সোনালি ধান কালচে, হাওরের কৃষকের চোখে হতাশার ছায়া

সুকান্ত হালদার, তাফসিলুল আজিজ ও জায়েদুল ইসলাম

মাথার ওপর বজ্রপাত ও দমকা হাওয়ার শঙ্কা আর নিচে কোমর সমান পানি—কোনো বাধাই আটকাতে পারেনি কৃষক আতিকুর রহমানকে। তার একমাত্র লক্ষ্য ছিল, যেভাবেই হোক আধাপাকা বোরো ফসল ঘরে তোলা।

এদিকে হাওরে বিরামহীন বৃষ্টির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছিল উজানের ঢল। প্রকৃতির এই প্রতিকূলতার মাঝেই নিজের শেষ সম্বলটুকু রক্ষায় মরিয়া লড়াই চালাচ্ছিলেন এই কৃষক।

কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার খয়রাকান্দা হাওরের এই কৃষক বহু চেষ্টার পর তার চার বিঘা জমির মধ্যে এক বিঘার ধান রক্ষা করতে পেরেছেন। ঘটনা এখানেই শেষ নয়। পর্যাপ্ত রোদ না থাকায় ধান শুকাতেও বিপাকে পড়তে হয় তাকে, ফলে ধানের রং নষ্ট হয়ে কালচে হয়ে গিয়েছে।

গত শনিবার স্থানীয় বড় বাজার ‘চামড়া ঘাটে’ তিনি ১০০ বস্তা বোরো ধান নিয়ে গেলে ক্রেতারা প্রতি মণের দাম হাঁকেন মাত্র ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা।

তার দাবি, চলতি মৌসুমে প্রতি মণ বোরো ধান উৎপাদনে খরচ হয়েছে ১ হাজার ২০০ টাকারও বেশি।

আক্ষেপ করে এই কৃষক বলেন, “এই দামে ধান বিক্রি করলে তা দিয়ে কেবল নৌকা ভাড়া আর বস্তা নামানোর শ্রমিকের মজুরিটুকু উঠবে। আমার নিজের জন্য কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। এখন মনে হচ্ছে, ধান চাষ করাই আমার বড় ভুল ছিল।”

শুধু কিশোরগঞ্জ নয়, হাওরের সাত জেলাজুড়েই এখন একই চিত্র। ভেজা, আংশিক নষ্ট হওয়া কিংবা বিবর্ণ হয়ে যাওয়া ধান নিয়ে কৃষকরা এক বাজার থেকে অন্য বাজারে হন্যে হয়ে ঘুরছেন। কিন্তু ক্রেতা মিলছে না। আর যদি মেলে, তাতেও দাম বেশ কম।

অন্যদিকে সরকারও এই ধরনের ধান কিনছে না। যার কারণে কৃষকেরা উভয় সংকটে পড়ে এখন দিশেহারা।

এদিকে, দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদকেরা অন্তত ৩০ জনেরও বেশি হাওর কৃষকের সঙ্গে কথা বলেছে, যাদের মধ্যে ২৩ জনই জানিয়েছেন, তারা এই একই সংকটের মুখে পড়েছেন। কয়েকজন কৃষক জানান, তারা ঋণ নিয়ে চাষ করেছিলেন এবং আশা ছিল ফসল কাটার পর তা শোধ করবেন।

নেত্রকোনার কৃষক মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, “আমি চেষ্টা করছি, অন্তত পোল্ট্রি ফিড (মুরগির খাদ্য) হিসেবেও যদি এই ধান বিক্রি করা যায়, যেন কিছু টাকা অন্তত উঠে আসে।” তার ১০০ কাঠা জমির বোরো ধানের প্রায় অর্ধেকই এবার পানির নিচে তলিয়ে গেছে।

হাওরে বোরো ধানের ক্ষতি ২ দশমিক ৩০ লাখ টন

কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৬ এপ্রিল থেকে ৪ মে পর্যন্ত অতিবৃষ্টি, বন্যা ও উজানের ঢলে দেশের সাতটি হাওর জেলায় প্রায় ১ হাজার ১২৮ কোটি টাকার ফসল নষ্ট হয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র তথ্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাকির হোসেন জানান, হাওরের মোট ফসলি জমির ১১ দশমিক ০৫ শতাংশ বা ৫২ হাজার ৫৭৫ হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এতে বোরো ধানের ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৩০ লাখ টন এবং প্রায় ২ দশমিক ৮৮ লাখ কৃষক এই ক্ষতির শিকার হয়েছেন, বলেন তিনি।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) দেওয়া তথ্যমতে, এই সাত জেলায় মোট ৪ দশমিক ৫৫ লাখ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়েছিল।

ডিএইর প্রাথমিক হিসাব বলছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশব্যাপী বোরো চাষের পরিধি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫০ দশমিক ৫০ লাখ হেক্টরে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় আবাদের এই হার ৩ দশমিক ২৯ শতাংশ বেড়েছে।

রং নষ্ট হয়ে যাওয়া ধান কিনছে না সরকার

গত ৩ মে থেকে হাওর অঞ্চলে সরকারি ধান ও চাল সংগ্রহ অভিযান শুরু হয়েছে, যা চলবে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত। তবে কিশোরগঞ্জের সহকারী খাদ্য নিয়ন্ত্রক মোশাররফ হোসেন জানিয়েছেন, কৃষকদের কাছ থেকে কোনো ধরনের বিবর্ণ বা ভেজা ধান গ্রহণ করা হচ্ছে না।

নেত্রকোনার জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. মোয়াতাসিমুর রহমান জানান, ধান কেনার আগে সরকারি কর্মকর্তারা আর্দ্রতা ও বিশুদ্ধতার মানসহ মোট ১৪টি মাপকাঠি যাচাই করছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে খাদ্য অধিদপ্তরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, নিরাপদ মজুতের স্বার্থেই মানদণ্ডে উত্তীর্ণ না হওয়া ধান কেনা সম্ভব নয়। ভেজা বা পচা ধান গুদামে রাখলে তা নষ্ট হওয়া বা অঙ্কুরোদগমের ঝুঁকি থাকে, তাই নিয়মে শিথিলতার কোনো সুযোগ নেই।

সাতটি হাওর জেলায় এখন পর্যন্ত ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রার ১০ শতাংশ এবং চালের ১৮ শতাংশ অর্জিত হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে বলে আশা করছে কর্তৃপক্ষ।

এদিকে, ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি কৃষক পরিবারকে সাড়ে ৭ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে সরকার।

কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে সহায়তা পৌঁছাতে একটি তালিকা তৈরি করা হচ্ছে।

মাঠ পর্যায়ের তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি প্রাথমিক তালিকাটি স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে পুনরায় যাচাই করা হচ্ছে, যেন কেউ অন্যায্যভাবে বাদ না পড়ে বা অযোগ্য কেউ তালিকায় না আসে, বলেন তিনি।

তিনি আরও বলেন করেন, চলতি মাস থেকেই আর্থিক সহায়তা কার্যক্রম শুরু হবে এবং মে, জুন ও জুলাই মাসজুড়ে এটি চলবে।

এদিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাক্কলন অনুযায়ী, এই উদ্যোগে মোট ১৭৭ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রয়োজন।

তিনি বলেন, সরকার নীতিগত সমন্বয়ের বিষয়টি বিবেচনা করছে, যাতে কৃষকরা সরাসরি সরকারি ক্রয়মূল্য—প্রতি মণ ১,৪৪০ টাকায়, তাদের ধান বিক্রি করতে পারেন।

তিনি আরও জানান, কৃষকদের বিক্রয় সক্ষমতা ও সরকারি সংগ্রহ ব্যবস্থার চাহিদার মধ্যে ব্যবধান কমাতে কাজ চলছে এবং একটি কার্যকর সমাধান খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন আমাদের সিলেট প্রতিনিধি দোহা চৌধুরী]