার নাটক তৈরি হয়ে গেছে, টেরই পাবেন না।
শেষে পরিবারের অন্য সদস্যদের সামনে নাটকটি মঞ্চস্থ করুন। চাইলে মোবাইলে ভিডিও করে রাখুন।
কয়েক বছর পরে সেই ভিডিওই হয়ে উঠবে পরিবারের সবচেয়ে মূল্যবান স্মৃতিগুলোর একটি।
এ ধরনের খেলায় শিশুর ভাষা প্রকাশের দক্ষতা বাড়ে, আত্মবিশ্বাস তৈরি হয় এবং দলবদ্ধভাবে কাজ করার অভ্যাসও গড়ে ওঠে।
প্লাস্টিকের বোতল থেকে খরগোশ, বিড়াল কিংবা ইউনিকর্ন
খালি পানির বোতল বা জুসের বোতল ফেলে দেওয়ার আগে একবার ভাবুন। একটু রং ও কল্পনাশক্তি দিয়ে সেটিই হয়ে উঠতে পারে একটি সুন্দর প্রাণী।
প্রথমে বোতলটি পরিষ্কার করে নিন। এরপর পেন্সিল দিয়ে কান, চোখ বা মুখের নকশা এঁকে কেটে নিন। এবার রং করুন। সাদা রং করলে হতে পারে খরগোশ, কমলা করলে বিড়াল, কালো-সাদা করলে পান্ডা। আর যদি রংধনুর সব রং ব্যবহার করেন, তাহলে তৈরি হয়ে যাবে একটি ইউনিকর্ন।
চাইলে বোতলের গায়ে তুলা, রঙিন কাগজ, ফিতা বা ছোট বোতাম লাগিয়ে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে পারেন।
এবার প্রাণীটির মাথার অংশে কিছু মাটি ভরে সেখানে মানিপ্ল্যান্ট, তুলসি বা অন্য কোনো ছোট গাছ লাগিয়ে দিন।
এরপর শিশুর নতুন দায়িত্ব হবে, প্রতিদিন গাছে পানি দেওয়া, রোদে রাখা ও গাছের বেড়ে ওঠা দেখে একটি ছোট্ট ডায়েরি লেখা।
এভাবে খেলতে খেলতেই সে শিখবে গাছের যত্ন নিতে, প্রকৃতিকে ভালোবাসতে এবং নিজের কাজের দায়িত্ব নিতে।
যেমন খুশি তেমন চরিত্র বানান
এই খেলাটির সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, এখানে ভুল বলে কিছু নেই। যত আজব, তত মজা!
প্রথমে কয়েকটি কাগজ বা কাগজের কাপ নিন। আলাদা আলাদা করে বিভিন্ন ধরনের মাথা, শরীর ও পা আঁকুন। যেমন—একটি সিংহের মাথা, জিরাফের গলা, হাতির শরীর, হাঁসের পা, মাছের লেজ কিংবা একটি কলা! এগুলো কেটে তিন ভাগে ভাগ করে ফেলুন।
এবার সব অংশ এলোমেলো করে রাখুন। শিশুকে বলুন, ইচ্ছেমতো একটি মাথা, একটি শরীর ও একটি পা বেছে নিতে।
দেখা যাবে, মুহূর্তেই তৈরি হয়ে গেছে একেবারে নতুন এক প্রাণী, হয়তো সিংহের মাথা, অক্টোপাসের হাত ও মুরগির পা! কিংবা কলার শরীরের ওপর ডাইনোসরের মাথা!
এরপর শুরু হোক গল্প বানানো। এই প্রাণী কোথায় থাকে? কী খায়? তার বন্ধু কে? সে কি উড়তে পারে? নাকি সমুদ্রের নিচে থাকে?
শিশুরা যখন এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে শুরু করবে, তখন অজান্তেই তাদের কল্পনাশক্তি, ভাষা প্রকাশের দক্ষতা আর গল্প বলার ক্ষমতা বাড়তে থাকবে।
নিজের ঘর নিজে সাজানো
শিশুরা নিজের ঘর সাজাতে খুব ভালোবাসে। তাই দোকান থেকে সাজানোর জিনিস কেনার বদলে নিজের হাতেই বানিয়ে ফেলুক একটি সুন্দর নোট বোর্ড।
কার্ডবোর্ড বা কর্কের একটি টুকরো নিয়ে সেটিকে রঙিন কাগজ দিয়ে মুড়ে ফেলুন। চাইলে চারপাশে রঙিন ফিতা, স্টিকার, বোতাম কিংবা পুরোনো কাপড়ের টুকরো দিয়ে সাজিয়ে নিতে পারেন। যদি ছোট ব্যাটারিচালিত ফেয়ারি লাইট থাকে, সেটিও লাগানো যায়।
এরপর বোর্ডটিতে পিন বা ক্লিপ দিয়ে লাগিয়ে রাখা যাবে প্রিয় ছবি, আঁকা, পরীক্ষার রুটিন, গল্পের আইডিয়া, ছোট্ট বার্তা কিংবা ভবিষ্যতে কী হতে চায়, সেই স্বপ্নের তালিকাও।
এটি শুধু ঘর সাজানোর জিনিস নয়। প্রতিদিন নিজের কাজ গুছিয়ে রাখার অভ্যাসও তৈরি হবে।
নিজের হাতে কার্ড বানানো
আজকাল দোকানে কত রকম সুন্দর শুভেচ্ছা কার্ড পাওয়া যায়। কিন্তু নিজের হাতে বানানো একটি কার্ডের গুরুত্ব তার চেয়ে বেশি।
রঙিন কাগজ, রং-পেন্সিল, জলরং, শুকনো ফুল, পাতা, বোতাম, ফিতা কিংবা পুরোনো উপহারের মোড়কের কাগজ, যা আছে তাই দিয়েই তৈরি করা যায় অসাধারণ একটি কার্ড।
জন্মদিন, ঈদ, পূজা, নববর্ষ, মা দিবস, বাবা দিবস কিংবা কোনো উপলক্ষ ছাড়াই কারও মুখে হাসি ফোটানোর জন্যও বানানো যায় এমন কার্ড।
শুধু ছবি আঁকলে হবে না। শিশুকে বলুন, নিজের ভাষায় দু-একটি বাক্য লিখতে। যেমন, ‘দাদি, তোমার গল্প শুনতে আমার খুব ভালো লাগে।’ অথবা ‘বন্ধু, তোমার সঙ্গে খেলতে আমার খুব মজা লাগে।’
এই ছোট্ট লেখাগুলোই কার্ডটিকে আরও বিশেষ করে তুলবে।
চাইলে পরিবারের সবাই মিলে একসঙ্গে কার্ড বানাতে পারেন। তারপর একে অপরকে উপহার দিন। দেখবেন, ছোট্ট একটি কাগজ শিশুর জন্য অনেক আনন্দময় হয়ে উঠতে পারে।

সৃজনশীলত মানেই কেবল সময় কাটানো নয়। প্রতিটি কাজের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে নতুন কিছু শেখার সুযোগ।
কার্ডবোর্ডের গেম বানাতে গিয়ে শিশু শিখছে বিজ্ঞান। পুরোনো বোতল দিয়ে ফুলদানি বানাতে গিয়ে শিখছে পুনর্ব্যবহার। গোপন কোড তৈরি করতে গিয়ে বাড়ছে যুক্তিবোধ। আবার নাটক করতে গিয়ে তৈরি হচ্ছে আত্মবিশ্বাস ও ভাষা প্রকাশের দক্ষতা।
সবচেয়ে বড় কথা, এসব কাজের সময় বাবা-মা, ভাই-বোন, দাদা-দাদি কিংবা নানা-নানি সবাই একসঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ পান। ব্যস্ত জীবনে এমন মুহূর্ত খুব বেশি আসে না।