যে দ্বীপে মানুষের পাশেই সাঁতরে বেড়ায় দৈত্যাকার হাঙর
নীল স্বচ্ছ পানিতে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে নৌকা। হঠাৎ পানির নিচে ভেসে উঠল বিশাল এক ধূসর অবয়ব। প্রায় ৯ মিটার দূর থেকে লেজ দুলিয়ে সেটি এগিয়ে আসছে নৌকার দিকে। মুহূর্তেই পরিষ্কার হলো, এটি প্রায় ৭ মিটার দীর্ঘ এক বাস্কিং শার্ক।
তবে নৌকার মানুষের প্রতি তার কোনো কৌতূহল নেই। বিশাল শরীর নিয়ে নিজের মতো করে সাঁতরে যাচ্ছে। যে প্রাণীটিকে এত কাছে থেকে দেখলে ভয় পাওয়ারই কথা, সেটিই আসলে সমুদ্রের এক শান্ত দৈত্য। মুখ হা করে পানি ছেঁকে সে খুঁজে বেড়ায় প্ল্যাঙ্কটনের মতো ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্রাণী, যা খালি চোখে প্রায় দেখাই যায় না।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, আয়ারল্যান্ডের পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে এখন এমন দৃশ্য আর খুব একটা বিরল নয়। প্রতি বছর এপ্রিল থেকে জুলাইয়ের শুরু পর্যন্ত, আবার আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে শত শত বাস্কিং শার্ক ভিড় করে এসব উপকূলে।
খাবারের খোঁজে তারা তীরের এত কাছে চলে আসে যে দূর থেকে মনে হয়, হাত বাড়ালেই বুঝি ছুঁয়ে ফেলা যাবে।
তীরের এত কাছে কেন আসে
আইরিশ বাস্কিং শার্ক গ্রুপের গবেষক ড. চেলসি গ্রে বিবিসিকে বলেন, বাস্কিং শার্ক পৃথিবীর বিভিন্ন সমুদ্রেই দেখা যায়। স্কটল্যান্ড থেকে নিউজিল্যান্ড পর্যন্ত ঠান্ডা পানিতে তাদের বিচরণ রয়েছে।
তবে আয়ারল্যান্ডের উপকূলের বিশেষত্ব হলো, এসব হাঙর এখানে মানুষের খুব কাছে চলে আসে। ফলে স্থলভাগ থেকেও তাদের দেখা যায়। আবার নৌকায় করেও তাদের কাছে যাওয়া সম্ভব।
বিবিসির তথ্য অনুযয়ী, বাস্কিং শার্ক বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মাছ। এটি প্ল্যাঙ্কটন খাওয়া মাত্র তিন প্রজাতির হাঙরের একটি। গ্রেট হোয়াইট শার্কের সঙ্গে এর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। ধীরগতির এই শান্ত স্বভাবের হাঙর ১০ মিটার বা ৩৩ ফুট পর্যন্ত লম্বা হতে পারে।
সমুদ্রের উপরিভাগে সাঁতার কাটার সময় বাস্কিং শার্ক মুখ বড় করে রাখে। পানির সঙ্গে ভেসে আসা জুপ্ল্যাঙ্কটন তখন তার মুখ দিয়ে ঢোকে। দূর থেকে দেখে মনে হয়, হাঙরটি যেন রোদ পোহাচ্ছে।
এ কারণেই স্থানীয় গ্যালিক ভাষায় এর নাম ‘লিয়ামহান গ্রেইনে’, অর্থাৎ ‘সূর্যের মাছ’।
আয়ারল্যান্ডের অগভীর উপকূলীয় পানিতে জুপ্ল্যাঙ্কটনের পরিমাণ বেশি। তাই খাবারের খোঁজে বিশাল এই প্রাণীগুলো তীরের কাছাকাছি আসে। আর সেই দৃশ্য দেখতে এখন দূরদূরান্ত থেকে পর্যটকেরাও আসছেন।
একসময় শিকার করা হতো
আয়ারল্যান্ডের জলসীমায় বাস্কিং শার্কের উপস্থিতি বহু পুরোনো। তবে একসময় এই প্রাণীকে দেখার জন্য নয়, শিকার করার জন্য মানুষ সমুদ্রে যেত।
১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে আচিল দ্বীপ বিশ্বের অন্যতম বড় বাস্কিং শার্ক শিকার ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র ছিল বলে জানায় বিবিসি।
একটি হাঙরের লিভারের ওজন প্রায় এক টন পর্যন্ত হতে পারে। সেই লিভার থেকে তেল সংগ্রহ করা হতো। প্রসাধনী, শিল্পকারখানার লুব্রিকেন্ট এবং ক্ষত সারানোর চিকিৎসায় এই তেল ব্যবহার করা হতো।
হাঙরের পাখনারও ব্যাপক চাহিদা ছিল। বিশেষ করে শার্ক ফিন স্যুপ তৈরিতে এগুলো ব্যবহার করা হতো।
শুধু আয়ারল্যান্ড নয়, নরওয়ে, জাপান, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশের জেলেরাও বাস্কিং শার্ক শিকার করতেন।
কিন্তু এর ফল ছিল ভয়াবহ। ২০ শতকের শেষ দিকে বিশ্বজুড়ে বাস্কিং শার্ক প্রায় বিলুপ্তির পথে চলে যায়।
১৯৮৪ সালে আয়ারল্যান্ডের উপকূলে সর্বশেষ বাস্কিং শার্ক ধরা পড়ে। এরপর ৪০ বছরের বেশি সময় কেটে গেছে। এই সময়ে আয়ারল্যান্ডের জলসীমায় হাঙরটির উপস্থিতি ও দেখার ঘটনা আবার বেড়েছে।
তবে বিশ্বজুড়ে পরিস্থিতি এখনো স্বস্তিদায়ক নয়। ২০১৮ সালে বাস্কিং শার্ককে আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘের রেড লিস্টে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
আবার ফিরছে তারা
আয়ারল্যান্ডের সুন্দর উপকূল বহু বছর ধরেই পর্যটকদের আকর্ষণ করে। সামুদ্রিক প্রাণীর বৈচিত্র্যও এর অন্যতম কারণ।
১৯৯১ সালে আয়ারল্যান্ড ইউরোপের প্রথম স্বীকৃত তিমি ও ডলফিন অভয়ারণ্য হয়।
গত কয়েক দশকে বাস্কিং শার্কের সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে। একইসঙ্গে তাদের দেখতে যাওয়ার প্রবণতাও বেড়েছে।
একসময় এটি ছিল ছোট পরিসরের একটি কর্মকাণ্ড। এখন বাস্কিং শার্ক দেখা আয়ারল্যান্ডের অন্যতম আকর্ষণীয় সামুদ্রিক অভিজ্ঞতা। তবে এই অভিজ্ঞতার সঙ্গে দায়িত্বও আছে।
নৌকার কাছে হাঙর আসুক, মানুষ নয়
মে মাসের এক রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে মুলেট উপদ্বীপের পাশ দিয়ে ব্ল্যাকসড সি সাফারির নৌকায় করে সমুদ্রে যাচ্ছিলেন বিবিসির প্রতিবেদক। পানির ওপর বাতাসও ছিল বেশ জোরে।
তীর থেকে নৌকা যত দূরে যাচ্ছিল, ততই চোখ ছিল পানির দিকে। ঢেউয়ের মধ্যে ডলফিনের দল লাফাচ্ছিল। গ্যানেট পাখি পানিতে ঝাঁপ দিচ্ছিল। কখনো কখনো এই এলাকায় মিনকে তিমিও দেখা যায়।
কিন্তু সেদিন প্রথম দিকে কোনোটিই দেখা গেল না। চোখ ছিল শুধু একটি জিনিসের খোঁজে—বাস্কিং শার্কের বিরল ধূসর পাখনা।
শেষ পর্যন্ত ভাগ্য ফিরল। গাইড নৌকার ইঞ্জিন নিউট্রালে নিয়ে গেলেন। এখন আর নৌকাকে হাঙরের কাছে যেতে হবে না। হাঙরটিকেই নৌকার কাছে আসতে হবে।
সবাই অপেক্ষা করতে থাকলেন। হঠাৎ নীল পানির মধ্যে দেখা গেল ধূসর একটি অবয়ব। নৌকা থেকে প্রায় ৯ মিটার দূরে ছিল সেটি। ধীরে ধীরে লেজ দুলিয়ে হাঙরটি এগিয়ে এল। প্রায় ৭ মিটার লম্বা প্রাণীটি নৌকার একেবারে পাশে দিয়ে চলে গেল।
মানুষের প্রতি তার কোনো আগ্রহ ছিল না। নিজের খাবারের খোঁজেই সে এগিয়ে চলছিল।
দৃশ্যটি অবিশ্বাস্য ছিল। এত বড় একটি প্রাণী এমন ক্ষুদ্র জীব খেয়ে বেঁচে থাকে, যা খালি চোখে প্রায় দেখা যায় না।
সুরক্ষায় আরও কড়াকড়ি
বিবিসি জানায়, ২০২২ সাল থেকে বাস্কিং শার্ককে আইরিশ ওয়াইল্ডলাইফ অ্যাক্টের আওতায় রাখা হয়েছে।
আয়ারল্যান্ডের জলসীমায় এই হাঙর শিকার করা, ক্ষতি করা বা তাদের খাবার সংগ্রহ ও প্রজননের এলাকায় বিরক্ত করা বেআইনি। এটিই একমাত্র মাছের প্রজাতি, যার জন্য এমন সুরক্ষা রয়েছে।
আইরিশ বাস্কিং শার্ক গ্রুপের গবেষক ও সংরক্ষণকর্মীরা আরও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে একটি আচরণবিধিকে আইনে পরিণত করার চেষ্টা করছেন।
পর্যটন পরিচালনাকারীদের জন্য এর অর্থ হলো নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখা।
আচরণবিধি অনুযায়ী, নৌকাগুলোকে বাস্কিং শার্কের কাছে যাওয়া এড়িয়ে চলতে হবে। কোনো হাঙর নৌকার ৫০ মিটারের মধ্যে চলে এলে ইঞ্জিন নিউট্রালে রাখতে হবে।
ডোনেগালের স্লিভ লিগ এলাকায় বাস্কিং শার্ক দেখার ভ্রমণ পরিচালনা করেন স্লিভ লিগ বোট ট্রিপসের মালিক ও নৌকার চালক প্যাডি বায়র্ন।
তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রধান লক্ষ্য হলো প্রাণীগুলোকে যতটা সম্ভব বিরক্ত না করা। আমরা সাধারণত অনেক দূরে অবস্থান করি। তাদের নিজেদের মতো আমাদের কাছে আসতে দিই। নিরাপদ দূরত্বে তাদের গতিপথের সামনে পড়লে কখনো কখনো তারা কাছে আসে। আমাদের দেখে আবার চলে যায়।’
তার কাছে বিষয়টি খুব সহজ।
‘এগুলো বন্য প্রাণী। তাদের দেখতে পাওয়া আমাদের জন্য সৌভাগ্যের বিষয়’, বলেন তিনি।
বাস্কিং শার্কের আচরণ সব সময় অনুমান করা যায় না। তাই সমুদ্রে গেলেই তাদের দেখা যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
তবে হাঙর না মিললেও এসব ভ্রমণে সিল, ডলফিন, সামুদ্রিক পাখি এবং মাঝেমধ্যে মিনকে তিমি দেখা যায়।
আর হাঙর দেখা গেলে সেই অভিজ্ঞতা অনেকের কাছেই হয়ে ওঠে আজীবনের স্মৃতি।
যে দৃশ্য ভুলে থাকা কঠিন
আইল অব ম্যানের বাসিন্দা ইজি শার্প ছোটবেলা থেকেই নিজের বাড়ির উপকূল থেকে বাস্কিং শার্ক দেখেছেন।
কিন্তু কাউন্টি কেরির ব্লাসকেট আইল্যান্ডস ইকো মেরিন ট্যুরসের সঙ্গে এবারের ভ্রমণ তার প্রত্যাশাকেও ছাড়িয়ে যায়।
তিনি বলেন, ‘প্রথম উপসাগর পার হওয়ার আগেই আমরা একটি ছোট বাস্কিং শার্ক দেখেছিলাম।’
ফেরার পথে দৃশ্য আরও বদলে যায়।
তিনি বলেন, ‘হঠাৎ শত শত বাস্কিং শার্ক দেখা দিল। যেদিকেই তাকাই, পানির ওপর তাদের ভেসে উঠতে দেখছিলাম। ব্যাপারটি ছিল অবিশ্বাস্যভাবে বিশেষ।’
আচিল দ্বীপে দীর্ঘদিন ধরে যাতায়াত করা হ্যাজেল কিগানেরও কাছ থেকে হাঙর দেখার অভিজ্ঞতা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘তারা শেষ পর্যন্ত নৌকার চারপাশে সাঁতার কাটতে লাগল। আমরা তাদের মুখের ভেতরের সাদা অংশ খুব স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম। তারা বারবার নৌকার নিচ দিয়ে যাচ্ছিল।’
তখনই প্রথম তিনি বুঝতে পারেন, প্রাণীগুলো আসলে কতটা বড়।
লরা ব্রাউন অনেক দিন ধরেই বাস্কিং শার্ক দেখতে চেয়েছিলেন। তাই একটি হাঙর দেখার আশায় পরিবার নিয়ে আচিল দ্বীপে যান।
সমুদ্রভ্রমণে কোনো হাঙর দেখা গেল না। পরিবারটি হতাশ হয়ে ফিরছিল।
কিন্তু শেষ দিনেই বদলে গেল সবকিছু। দিনটি ছিল রৌদ্রোজ্জ্বল। তাই তারা শেষবারের মতো কিম বে-তে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
সেখানে গিয়ে তারা দেখেন, উপসাগরের পানিতে ছয় থেকে আটটি বাস্কিং শার্ক সাঁতার কাটছে।
লরা বলেন, ‘আমার ছেলে, তার বন্ধু এবং আমি পানিতে স্ট্যান্ড-আপ প্যাডেল বোর্ড নামানোর জন্য দৌড়ে গেলাম। তারা আমাদের নিচ দিয়ে এবং চারপাশ দিয়ে সাঁতার কাটছিল। সত্যিই ছিল জাদুর মতো।’
‘বাকি দিনটা আমরা সৈকতে বসে শুধু তাদের দেখেছি’, বলেন তিনি।
একসময় যে প্রাণীকে মানুষ শিকার করে প্রায় বিলুপ্তির দিকে ঠেলে দিয়েছিল, সেই বাস্কিং শার্ক এখন আবার আয়ারল্যান্ডের উপকূলে ফিরে আসছে।
মানুষও তাদের কাছে যাচ্ছে। তবে এবার শিকারের জন্য নয়, দেখার জন্য। আর সবচেয়ে ভালো দৃশ্যটি হয়তো তখনই, যখন মানুষ দূরে থাকে এবং হাঙর নিজের ইচ্ছায় কাছে আসে।
নৌকা থেকে এত কাছ থেকে বাস্কিং শার্ক দেখার পর তাদের বিশাল আকৃতি, শক্তি ও সৌন্দর্যের প্রতি মুগ্ধতা আরও বেড়ে যায়।