গল্প

জন্মদিনে কী রাঁধবে টুকু!

সানজিদা সামরিন
সানজিদা সামরিন

এবারের জন্মদিনটা বাবাকে ছাড়া কাটবে টুকুর। বাবা নিউইয়র্কে গেছেন কয়েক মাস আগে। ফিরতে আরও কয়েকমাস দেরি হবে। ফলে এবারের জন্মদিনটা বাবাকে ছাড়াই কাটাতে হবে। বাবাকে ছাড়া জন্মদিন মানে তা রঙহীন। কিন্তু বাবাই তো শিখিয়েছেন, জীবনের যেকোনো সময়কেই রাঙিয়ে নিতে হয় নিজের মতো করে।

মায়ের সঙ্গে এবারের জন্মদিনটা কীভাবে কাটানো যায় তাই দিনরাত ভাবছে টুকু। কেমন হয় যদি এবারের জন্মদিনের রান্নাটা টুকু নিজেই করে! হ্যাঁ সে তো ক্লাস সিক্সে উঠে গেছে, রান্না করতে পারাটা আর এমন কী! তাছাড়া বাবা রান্না করতে ভীষণ ভালোবাসেন। টুকুই তো বাবাকে রান্নার সময় সহায়তা করে, কেটে কুটে দেয়, নাড়া দিয়ে দেয় আর বাসনও মেজে দেয়। বাবা কত্ত কী রান্না করেন! সবচেয়ে ভালো রাঁধেন গরুর মাংস। ইশশ, কত দিন বাবার হাতের মাংস খাওয়া হয় না। টুকু ভীষণ মিস করে বাবার হাতের এই খাবারটি।

একটা ডায়েরিতে বাবা তার প্রিয় কিছু রান্নার রেসিপি টুকে রাখেন। এখানে বেশিরভাগ খাবারই রাশান। মানে রাশিয়ার খাবার। বোর্শ, স্ত্রোগানোভ, আলু সসেজ, বিট স্যালাড আরও কত কী। বাবার সঙ্গে রান্নাঘরে থেকে থেকে টুকুও অনেকগুলো শিখে নিয়েছে। আচ্ছা জন্মদিনে পোলাওয়ের সঙ্গে যদি একটু বিফ স্ত্রোগানোভ আর আলু সসেজ রান্না করে সে, তাহলে কেমন হয়? বাবাকেও ভিডিও কলে দেখাবে, কী যে খুশি হবে বাবা। তবে তার আগে একদিন এগুলো রেঁধে দেখতে হবে ঠিকঠাক হচ্ছে কিনা। বাবাই তো শিখিয়েছেন, বিশেষ দিনে কখনও এক্সপেরিমেন্ট করতে নেই। আগে করে দেখতে হয় সব ঠিকঠাক হয় কিনা।

যেই ভাবা সেই কাজ। টুকু ঠিক করলো কোনো এক বৃহস্পতিবার রাতে বিফ স্ত্রোগানোভ, আলু সসেজ আর পোলাও রেঁধে মাকে খাওয়াবে। এজন্য তো বাজারও করতে হবে। মাকে নিয়ে তাই একদিন বাজারেও যেতে হবে। তার আগে লিস্ট করা চাই। টুকু অংক খাতার পেছনের একটা পাতায় লিখতে শুরু করল। লিখল, ‘বাজারের লিস্ট’। এবার নম্বর নিয়ে একে একে লিখল, পোলাওর চাল, মাংস, ক্রিম, মাখন, টমেটো কেচাপ, গোলমরিচ গুঁড়ো, সসেজসহ আরও টুকিটাকি যা যা লাগবে তাও টুকে নিল।

মাকে গিয়ে বলল, ‘মা চলো তো আজ রাতে বাজারে যাই।’

মা জানতে চান, ‘কী লাগবে?’

টুকু জানায়, সে বাবার প্রিয় কয়েকটা খাবার রান্না করতে চায়। অবশ্যই মাকে রান্না করে খাওয়াতে চায় সেগুলো। মা মুচকি হেসে বাজারে নিয়ে যাওয়ার সম্মতি জানালেন। বাজার করা হলো। এবার আসল কাজ।

টুকু ভাবতে শুরু করল, কী করে কাজটা গুছিয়ে করা যায়। প্রথমে ঠিক করল, এক চুলায় বিফ স্ত্রোগানোভটা বসিয়ে নিতে হবে। তারপর অন্য চুলায় আলু সসেজ। সবশেষে পোলাও। বিফ স্ত্রোগানোভের জন্য মাংসটা অন্যভাবে কাটা চাই। সে এক কেজি মাংস খুব চিকন করে কেটে ধুয়ে পানি ঝরিয়ে নিল। এবার ময়দা দিয়ে মাংসগুলো ঢেকে দিল, যেন ভাজার সময় মাংস থেকে পানি বের না হয়। ফ্রাইপ্যানে অল্প তেল দিয়ে ময়দা মাখানো মাংসগুলো কিছুক্ষণ ভাজল। তবে লাল হওয়ার আগেই ফ্রাইপ্যান থেকে নামিয়ে ফেলল। সব মাংস ভাজা হলে সেই ফ্রাইপ্যানে আরেকটু তেল দিয়ে পেঁয়াজ বাদামি করে ভেজে এবার ভেজে রাখা মাংস তাতে ঢেলে দিল।

কিছুক্ষণ পর ফ্রাইপ্যানের চারদিকে মাংস ছড়িয়ে দিয়ে মাঝখানে গোল একটা জায়গা বের করল, সেখানে ১২০ গ্রাম মাখন দিল। একটা পুরো কৌটো ক্রিম দিল এবং ৩ টেবিল চামচ টমেটো সসও দিল। তিনটি উপকরণ একসঙ্গে মিশিয়ে এবার মাংসগুলোর সঙ্গে মিশিয়ে নিল। তারপর গোলমরিচ দিল। কিছুক্ষণ পর গরম পানি দিল। মিশ্রণটি একটু ঘন হয়ে এলে নামিয়ে ফেলল।

এই কাজের ফাঁকেই কিন্তু সে পাশের চুলায় সেদ্ধ আলু সসেজ বসিয়ে দিয়েছিল। আলু আর সসেজ একইভাবে কেটে মাখনে ভেজে তাতে গোলমরিচ আর লবণ ছড়িয়ে নেড়চেড়ে নিলেই তৈরি হয়ে যায়।

সবশেষে পোলাও রান্নার পালা। এটা হয়ে গেলেই টেবিলে খাবার সাজাবে সে। মারও অফিস থেকে আসার সময় প্রায় হয়ে গেছে। তাই চাল ধুয়ে পানি ঝরাতে দিয়েই চুলায় হাঁড়ি চড়িয়ে দিল। তাতে তেল দিয়ে দারচিনি, এলাচ ও তেজপাতা ছেড়ে দিল। পেঁয়াজ দিল নেড়েচেড়ে হালকা বাদামি রঙ এলে পানি ঝরানো চালটা দিয়ে বেশ খানিকক্ষণ নাড়ল। চালটা ভাজা ভাজা হলে তাতে ২ টেবিল চামচ আদা বাটা দিয়ে আবার নাড়তে লাগল। কিছুক্ষণ পর ৮টি কাঁচামরিচ ফালি করে দিয়ে আবার নাড়তে লাগল। এবার প্রয়োজন মতো পানি দিয়ে চালটাকে ফুটতে দিল সে। ফুটে উঠলে লবণ দিয়ে আঁচ কমিয়ে ঢেকে রাখল। চাল সেদ্ধ হলে চুলার ওপর একটি ফ্রাইপ্যান রেখে তার ওপর পোলাওর হাঁড়ি রেখে দমে দিল। ব্যস কিছুক্ষণের মধ্যেই তৈরি হয়ে গেল বাবার রেসিপিতে পোলাও।

টেবিলে ম্যাট বিছিয়ে সবগুলো খাবার সে সুন্দর মতো পরিবেশন করল। ততক্ষণে ঘর মঁ মঁ করছে সুন্দর ঘ্রাণে। মা তো ভীষণ খুশি। বাবাকেও ছবি তুলে ও ভিডিও করে পাঠানো হলো।

মা বললেন, ‘এগুলোই আমরা তোমার জন্মদিনে আবার রাঁধবো। সেদিন খাওয়ার সময় বাবাকেও ভিডিও কল দেব! তুমি পাক্কা রাঁধুনি হয়ে গেছ বাবার মতো!’

বন্ধুরা, তোমরাও কি জন্মদিনে রান্না করবে? করেই দেখো না টুকুর মতো, ভীষণ মজা হবে!