বাংলাদেশ থেকে প্রতিবেশী দেশগুলোতে ‘আনফিল্টার্ড’ ইন্টারনেট রপ্তানি করতে পারবে স্টারলিংক
বাংলাদেশ থেকে প্রতিবেশী দেশগুলোতে ‘আনফিল্টার্ড’ ইন্টারনেট সরবরাহের স্টারলিংককে অনুমোদন দিয়েছে সরকার।
কোনো স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানকে সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এ ধরনের অনুমতি দেওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম।
বিষয়টি নিয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের (পিটিডি) কাছ থেকে সবুজ সংকেত পাওয়ার পর সম্প্রতি বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) এ অনুমতি দেয় স্টারলিংকে।
এর মাধ্যমে ইন্টারনেট সরবরাহের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আঞ্চলিক হাব বা সংযোগ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। একইসঙ্গে স্থানীয় আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ রপ্তানি করে টেলিকম অবকাঠামো কোম্পানিগুলোর জন্য বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের একটি নতুন পথ খুলে গেছে।
এ-সংক্রান্ত কিছু নথিপত্র পেয়েছে দ্য ডেইলি স্টার।
এতে দেখা যায়, গত বছরের শেষ দিকে স্টারলিংক ও ইন্টারন্যাশনাল টেরিস্ট্রিয়াল কেবল (আইটিসি) অপারেটরদের সঙ্গে কয়েক মাসের অভ্যন্তরীণ আলোচনা হয়।
এ সময়ে কারিগরি পর্যালোচনা ও চিঠিপত্র আদান-প্রদানের পর ফেব্রুয়ারিতে বিটিআরসি বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন চায়।
অনুমোদনের প্রক্রিয়া অনুযায়ী, মূল ব্যান্ডউইথ সরবরাহকারী হবে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবল কোম্পানি লিমিটেড (বিএসসিসিএল)।
ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ তাদের অনুমোদন পত্রে জানিয়েছে, 'জানা গেছে, বিএসসিসিএলের সঙ্গে স্টারলিংকের তিন বছর মেয়াদি একটি আন্তর্জাতিক প্রাইভেট লিজড সার্কিট (আইপিএলসি) সংযোগ চুক্তি রয়েছে। প্রতিবেশী দেশগুলোতে সেবা দিতে স্টারলিংক বিএসসিসিএলের সঙ্গে বিদ্যমান চুক্তির আওতায় এই ব্যান্ডউইথ গ্রহণ করতে পারে।'
তবে মন্ত্রণালয় আরও বলেছে, যদি বিএসসিসিএলের ইন্টারনেট সরবরাহের প্রয়োজনীয় সক্ষমতা না থাকে, তবে সামিট কমিউনিকেশনস লিমিটেড ও ফাইবার@হোম লিমিটেড থেকে স্টারলিংক ব্যান্ডউইথ নিতে পারবে।
সরকারের এই অনুমোদনের পর, বিটিআরসি আনুষ্ঠানিকভাবে স্টারলিংকের গ্লোবাল লাইসেন্সিং অ্যান্ড মার্কেট অ্যাক্টিভেশন বিষয়ক পরিচালক রেবেকা হান্টারকে একটি ই-মেইলের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় রেগুলেটরি ক্লিয়ারেন্স বা নিয়ন্ত্রণমূলক ছাড়পত্রের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
বর্তমানে সিঙ্গাপুরের সঙ্গে যুক্ত দুটি সাবমেরিন ক্যাবল এবং ভারত থেকে ব্যান্ডউইথ আমদানিকারী ৭টি আন্তর্জাতিক টেরিস্ট্রিয়াল ক্যাবল অপারেটরের মাধ্যমে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ পায়।
ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান (আইএসপি), মোবাইল অপারেটর ও অন্যান্য গ্রাহকদের কাছে পৌঁছানোর আগে এই আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ সরকারের নজরদারি ব্যবস্থার মাধ্যমে ফিল্টার (পরিশোধন) করা হয়।
আনফিল্টার্ড ব্যান্ডউইথ মূলত ফায়ারওয়াল, ডিপ প্যাকেট ইনস্পেকশন বা অ্যাপ্লিকেশন ব্লকিংয়ের মতো নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাগুলোকে এড়িয়ে যায়—যা সাধারণত সরকার বা অপারেটররা তথ্য পর্যবেক্ষণ বা ইন্টারনেট ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যবহার করে থাকে।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের সীমান্ত পেরিয়ে আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট ট্রাফিক পরিবহনের জন্য এই ধরনের আনফিল্টার্ড ইন্টারনেট প্রোটোকল (আইপি) ট্রানজিট অপরিহার্য।
বিটিআরসির চেয়ারম্যান মো. এমদাদ উল বারী ডেইলি স্টারকে বলেন, 'এই আনফিল্টার্ড ব্যান্ডউইথ বাংলাদেশের ভেতরে সরবরাহ করা হবে না। এটি সরাসরি অন্য দেশগুলোতে চলে যাবে।'
এ বিষয়ে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির বলেন, 'এই অনুমোদনের ফলে বাংলাদেশ একটি আঞ্চলিক ডেটা কানেক্টিভিটি হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে পারে এবং স্থানীয় অপারেটরদের রপ্তানি আয় বাড়াতে সাহায্য করবে।'
তিনি ডেইলি স্টারকে বলেন, 'অন্য কোনো দেশের ফিল্টার করা ব্যান্ডউইথ কোনো দেশই ব্যবহার করতে চাইবে না।'
নেপাল ও ভুটানের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোর নির্ভরযোগ্য ও উচ্চমানের ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করতে এই ধরনের আনফিল্টার্ড কানেক্টিভিটির প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
বাংলাদেশে নন-জিওস্টেশনারি স্যাটেলাইট অরবিট সেবা দিতে ২০২৫ সালের ২৯ এপ্রিল বিটিআরসির লাইসেন্স পায় স্টারলিংক। পরের মাসে বাণিজ্যিক সেবা চালু হয় এবং ৮ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করে স্টারলিংক।
বিশ্বের শীর্ষ ধনী ইলন মাস্কের মালিকানাধীন এ কোম্পানিটি বর্তমানে বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ ব্যবহারের জন্য দুটি আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট গেটওয়ে অপারেটরের কাছ থেকে ৮০ জিবিপিএস ব্যান্ডউইথ নিচ্ছে।
প্রতিবেশী দেশগুলোতে সংযোগের জন্য স্টারলিংকের এই অনুমতি নেওয়ার প্রক্রিয়াটি শুরু হয় গত বছরের আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে। তখন তারা প্রতিবেশী দেশগুলোর গ্রাহকদের জন্য ইন্টারনেট ট্রাফিক পরিবহনে বাংলাদেশি অপারেটরদের কাছ থেকে আইপিএলসি সংযোগ এবং আনফিল্টার্ড আইপি ট্রানজিট ব্যবহারের আবেদন জানায়।
এই ব্যান্ডউইথ যেন শুধু অন্য দেশের গ্রাহকদের জন্যই ব্যবহৃত হয়, বাংলাদেশে অবস্থানরত কোনো ব্যবহারকারী বা বিদেশি পর্যটকরা যেন এটি ব্যবহার করতে না পারে—পর্যালোচনা প্রক্রিয়ার সময় এ বিষয়ে স্টারলিংককে কঠোর নির্দেশ দেয় বিটিআরসি।
এছাড়াও, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ডেটা ট্রাফিক আলাদা রাখার জন্য শক্তিশালী কারিগরি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে বলা হয় কোম্পানিটিকে।
পাশাপাশি ট্রাফিক প্রবাহের রিয়েল-টাইম (তাৎক্ষণিক) যাচাইকরণের জন্য বিস্তারিত নেটওয়ার্ক ডায়াগ্রাম এবং মনিটরিং টুলস জমা দেওয়ার নির্দেশ দেয় বিটিআরসি।
জবাবে স্টারলিংক জানায়, বিদেশি গ্রাহকদের ইন্টারনেট ট্রাফিক বাংলাদেশের ভেতরে তাদের পয়েন্টস অব প্রেজেন্স এবং সিঙ্গাপুর ও ওমানের মতো বিদেশি লোকেশনগুলোর মধ্যে লিজড সার্কিট সংযোগের মাধ্যমে পরিবাহিত হবে, যার মধ্যে বাংলাদেশি গ্রাহকদের কোনো ডেটা থাকবে না।
পরে ২০২৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর বিটিআরসি, ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (এনটিএমসি), স্টারলিংক এবং সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে একটি উচ্চপর্যায়ের কারিগরি সভায় বিষয়টি নিয়ে আরও আলোচনা হয়।
সভায় কালিয়াকৈরে অবস্থিত স্টারলিংকের পয়েন্ট অব প্রেজেন্সে তাদের মনিটরিং, রিপোর্টিং ও পরিদর্শন ব্যবস্থার বিষয়টি পর্যালোচনা করা হয়।
গত ১৩ জানুয়ারি এক চিঠিতে স্টারলিংক বিটিআরসিকে জানায়, তারা হালনাগাদ নেটওয়ার্ক ডায়াগ্রাম জমা দিয়েছে, রেগুলেটরি সব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে এবং আনফিল্টার্ড আইপি ট্রানজিটের জন্য সামিট কমিউনিকেশনস ও ফাইবার অ্যাট হোমে আবেদন করার পাশাপাশি এনটিএমসির আইনি ইন্টারসেপশন (নজরদারি) শর্তাবলী পূরণ করেছে।
এছাড়া কোম্পানিটি একটি কমপ্লায়েন্স এপিআই সরবরাহ করেছে, যার মাধ্যমে বাংলাদেশি গ্রাহকদের ডেটা সরাসরি যাচাই করা সম্ভব হবে বলেও জানানো হয়।
সরকারের কাছে এই প্রস্তাবের সুপারিশ করার আগে বিটিআরসি ব্যান্ডউইথ রপ্তানির একটি উদাহরণও তুলে ধরে।
কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বিএসসিসিএল ভারতের বিএসএনএলকে বিভিন্ন চুক্তির অধীনে ২০ জিবিপিএস পর্যন্ত আনফিল্টার্ড আইপি ট্রানজিট সরবরাহ করেছিল, যা প্রমাণ করে যে বাংলাদেশে আনফিল্টার্ড ব্যান্ডউইথ রপ্তানির বিষয়টি একেবারে নতুন নয়।