শিশুর জন্য চকলেটে কি শুধুই ক্ষতি, কতটুকু খাওয়া ভালো?

স্টার অনলাইন ডেস্ক

চকলেট পছন্দ করে না, এমন শিশু খুঁজে পাওয়া কঠিন। স্কুল থেকে ফেরার পথে, বেড়াতে গেলে কিংবা জন্মদিনের অনুষ্ঠানে চকলেট যেন শিশুদের নিত্যসঙ্গী।

সম্প্রতি ব্রিটিশ নিউট্রিশন ফাউন্ডেশন ২ হাজার ৫০০–এর বেশি স্কুলশিক্ষার্থীর ওপর একটি জরিপ চালায়। সেখানে দেখা গেছে, ৩২ শতাংশ শিশু নিয়মিত চকলেট খায়। অর্থাৎ শিশুদের সবচেয়ে জনপ্রিয় খাবারের তালিকায় চকলেট অন্যতম।

তবে অনেক বাবা-মায়ের প্রশ্ন, চকলেট কি শিশুর জন্য ক্ষতিকর? নাকি পরিমিত পরিমাণে খেলে সমস্যা নেই?

ব্রিটিশ শিশু পুষ্টিবিদ অ্যাবি ফ্রিডম্যান সম্প্রতি বিবিসিকে বলেন, চকলেটও স্বাস্থ্যকর খাবারের অংশ হতে পারে। স্বাস্থ্যকর খাবার মানে একদম নিখুঁত হতে হবে ব্যাপারটা এমন নয়। বরং দীর্ঘ সময় ধরে কী ধরনের খাবার খাওয়া হচ্ছে, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।

তার মতে, যদি শিশুর প্রতিদিনের খাবারে ফল, শাকসবজি, শস্য, প্রোটিন ও ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার থাকে, তাহলে মাঝে মাঝে একটু চকলেট খেলে সমস্যা নেই।

Chocolate illustration flat design vector 4595416 Vector Art at Vecteezy
বেশির ভাগ শিশুর জন্য মাঝে মাঝে দুই-তিন টুকরো ডার্ক চকলেট খাওয়া ঠিক আছে। ছবি: সংগৃহীত

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, চকলেটের মূল উপাদান কোকোতে থাকে ফ্লাভানল নামে এক ধরনের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। বড়দের ওপর করা গবেষণায় দেখা গেছে, এটি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং রক্তনালি সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।

তবে অ্যাবি বলেন, বাজারে পাওয়া বেশির ভাগ মিল্ক চকলেটে ফ্লাভানলের পরিমাণ খুব কম। কারণ চকলেট তৈরির সময় অনেকটাই নষ্ট হয়ে যায়। তাই শিশুদের জন্য ফল, শাকসবজি, ডাল, বাদাম, বীজ ও শস্য থেকেই এসব উপকারী উপাদান পাওয়া ভালো।

ডার্ক চকলেট কি বেশি ভালো

অ্যাবি বলেন, স্কুলপড়ুয়া শিশুদের জন্য ডার্ক চকলেট সাধারণত নিরাপদ। তবে কিছু বিষয় মাথায় রাখতে হবে। ডার্ক চকলেটে কোকোর পরিমাণ বেশি থাকে। তাই এতে ফ্লাভানলও বেশি থাকে। কিন্তু এর সঙ্গে তুলনামূলক বেশি ক্যাফেইন এবং থিওব্রোমিন নামের একটি প্রাকৃতিক উপাদান থাকে।

বেশির ভাগ শিশুর জন্য মাঝে মাঝে দুই-তিন টুকরো ডার্ক চকলেট খাওয়া ঠিক আছে। তবে ছোট শিশুদের অনেকের কাছেই ডার্ক চকলেটের স্বাদ তেতো লাগে। তাই শুধু স্বাস্থ্যগত কারণে তাদের জোর করে ডার্ক চকলেট খাওয়ানোর দরকার নেই।

অন্যদিকে, মিল্ক চকলেটে কোকো কম থাকে, ফ্লাভানলও কম থাকে। আবার এতে চিনি বেশি থাকে। তাই বেশি খেলে দাঁতে ক্ষয় হতে পারে এবং ওজন বাড়তে পারে।

আর হোয়াইট চকলেটে ফ্লাভানল থাকে না। তাই ডার্ক চকলেটের মতো স্বাস্থ্য উপকারিতাও এতে নেই।

Download Girl, Eating, Chocolate. Royalty-Free Stock Illustration Image -  Pixabay
৭ থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের দিনে ২৪ গ্রামের বেশি ফ্রি সুগার খাওয়া উচিত নয়। ছবি: সংগৃহীত

চকলেটে কি ক্যাফেইন থাকে

হ্যাঁ, থাকে।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, ৫০ গ্রাম ডার্ক চকলেটে প্রায় ২৫ মিলিগ্রাম ক্যাফেইন থাকে। ৫০ গ্রাম মিল্ক চকলেটে থাকে প্রায় ১০ মিলিগ্রাম ক্যাফেইন।

শিশুদের যতটা সম্ভব ক্যাফেইন কম খেতে পরামর্শ দেন অ্যাবি। যদিও তিনি নির্দিষ্ট কোনো সীমা উল্লেখ করেননি।

তবে শরীরের প্রতি কেজি ওজনের জন্য দিনে ৩ মিলিগ্রাম পর্যন্ত ক্যাফেইন সাধারণত নিরাপদ বলে ধরা হয় বলে জানান তিনি।

অ্যাবির মতে, খুব বেশি চকলেট খাওয়া উচিত নয়। বিশেষ করে ছোট শিশু বা যাদের ক্যাফেইনে সংবেদনশীলতা আছে, তাদের ক্ষেত্রে এতে অস্থিরতা বাড়তে পারে বা ঘুমের সমস্যা হতে পারে।

শিশুর খাবারে চিনি কীভাবে কমাবেন

একটি ৫০ গ্রাম মিল্ক চকলেটে প্রায় ২৫ গ্রাম চিনি থাকে। অর্থাৎ প্রায় ছয় চা-চামচেরও বেশি।

অ্যাবির পরামর্শ অনুযায়ী, ৭ থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের দিনে ২৪ গ্রামের বেশি ফ্রি সুগার খাওয়া উচিত নয়।

ফ্রি সুগার বলতে বোঝায়, খাবারে আলাদা করে যোগ করা চিনি, মধু, সিরাপ, ফলের রসের চিনি ইত্যাদি।

অ্যাবি বলেন, বেশি ফ্রি সুগার দাঁতের ক্ষতি করতে পারে এবং অতিরিক্ত ক্যালরি শরীরের ওজন বাড়ায়।

তবে তিনি বলেন, শুধু চকলেট নিয়ে চিন্তা করার দরকার নেই। সারাদিনে কোমল পানীয়, মিষ্টি দই, বিস্কুট, স্ন্যাক ইত্যাদি থেকেও অনেক চিনি শরীরে যায়। বিশেষ করে চিনিযুক্ত পানীয় খুব অল্প সময়ে শরীরে অনেক চিনি পৌঁছে দেয়, অথচ পেট ভরে না।

অ্যাবির পরামর্শ, প্রতিদিন কত গ্রাম চিনি খেল, সেটা মেপে রাখার দরকার নেই। বরং প্রতিদিনের পানীয় হিসেবে পানি বা দুধ দিন। নিয়মিত দাঁত ব্রাশ করান। ফ্লুরাইডযুক্ত টুথপেস্ট ব্যবহার করুন। আর চকলেটকে ভারসাম্যপূর্ণ খাবারেরই একটি ছোট অংশ হিসেবে রাখুন।

Chocolate Illustration Designs 46903557 Vector Art at Vecteezy
যদি শিশুর প্রতিদিনের খাবারে ফল, শাকসবজি, শস্য, প্রোটিন ও ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার থাকে, তাহলে মাঝে মাঝে একটু চকলেট খেলে সমস্যা নেই। ছবি: সংগৃহীত

পুরস্কার হিসেবে চকলেট দেওয়া উচিত?

অ্যাবির মতে, না।

তিনি বলেন, চকলেটকে পরিবারের স্বাভাবিক খাবারের অংশ হিসেবে দেখানো ভালো। এতে শিশুর খাবারের সঙ্গে সুস্থ সম্পর্ক তৈরি হয়।

যদি চকলেটকে ‘ভালো আচরণ করলে পাবে’ বা ‘সবজি খেলে চকলেট দেব’ এভাবে ব্যবহার করা হয়, তাহলে সেটি শিশুর কাছে আরও লোভনীয় হয়ে ওঠে।

অ্যাবি আরও বলেন, শিশুরা বড়দের আচরণ খুব ভালোভাবে লক্ষ্য করে। যদি বাবা-মা চকলেট খেয়ে অপরাধবোধের কথা বলেন, তাহলে শিশুরাও একই ধারণা শিখবে।

তাই সবচেয়ে ভালো হলো তাকে শান্তভাবে বোঝানো যে, সব খাবারই খাওয়া যায়। তবে কিছু খাবার প্রতিদিনের জন্য, আর কিছু খাবার মাঝে মাঝে খেতে হয়।

স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তুলতে অ্যাবির পরামর্শগুলো হলো—

  • প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে খাবার ও নাশতা দেওয়া।

  • খুব ক্ষুধার্ত অবস্থায় চকলেট না দিয়ে, ফল বা দইয়ের সঙ্গে অল্প চকলেট দেওয়া।

  • ভালো কাজের পুরস্কার হিসেবে চকলেট বা মিষ্টির লোভ না দেখানো।

  • বড়দের পরিমিত পরিমাণে চকলেট খেয়ে শিশুদের সামনে ভালো উদাহরণ তৈরি করতে হবে।

  • শিশুদের সঙ্গে ক্যালরি বা ওজন নিয়ে নয়, বরং কোন খাবার খেলতে, পড়তে ও শক্তি পেতে সাহায্য করে সেসব নিয়ে কথা বলা।

  • বারবার নতুন খাবার দেওয়া, তবে জোর করা যাবে না।

মনে রাখা দরকার, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস একদিনে গড়ে ওঠে না। এটি ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে।