ইউরোপে তাপমাত্রা এত দ্রুত বাড়ছে কেন
ভয়াবহ তাপপ্রবাহে এখন হাঁসফাঁস করছে ইউরোপ। চলতি সপ্তাহে ব্রিটেন, আয়ারল্যান্ড ও ফ্রান্সে মে মাসের আগের সব তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙে গেছে। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, সামনের দিনগুলোতে আরও তীব্র গরম পড়তে পারে।
এই গরমের বড় কারণ একটি ‘হিট ডোম’। উত্তর আফ্রিকা থেকে আসা গরম বাতাস পশ্চিম ইউরোপের ওপর শক্তিশালী উচ্চচাপ বলয়ের নিচে আটকে গেছে। ফলে এমন তাপপ্রবাহ তৈরি হয়েছে, যা সাধারণত গ্রীষ্মের মাঝামাঝি সময়ে দেখা যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউরোপ এখন পৃথিবীর সবচেয়ে দ্রুত উষ্ণ হয়ে ওঠা মহাদেশ। এর পেছনে রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন, বদলে যাওয়া আবহাওয়ার ধরন, দ্রুত গরম হওয়া আর্কটিক অঞ্চল এবং আরও কয়েকটি কারণ।
উচ্চ তাপমাত্রা
শিল্পবিপ্লবের আগের সময়ের তুলনায় পুরো পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা এখন প্রায় ১ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। কিন্তু ইউরোপে সেই বৃদ্ধি প্রায় ২ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের জলবায়ু পর্যবেক্ষণ সংস্থা কপারনিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিস এই তথ্য জানিয়েছে।
লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের জলবায়ু ও চরম আবহাওয়া গবেষক বেন ক্লার্ক এএফপিকে বলেন, এই অতিরিক্ত গরমের প্রায় পুরোটাই মানুষের কারণে তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে যে গ্রিনহাউস গ্যাস তৈরি হচ্ছে, সেটাই মূল কারণ।
তার মতে, পৃথিবীতে বাড়তি যে তাপ জমছে, তা কোথায় কত বেশি প্রভাব ফেলবে, সেটি নির্ভর করে বিভিন্ন ভৌগোলিক ও আবহাওয়াগত বিষয়ের ওপর।
বদলে যাচ্ছে ইউরোপের আবহাওয়া
কপারনিকাস বলছে, ইউরোপে এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি তীব্র ও ঘনঘন তাপপ্রবাহ দেখা যাচ্ছে। এর পেছনে বড় কারণ বায়ুমণ্ডলের পরিবর্তিত আচরণ।
বিশেষ করে ‘হাই-প্রেশার সিস্টেম’ বা উচ্চচাপ বলয় এখন বেশি তৈরি হচ্ছে। এই ধরনের আবহাওয়া সাধারণত আকাশ পরিষ্কার রাখে এবং তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়।
কপারনিকাসের পরিচালক কার্লো বুয়োনতেম্পো এএফপিকে বলেন, গত ২০ থেকে ৩০ বছরে, বিশেষ করে গ্রীষ্মকালে, ইউরোপে এমন আবহাওয়া অনেক বেশি দেখা যাচ্ছে, যা তাপপ্রবাহের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
তবে তিনি এটাও বলেন, এই উচ্চচাপ বলয়ের সংখ্যা বাড়া পুরোপুরি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কি না, নাকি এটি সাময়িক কোনো প্রাকৃতিক ওঠানামা—তা নিয়ে এখনো বিজ্ঞানীদের মধ্যে আলোচনা চলছে।
এ ধরনের উচ্চচাপ বলয়কে ব্লকিং হাইও বলা হয়। কারণ এটি এক জায়গায় দীর্ঘ সময় স্থির থাকে এবং অন্য আবহাওয়া ব্যবস্থাকে বাধাগ্রস্ত করে।
আয়ারল্যান্ডের ট্রিনিটি কলেজ ডাবলিনের ভূগোলের অধ্যাপক মেরি বুর্ক বলেন, এ সময় আকাশে মেঘ থাকে না। স্থির গরম বাতাস নিচের দিকে নেমে আসে এবং বাতাসের আর্দ্রতা কমিয়ে দেয়। ফলে আবহাওয়া শুধু গরমই নয়, অনেক বেশি শুষ্কও হয়ে পড়ে।
দ্রুত গরম হচ্ছে আর্কটিক, প্রভাব পড়ছে ইউরোপে
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউরোপের ভৌগোলিক অবস্থানও একটি বড় কারণ। কারণ ইউরোপ সরাসরি আর্কটিক অঞ্চলের সঙ্গে সংযুক্ত।
আর আর্কটিক এখন পৃথিবীর সবচেয়ে দ্রুত উষ্ণ হয়ে ওঠা অঞ্চলগুলোর একটি।
কপারনিকাসের তথ্য অনুযায়ী, শিল্পবিপ্লবের আগের সময়ের তুলনায় আর্কটিক অঞ্চলের তাপমাত্রা ইতোমধ্যে প্রায় ৩ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে।
বেন ক্লার্ক বলেন, সমুদ্রের বরফ গলে গেলে সাগরের পানি বেশি তাপ শোষণ করে। এতে পানি আরও গরম হয় এবং আরও বেশি বরফ গলে যায়। এটিকে বলা হয় অ্যালবিডো ফিডব্যাক।
সাধারণত সাদা বরফ ও তুষার সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে দেয়। কিন্তু বরফ গলে গেলে নিচের গাঢ় রঙের মাটি বা পানি বেরিয়ে আসে, যা অনেক বেশি তাপ শোষণ করে। ফলে উষ্ণতা আরও বাড়তে থাকে।
কমে যাচ্ছে তুষারপাত
কার্লো বুয়োনতেম্পো বলেন, ইউরোপের অনেক অঞ্চলে এখন আগের মতো দীর্ঘ সময় তুষার পড়ে না বা বরফ জমে থাকে না।
তিনি বলেন, আগে যেসব এলাকায় শীতে অন্তত এক সপ্তাহ বা তার বেশি সময় বরফ জমে থাকত, এখন সেখানে সেই অবস্থা আর দেখা যাচ্ছে না। ফলে সাদা তুষারের বদলে এখন বেশি দেখা যাচ্ছে কালো মাটি।
আর কালো মাটি তাপ বেশি শোষণ করে, যা উষ্ণতা আরও বাড়ায়।
বায়ুদূষণ কমলেও বেড়েছে তাপ
১৯৮০ দশক থেকে ইউরোপে বায়ুদূষণ কমাতে কঠোর আইন চালু হয়েছে। এতে বাতাসে থাকা ক্ষুদ্র কণা বা অ্যারোসল অনেক কমে গেছে।
এটি মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য অবশ্যই ভালো খবর। কারণ এতে শ্বাসকষ্ট ও ফুসফুসের রোগ কমে। তবে এর একটি উল্টো প্রভাবও আছে।
বেন ক্লার্ক বলেন, বাতাসে থাকা অনেক ধরনের ক্ষুদ্র কণা সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে পৃথিবীকে কিছুটা ঠাণ্ডা রাখতে সাহায্য করত। এখন সেগুলো কমে যাওয়ায় পৃথিবীর পৃষ্ঠে আরও বেশি সূর্যালোক পৌঁছাচ্ছে।
ফলে তাপমাত্রাও বেড়ে যাচ্ছে।
ইউরোপের সব জায়গা সমানভাবে গরম হচ্ছে না
কপারনিকাসের তথ্য অনুযায়ী, গত ৩০ বছরে পূর্ব ইউরোপ, দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপ এবং মধ্য ইউরোপের কিছু অংশে প্রতি দশকে তাপমাত্রা বেড়েছে প্রায় ০.৫ থেকে ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বিশেষ করে আল্পস অঞ্চলে।
অন্যদিকে পশ্চিম ইউরোপ, দক্ষিণ-পশ্চিম ইউরোপ এবং ফিনল্যান্ড, নরওয়ে ও সুইডেনের কিছু সাব-আর্কটিক অঞ্চলে প্রতি দশকে তাপমাত্রা বেড়েছে ০.২ থেকে ০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
তবে সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা নরওয়ের আর্কটিক দ্বীপপুঞ্জ সভালবার্ডে। মেরুভালুকের আবাস হিসেবে পরিচিত এই অঞ্চলে প্রতি দশকে তাপমাত্রা বাড়ছে প্রায় ১ দশমিক ৫ থেকে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
সভালবার্ড এখন পৃথিবীর সবচেয়ে দ্রুত উষ্ণ হয়ে ওঠা অঞ্চলগুলোর একটি। ২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সেখানে রেকর্ড গরম পড়েছে। আর গত বছর ছিল তাদের ইতিহাসের চতুর্থ উষ্ণতম গ্রীষ্ম।