প্রযুক্তির কারণে কঠিন হচ্ছে প্যারেন্টিং, সামলাবেন যেভাবে
ইন্টারনেট পৃথিবীকে বদলে দিয়েছে। আজকের শিশুরা এমন এক সময়ে বড় হচ্ছে, যে সময়টা তাদের বাবা-মায়ের শৈশবের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। প্রযুক্তি প্রতিদিন বদলাচ্ছে, নতুন নতুন অ্যাপ, গেম ও অনলাইন ট্রেন্ড আসছে। ফলে সন্তান অনলাইনে কী করছে, কী দেখছে বা কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে—এসব বিষয়ে সবসময় খোঁজ রাখা অনেক অভিভাবকের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।
প্রযুক্তি কীভাবে অভিভাবকত্বকে কঠিন করে তুলেছে এবং এই পরিস্থিতি সামলানোর উপায় নিয়ে বিবিসি বাইটসাইজ প্যারেন্টস টুলকিটের সঙ্গে কথা বলেন যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান চাইল্ডনেটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা উইল গার্ডনার।
মোবাইল ফোন: সুবিধা যেমন আছে, ঝুঁকিও তেমন আছে
উইল গার্ডনার বলেন, মোবাইল ফোন অনেক সময় শিশুদের জন্য খুব উপকারী হতে পারে। প্রয়োজনে তারা সাহায্য চাইতে পারে, বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারে, এমনকি অনেক কিছু শিখতেও পারে। কিন্তু এর সঙ্গে কিছু ঝুঁকিও আছে।
তিনি অনলাইন ঝুঁকিগুলোকে চারটি ভাগে ভাগ করেছেন—কনটেন্ট, যোগাযোগ, আচরণ, বাণিজ্য।
কনটেন্ট: অনলাইনে শিশুরা বয়সের অনুপযোগী বা ক্ষতিকর কনটেন্ট দেখতে পারে। এর মধ্যে সহিংসতা, অশালীন বিষয়, ভুল তথ্য বা বিভ্রান্তিকর তথ্য থাকতে পারে। তাই এ ব্যাপারে অভিভাবকদের সচেতন হওয়া খুব দরকারি।
যোগাযোগ: পাশাপাশি অনলাইনে অপরিচিত মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের ঝুঁকি থাকে। এতে শিশু অনলাইন বুলিংয়ের শিকার হতে পারে। আবার এমন মানুষের সঙ্গে পরিচয় হতে পারে, যাদের উদ্দেশ্য ভালো নয়।
আচরণ: শিশুর নিজের অনলাইন আচরণও তাকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। যেমন—কী পোস্ট করছে, কার সঙ্গে কী শেয়ার করছে, ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করছে কি না।
বাণিজ্য: বর্তমান বিশ্বে অনলাইন বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে অনলাইনে প্রতারণা, ফিশিং, অজান্তে টাকা খরচ হয়ে যাওয়া কিংবা বিজ্ঞাপনের ফাঁদে পড়ার ঝুঁকি থেকে যায়।
উইল গার্ডনার বলেন, মোবাইল ফোনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, এটি শিশুদের অনেক স্বাধীনতা দেয়। তারা সহজেই ছবি তুলতে পারে, কনটেন্ট দেখতে পারে বা শেয়ার করতে পারে, যা সবসময় অভিভাবকদের নজরে রাখা সম্ভব হয় না। তবে কিছু সেটিংস ব্যবহার করলে ঝুঁকি অনেকটাই কমানো যায়।
টেকক্রাঞ্চের প্রতিবেদনে বলা হয়, অ্যাপলের ফ্যামিলি শেয়ারিং ও গুগলের ফ্যামিলি লিংকের মতো ফিচার ব্যবহার করে অভিভাবকেরা অ্যাপ ডাউনলোডের আগে অনুমতি চাইতে বাধ্য করতে পারেন, স্ক্রিন টাইম দেখতে পারেন, নির্দিষ্ট অ্যাপের সময়সীমা নির্ধারণ করতে পারেন, সন্তানের অবস্থান জানতে পারেন।
উইলের পরামর্শ হলো, শুরু থেকেই এসব নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু করা ভালো।
ল্যাপটপ ও ট্যাবলেট: শেখার সুযোগ, তবে সতর্কতা দরকার
ল্যাপটপ ও ট্যাবলেট শিশুদের শেখার জন্য অনেক উপকারী। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব পরিবারে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ আছে, সেসব শিশুরা লেখাপড়ায় তুলনামূলক ভালো করে।
বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, লকডাউনের সময় বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছিল। যেসব শিশুর কাছে ল্যাপটপ বা প্রযুক্তি ছিল না, তারা অনেক ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়েছিল। তবে ইন্টারনেট যেমন সুযোগ দেয়, তেমনি ঝুঁকিও তৈরি করে।
উইল বলেন, ল্যাপটপ বহন করা সহজ হওয়ায় অভিভাবকদের জন্য নজরদারি করা কঠিন হতে পারে।
ম্যাশেবলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, তবে বেশিরভাগ ডিভাইসেই এখন নিরাপত্তা ব্যবস্থা আছে। যেমন—উইন্ডোজের প্যারেন্টাল কন্ট্রোল, ক্রোমবুকের চাইল্ড অ্যাকাউন্ট, অ্যাপলের স্ক্রিন টাইম।
এসব ফিচারের মাধ্যমে অভিভাবকেরা নির্ধারণ করতে পারেন—শিশু কোন ওয়েবসাইটে যাবে, কতক্ষণ ডিভাইস ব্যবহার করবে, কী ধরনের কনটেন্ট দেখবে।
এছাড়া বাড়ির ওয়াইফাইয়ের মাধ্যমেও অনুপযুক্ত কনটেন্ট ব্লক করা সম্ভব। অনেক ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান বিনামূল্যে প্যারেন্টাল কন্ট্রোল সুবিধা দিয়ে থাকে।
গেমস কনসোল: শুধু খেলা নয়, যোগাযোগেরও মাধ্যম
আজকাল অধিকাংশ শিশুর কাছেই গেমস কনসোল আছে। গেমিং শুধু বিনোদন নয়, এটি বন্ধুদের সঙ্গে যুক্ত থাকারও একটি মাধ্যম হয়ে উঠেছে। তবে এখানেও একই ধরনের ঝুঁকি রয়েছে।
অনলাইনে গেম খেলতে গিয়ে শিশুরা অপরিচিত মানুষের সঙ্গে কথা বলতে পারে। ভয়েস চ্যাট বা মেসেজের মাধ্যমে খারাপ ভাষা বা অনুপযুক্ত আচরণের মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকিও থাকে। এছাড়া গেমের ভেতরে বিভিন্ন জিনিস কেনার সুযোগ থাকায় অজান্তেই বড় অঙ্কের খরচ হয়ে যেতে পারে।
এ কারণে গেমস কনসোলে নিরাপত্তা সেটিংস ব্যবহার করা গুরুত্বপূর্ণ। নিনটেনডো, প্লেস্টেশন, একবক্স সবগুলোতেই প্যারেন্টাল কনট্রোল আছে।
এসবের মাধ্যমে অভিভাবকেরা—কোন গেম খেলবে, কতক্ষণ খেলবে, কাদের সঙ্গে খেলবে এসব নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন।
কেবল প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণই যথেষ্ট নয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সন্তানের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলা ও তার অনলাইন অভিজ্ঞতা শোনা। একইসঙ্গে তাকে এই আশ্বাস দেওয়া যে, কোনো সমস্যা হলে সে আপনার কাছে আসতে পারবে—এটাই সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা।



