নেইমারের শূন্য দৃষ্টি
আলো তখনও নিভে যায়নি। গ্যালারিতে হাজারো মুখ, পতাকার ঢেউ, ক্যামেরার ঝলক, চিৎকার আর উৎসবের রঙ, সবই ছিল। কিন্তু সেই উজ্জ্বলতার মাঝখানে হঠাৎ যেন এক মানুষ একা হয়ে গেলেন। চারপাশে শব্দ ছিল, অথচ তার ভেতরে নেমে এলো এক গভীর নিস্তব্ধতা। চোখ দুটো স্থির, অথচ শূন্য। ঠোঁট কাঁপছে, বুক ওঠানামা করছে, কিন্তু যেন শরীরের ভেতর থেকে প্রাণটাই বেরিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন, অথচ মনে হচ্ছিল, তিনি আর সেখানে নেই। যে মানুষটিকে এতদিন দেখা গেছে গোলের পর নাচতে, দুই হাত তুলে আকাশের দিকে তাকাতে, উৎসবের কেন্দ্রে পরিণত হতে, সেই মানুষটাই সেদিন হঠাৎ এক অসহায় শিশুর মতো ভেঙে পড়েছিলেন।
ফুটবল মাঝে মাঝে এমন কিছু ছবি তৈরি করে, যা স্কোরলাইন ছাপিয়ে ইতিহাসে থেকে যায়। কোনো ট্রফি নয়, কোনো গোল নয়, কোনো পরিসংখ্যান নয়, শুধু এক জোড়া চোখ, যেখানে হঠাৎ নিভে যায় সমস্ত আলো। ২০২২ বিশ্বকাপের সেই রাতে নেইমার জুনিয়রের চোখে ছিল ঠিক তেমনই এক ছবি। সেখানে ছিল ভাঙা স্বপ্নের ধ্বংসস্তূপ, সেখানে ছিল অপূর্ণতার কুয়াশা, সেখানে ছিল এক মানুষের বহু বছরের সাধনার সামনে হঠাৎ দাঁড়িয়ে যাওয়া নির্মম সমাপ্তি।
নেইমারের গল্প কখনোই শুধু প্রতিভার গল্প ছিল না। ব্রাজিলের রাস্তাঘাট থেকে উঠে আসা এক বালক, যার পায়ে বল মানেই ছিল জাদু, যার ড্রিবল ছিল যেন সুর, যার গতিতে ছিল আনন্দ, যার হাসিতে ছিল ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের চিরচেনা উচ্ছ্বাস। ছোটবেলা থেকেই তাকে বলা হয়েছে উত্তরসূরি, পেলের দেশের পরবর্তী আলো, রোনালদো-রোনালদিনহোদের পর নতুন জাদুকর, যে একদিন বিশ্বকাপটা আবার ব্রাজিলে ফিরিয়ে আনবে। এই প্রত্যাশা আশীর্বাদের মতো নয়, বরং অনেক সময় অভিশাপের মতোও। কারণ প্রতিটি গোলের পর মানুষ শুধু উল্লাস করে না, তারা ভবিষ্যতের দাবিও চাপিয়ে দেয়।
নেইমার সেই দাবির ভার বয়ে বেড়িয়েছেন বহু বছর। ২০১৪-তে নিজের মাটিতে বিশ্বকাপ, কিন্তু ইনজুরিতে শেষ হয়ে যাওয়া স্বপ্ন। ব্রাজিলের বিপর্যয় তিনি দেখেছেন মাঠের বাইরে বসে। ২০১৮-তে সমালোচনা, আঘাত, কান্না, ব্যর্থতা। আর ২০২২-এ এসে যেন সবকিছু একসঙ্গে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল তার সামনে, এটাই হয়তো সেই সুযোগ, এটাই হয়তো সেই মঞ্চ, যেখানে এতদিনের অপূর্ণতা পূর্ণ হবে। ব্রাজিল ছিল দুর্দান্ত ছন্দে, দল ছিল ভারসাম্যপূর্ণ, আক্রমণে ছিল সৌন্দর্য, আর মাঝখানে ছিলেন তাদের দশ নম্বর, যিনি জানতেন, এই বিশ্বকাপ তার নিজের গল্পও বদলে দিতে পারে।
কাতারের রাত তখন উত্তাপে ধুকপুক করছে। এডুকেশন সিটি স্টেডিয়ামের আলোয় ব্রাজিল আর ক্রোয়েশিয়া মুখোমুখি। কাগজে-কলমে ব্রাজিল এগিয়ে, রঙে-ছন্দে ব্রাজিল উজ্জ্বল, কিন্তু ক্রোয়েশিয়া এমন এক দল, যারা ম্যাচকে শুধু খেলতে আসে না, ম্যাচকে টেনে নিয়ে যায় মানসিক যুদ্ধে। তারা সময়কে ক্লান্ত করে, প্রতিপক্ষকে নিঃশেষ করে, তারপর সুযোগের অপেক্ষায় থাকে।
পুরো ম্যাচটা ছিল যেন এক অদ্ভুত ধৈর্যের লড়াই। ব্রাজিল আক্রমণ করছে, সুযোগ তৈরি করছে, কিন্তু বল জালে যাচ্ছে না। ক্রোয়েশিয়ার ডিফেন্স, গোলরক্ষকের প্রতিরোধ, আর ব্রাজিলের বাড়তে থাকা অস্থিরতা মিলিয়ে সময় যেন গলতে গলতে এক অদ্ভুত চাপ তৈরি করছিল। গ্যালারিতে অপেক্ষা, মাঠে টেনশন, আর নেইমারের চোখে সেই পরিচিত জেদ, কিছু একটা তিনি করতেই চান।
অতিরিক্ত সময়ের প্রথমার্ধের শেষ প্রান্তে, যেন তিনি নিজের হাতে গল্পের মোড় লিখে দিলেন। মাঝমাঠ থেকে বল এগোল, দ্রুত পাস, তারপর বক্সে ঢুকে গোলরক্ষককে কাটিয়ে জালে বল। গোলটা শুধু একটি গোল ছিল না, সেটা ছিল নেইমারের সমগ্র ক্যারিয়ারের প্রতিচ্ছবি, গতির সঙ্গে সৌন্দর্য, বুদ্ধির সঙ্গে শিল্প, চাপের ভেতরেও ঠাণ্ডা মাথার নির্মাণ। বল জালে জড়াতেই স্টেডিয়াম বিস্ফোরিত হলো। সতীর্থরা ছুটে এসে তাকে জড়িয়ে ধরল। গ্যালারিতে ব্রাজিলিয়ানদের উৎসব শুরু হয়ে গেল। নেইমারও তখন যেন স্বপ্নের খুব কাছে। হয়তো তিনি ভাবছিলেন, এটাই সেই মুহূর্ত, যেটার জন্য এতদিন অপেক্ষা।
কিন্তু ফুটবল অনেক সময় সবচেয়ে নিষ্ঠুর নাট্যকার।
ক্রোয়েশিয়া থামেনি। ম্যাচের শেষভাগে একটি আক্রমণ, একটি শট, একটি ডিফ্লেকশন, আর হঠাৎই ব্রাজিলের উৎসব থেমে গেল। যে আনন্দ একটু আগেও ঢেউ তুলছিল, তা মুহূর্তে জমে গেল বরফের মতো। স্কোরলাইন সমান। নেইমারের মুখেও তখন প্রথমবারের মতো নেমে এলো সেই অস্বস্তির ছায়া। কারণ ফুটবল জানিয়ে দিল, গল্প এখনো শেষ হয়নি।
তারপর এলো টাইব্রেকার, ফুটবলের সবচেয়ে নির্মম আদালত। এখানে পরিশ্রমের হিসাব থাকে না, শিল্পের সৌন্দর্য থাকে না, ১২০ মিনিটের শ্রেষ্ঠত্বও অনেক সময় মূল্যহীন হয়ে যায়। এখানে কেবল স্নায়ু, কয়েক সেকেন্ড, আর ভাগ্যের নির্মম হাত।
ব্রাজিলের শুরুটাই হলো ভুলে ভরা। প্রথম শট ঠেকিয়ে দিলেন ক্রোয়েশিয়ার গোলরক্ষক। এরপর আরেকটি শট পোস্টে। একে একে ব্রাজিলের বুক থেকে স্বপ্ন খসে পড়তে লাগল। নেইমার দাঁড়িয়ে ছিলেন মাঝমাঠে। তিনি ছিলেন পঞ্চম শট নেওয়ার জন্য। ব্রাজিলের শেষ আশ্রয়, শেষ নাম, শেষ সম্ভাবনা। কিন্তু ফুটবল তাকে সেই সুযোগটুকুও দিল না। তার আগেই সব শেষ হয়ে গেল। ক্রোয়েশিয়ার শেষ শট জালে জড়াতেই ম্যাচ শেষ, ব্রাজিলের বিশ্বকাপ শেষ, স্বপ্ন শেষ।
আর ঠিক তখনই তৈরি হলো সেই ছবি, যা বিশ্বকাপের অন্যতম সবচেয়ে বেদনাময় দৃশ্য হয়ে থাকবে।
নেইমার প্রথমে স্থির দাঁড়িয়ে রইলেন। যেন বিশ্বাসই করতে পারছেন না। চারপাশে ক্রোয়েশিয়ার উল্লাস, ব্রাজিলের হতবাক মুখ, গ্যালারির চিৎকার সবকিছু চলছে, কিন্তু তিনি যেন একা এক অন্য সময়ে আটকে গেছেন। তার চোখে ছিল না কোনো রাগ, ছিল না কোনো প্রতিবাদ, ছিল শুধু এক শূন্যতা। এমন এক দৃষ্টি, যেখানে মানুষ তাকিয়ে থাকে, কিন্তু কিছুই দেখতে পায় না। যেন হঠাৎ ভেতরের সমস্ত আলো নিভে গেছে।
তারপর ধীরে ধীরে শরীরটা ভেঙে পড়ল। মুখ ঢেকে কান্না, সতীর্থদের কাঁধে মাথা রেখে ডুকরে ওঠা, এটা শুধু ম্যাচ হারার কান্না ছিল না। এটা ছিল বছরের পর বছর বুকের মধ্যে লালন করা এক স্বপ্নের সামনে দাঁড়িয়ে হঠাৎ নিজেকে অসহায় আবিষ্কার করার কান্না।
কারণ নেইমার খুব ভালো করেই জানতেন, বিশ্বকাপ কোনো রূপকথা নয় যে নিশ্চিতভাবে আবার ফিরে আসবে একই রকম সুযোগ নিয়ে। চার বছর পরও সব একই থাকে না। শরীর বদলায়, সময় বদলায়, দল বদলায়, ভাগ্য বদলায়। সেই রাতে তার কান্নায় তাই একটা আশঙ্কাও ছিল, যদি এটাই হয় সবচেয়ে বড় সুযোগের শেষ প্রান্ত? যদি এটাই হয় সেই রাত, যেখান থেকে আর ফেরা না যায়?
তারপরও তিনি ফিরে এলেন।
২০২৬ সালের ১৮ মে, রিও ডি জেনিরোর 'মিউজিয়াম অব টুমরো'তে যখন কোচ কার্লো আনচেলত্তি ব্রাজিলের চূড়ান্ত বিশ্বকাপ দল ঘোষণা করছিলেন, তখন করতালির মধ্যে একটাই নাম সবচেয়ে জোরে উচ্চারিত হলো, নেইমার জুনিয়র। ৩৪ বছর বয়সে, চোট আর অনিশ্চয়তার ভেতর দিয়ে হেঁটে এসে, তিনি আরেকবার সুযোগ পেলেন হলুদ জার্সি গায়ে চাপানোর।
এটা তার চতুর্থ বিশ্বকাপ। হয়তো শেষটাও। কিন্তু এবার গল্পের শেষ পাতাটা এখনো লেখা হয়নি। এডুকেশন সিটি স্টেডিয়ামের সেই রাতে যে সুড়ঙ্গ দিয়ে তিনি মাথা নিচু করে বেরিয়ে গিয়েছিলেন, সেই একই অন্ধকারের ভেতর থেকে আবার আলোর দিকে হাঁটতে শুরু করেছেন নেইমার, এবার পিঠটা সোজা করে।