শিশুর নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহারে অভিভাবকের করণীয়

dipu mahmud
দীপু মাহমুদ

বর্তমানে শিশুকিশোরদের পড়াশোনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম ইন্টারনেট। স্কুলের প্রজেক্ট, অ্যাসাইনমেন্ট, তথ্য খোঁজা কিংবা অনলাইন ক্লাস—সবকিছুতেই এর প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে বন্যা, মহামারি বা অন্য কোনো দুর্যোগের সময় শিক্ষার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে ইন্টারনেটের বিকল্প নেই।

তবে প্রয়োজনের জন্য ইন্টারনেট ব্যবহার করতে গিয়ে অনেক শিশু গেম, কার্টুন বা বিভিন্ন বিনোদনমূলক কনটেন্টে আসক্ত হয়ে পড়ে। ফলে তারা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সময় অনলাইনে কাটায়। এর প্রভাব পড়ে তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে। শুধু তাই নয়, অনলাইনে তারা নানা ধরনের অনিরাপদ পরিস্থিতি, ভুয়া তথ্য, সাইবার বুলিং কিংবা অনুপযুক্ত কনটেন্টের মুখোমুখিও হতে পারে।

তাই শিশু যেন নিরাপদ, দায়িত্বশীল ও সঠিকভাবে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে শেখে, সে জন্য অভিভাবকের সচেতন ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাড়িতে নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ গড়ে তোলা

আজকের দিনে ইন্টারনেটকে পুরোপুরি এড়িয়ে চলা সম্ভব নয়। তাই শিশুর জন্য ঘরেই নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

পরিবারে আগে থেকেই ঠিক করে নিন, কখন, কোথায় এবং কী উদ্দেশ্যে শিশু ইন্টারনেট ব্যবহার করবে। সম্ভব হলে ড্রইংরুম বা পরিবারের সবার চোখের সামনে থাকা জায়গায় ডিভাইস ব্যবহার করতে দিন। পড়াশোনার প্রয়োজন ছাড়া অকারণে দীর্ঘ সময় মোবাইল, ট্যাব বা কম্পিউটার ব্যবহার করতে নিরুৎসাহিত করুন।

খাওয়ার সময় পরিবারের সবাই মোবাইল, ট্যাব, টেলিভিশন বা অন্য কোনো ডিভাইস থেকে দূরে থাকুন। একইভাবে ঘুমাতে যাওয়ার অন্তত এক ঘণ্টা আগে সব ধরনের স্ক্রিন ব্যবহার বন্ধ করার অভ্যাস গড়ে তুলুন। শোবার ঘরকে ডিভাইসমুক্ত রাখাও ভালো অভ্যাস।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ মেনে চলুন

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা শিশুদের স্ক্রিন ব্যবহারের বিষয়ে কিছু নির্দেশনা দিয়েছে।

  • ০–২ বছর: কোনো ধরনের স্ক্রিন ব্যবহার নয়।

  • ২–৫ বছর: দিনে সর্বোচ্চ এক ঘণ্টা।

  • ৬ বছর বা তার বেশি: প্রয়োজন অনুযায়ী সীমিত সময় স্ক্রিন ব্যবহার, তবে নিয়মিত খেলাধুলা ও শারীরিক কর্মকাণ্ড নিশ্চিত করতে হবে।

শিশুকে সঙ্গে নিয়েই নিয়ম ঠিক করা

শিশুর ওপর নিয়ম চাপিয়ে না দিয়ে তার সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিন। কখন ইন্টারনেট ব্যবহার করবে, কতক্ষণ ব্যবহার করবে কিংবা কখন টেলিভিশন দেখবে—এসব বিষয়ে পরিবারের সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিন।

নিয়ম শুধু শিশুর জন্য নয়, বড়দেরও মেনে চলা উচিত। সপ্তাহে অন্তত একটি নির্দিষ্ট সময় ঠিক করুন, যখন পরিবারের কেউ মোবাইল বা ইন্টারনেট ব্যবহার করবে না। সেই সময়টুকু গল্প, আড্ডা বা একসঙ্গে কোনো আনন্দের কাজে কাটান।

শিশুকে সময় দিন

শিশুর সবচেয়ে বড় চাহিদা দামি গ্যাজেট নয়, বাবা-মায়ের সময়। তাই শিশুর সঙ্গে খেলাধুলা করুন। ব্যস্ততার মাঝে সুযোগ পেলেই শিশুকে নিয়ে বেড়াতে যান। রাতে ঘুমানোর আগে গল্প বলুন বা গল্পের বই পড়ে শোনান। কেবল নিজে গল্প না বলে শিশুর থেকেও গল্প শুনুন।

এছাড়া ঘরের সাধারণ জিনিস দিয়েই শেখার মতো মজার খেলা খেলতে পারেন। শিশুর জন্য আলাদা একটি খেলার ও বই রাখার জায়গা তৈরি করুন। ছাদ বা উঠোনে একসঙ্গে গাছ লাগান, গাছের যত্ন নিতে উৎসাহ দিন।

সপ্তাহে অন্তত একটি দিন পরিবারের সবার জন্য বই পড়া বা একসঙ্গে গল্প করার রুটিন ঠিক করুন। আর বাড়িতে এমন পরিবেশ তৈরি করুন, যেখানে সবাই নিজের আনন্দ, কষ্ট বা সমস্যার কথা খোলামেলা বলতে পারে।

প্যারেন্টাল কন্ট্রোল ব্যবহার

প্রযুক্তিকে শিশুর নিরাপত্তার জন্যও কাজে লাগানো যায়। ডিভাইসে প্যারেন্টাল কন্ট্রোল চালু করুন। এতে বয়সের অনুপযুক্ত ওয়েবসাইট, ভিডিও বা অ্যাপ সীমিত করা যায়। পাশাপাশি প্রয়োজন হলে শিশুর অনলাইন কার্যক্রমও পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়।

নজর রাখুন, তবে নজরদারি নয়

শিশু কী করছে, তা জানার চেষ্টা করুন। তবে এমনভাবে করা যাবে না, যেন সে মনে করে তাকে সব সময় সন্দেহ করা হচ্ছে।
মাঝেমধ্যে ব্রাউজিং হিস্ট্রি দেখুন, প্রয়োজন হলে পর্যবেক্ষণমূলক অ্যাপ ব্যবহার করুন। সবচেয়ে ভালো হয়, ছোট শিশু ইন্টারনেট ব্যবহার করলে পাশে বসে থাকা। এতে প্রয়োজনে তাৎক্ষণিকভাবে তাকে সাহায্য করা যায়।

সমস্যা হলে ব্যবস্থা নেওয়া

অনলাইনে শিশু যদি সাইবার বুলিং, প্রতারণা বা অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো ঘটনার মুখোমুখি হয়, তাহলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিন।

শিশুর কথা মন দিয়ে শুনুন। প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মে রিপোর্ট করুন। ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এলে কীভাবে মোকাবিলা করতে হবে, সে বিষয়েও তাকে বুঝিয়ে বলুন।

ইন্টারনেট নিরাপত্তা নিয়ে নিয়মিত কথা বলা

শিশুর সঙ্গে নিয়মিত অনলাইন নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা করুন।

তাকে বোঝান, নিজের ছবি, ঠিকানা, ফোন নম্বর, পাসওয়ার্ড বা ব্যক্তিগত তথ্য কখনো অপরিচিত কারও সঙ্গে শেয়ার করা উচিত নয়। বাস্তব উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বুঝিয়ে বললে তারা সহজে মনে রাখতে পারে।

বিশ্বাসের সম্পর্ক গড়ে তোলা

শিশু যেন যেকোনো সমস্যায় প্রথমে বাবা-মায়ের কাছেই আসে, সেই পরিবেশ তৈরি করুন। তাকে বুঝিয়ে দিন, অনলাইনে কোনো অস্বস্তিকর ঘটনা ঘটলে বা কেউ বিরক্ত করলে লুকানোর প্রয়োজন নেই। বাবা-মা তাকে বকবেন না; বরং পাশে থাকবেন।

অভিভাবকদের জন্য কিছু কথা

সন্তান অনলাইনে কোনো সমস্যায় পড়লে বা আপনার কাছে সাহায্য চাইলে প্রথমেই তার কথা বিশ্বাস করুন। ধৈর্য ও সহানুভূতির সঙ্গে তার কথা শুনুন এবং তাকে বুঝতে চেষ্টা করুন। সাইবার বুলিং বা অন্য কোনো অনলাইন হয়রানির শিকার হলে তাকে মানসিকভাবে শক্ত থাকতে সহায়তা করুন।

আবেগের বশে কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়ে শান্তভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করুন। একই সঙ্গে সন্তানের আত্মবিশ্বাস ও আত্মসম্মান ফিরে পেতে নিয়মিত উৎসাহ দিন। সমস্যা মিটে যাওয়ার পরও তার সঙ্গে খোলামেলা কথা বলুন, খোঁজখবর নিন এবং সব সময় মানসিকভাবে পাশে থাকুন।

এতে সন্তান যেকোনো অনলাইন ঝুঁকি বা সমস্যার কথা নির্ভয়ে আপনার সঙ্গে ভাগ করে নিতে উৎসাহ পাবে।

শেষ কথা ইন্টারনেট এখন শিশুদের শেখা, জানা ও বেড়ে ওঠার গুরুত্বপূর্ণ একটি মাধ্যম। তাই তাদের ইন্টারনেট থেকে দূরে রাখা নয়, বরং নিরাপদ ও দায়িত্বশীলভাবে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে শেখানোই সবচেয়ে জরুরি।

লেখক: চাইল্ড কেয়ার, ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড এডুকেশন কনসালটেন্ট, ইউনিসেফ