ঠাকুরগাঁওয়ে আজাদের বাগানে ২২ জাতের ১২০০ আঙুর গাছ
বাড়ির প্রবেশপথে পা রাখতেই চোখে পড়ে আঙুরলতায় ঢাকা বিস্তৃত ছাউনি। মাথার ওপর সবুজ পাতার ঘন আচ্ছাদনে পুরো পথজুড়ে তৈরি হয়েছে শীতল ছায়া, আর ঝুলে থাকা থোকা থোকা সবুজ আঙুর দৃশ্যটিকে করেছে আরও মনোমুগ্ধকর।
এই মনোরম দৃশ্যের পেছনের গল্প ঠাকুরগাঁওয়ের এক উদ্যমী কৃষকের। বসতভিটার অব্যবহৃত জায়গা ও পুকুরের ওপর আঙুর চাষ করে সফলতা পেয়েছেন তিনি। আমদানিনির্ভর এই ফল স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করে তিনি যেমন দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন, তেমনি আবাদি জমি ছাড়াই চাষের নতুন সম্ভাবনারও দ্বার খুলে দিয়েছেন।
পীরগঞ্জ উপজেলার ঝলঝলি বাজারসংলগ্ন দানারহাট–পীরগঞ্জ সড়ক থেকে পূর্ব দিকে কিছুটা এগোলেই বসন্তপুর গ্রামেই সেই কৃষক আবুল কালাম আজাদের বাড়ি। সেখানে বাড়ির প্রবেশপথের ছাউনিজুড়ে শোভা পাচ্ছে আঙুরের থোকা।
কৃষক আবুল কালাম আজাদ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ২০২৫ সালের শুরুতে তিনি প্রথমে বাড়ির প্রবেশপথের দুই ধারে ৭০টি আঙুরের চারা রোপণ করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই লতাগুলো বেড়ে উঠে ওপরের মাচাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। প্রায় তিন মাস পর গাছে ফুল আসে এবং তার পরের দুই থেকে আড়াই মাসের মধ্যেই সুমিষ্ট ফলন পেয়ে তিনি বেশ উৎসাহিত হন।
এরপর ধীরে ধীরে তিনি বসতভিটা ও আশপাশের জমিসহ পুকুরের ওপর মাচা তৈরি করে চাষের পরিধি বাড়ান। সব মিলিয়ে বর্তমানে প্রায় দুই একর আয়তনের এই বাগানে ২২ জাতের প্রায় এক হাজার ২০০টি আঙুরগাছ রয়েছে। গাছগুলোতে এখন থোকা থোকা আঙুর ধরেছে। তার আশা, জুনের শেষ দিকে ফল পাকতে শুরু করবে এবং জুলাই পর্যন্ত তা সংগ্রহ করা যাবে।
আজাদ জানান, এই আঙুর চাষ প্রকল্পে তার প্রায় আট লাখ টাকা বিনিয়োগ হয়েছে, যার বড় একটি অংশ খরচ হয়েছে কংক্রিটের খুঁটি, বাঁশ ও তার দিয়ে মাচা তৈরি করতে। চলতি মৌসুমে প্রতিটি গাছ থেকে পাঁচ থেকে ১০ কেজি পর্যন্ত ফলন পাওয়া যাবে বলে তিনি ধারণা করছেন। সে হিসাবে মোট উৎপাদন থেকে আট থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করার আশা করছেন তিনি।
শুরুর গল্প নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, ১৯৯৩ সাল থেকে প্রায় সাড়ে তিন বছর একটি নির্মাণ কোম্পানিতে কাজের সুবাদে তিনি সৌদি আরবে ছিলেন। সেখানে থাকাকালে একাধিকবার আঙুর বাগান পরিদর্শন করেন এবং তখনই নিজ দেশে আঙুর চাষের স্বপ্ন দেখেন।
দেশে ফিরে তিনি পুরোপুরি কৃষিকাজে যুক্ত হন। ধান, গম ও আলুসহ প্রচলিত ফসল চাষ শুরু করলেও আঙুর চাষের সেই স্বপ্ন তিনি ভুলে যাননি। তবে শুধু প্রচলিত শস্য চাষে আশানুরূপ ফল না পাওয়ায় তিনি ধীরে ধীরে ফসল বহুমুখীকরণের দিকে ঝুঁকে পড়েন।
এর অংশ হিসেবে তিনি বীজ উৎপাদন, জমির আইল ধরে সুপারি চাষ এবং মাছ চাষ শুরু করেন। পাশাপাশি বসতভিটায় বিভিন্ন ফলগাছ লাগিয়ে সেখান থেকেও নিয়মিত আয় করতে থাকেন। এভাবে ধীরে ধীরে আর্থিকভাবে সফলতা পেতে থাকেন তিনি।
আজাদ জানান, বর্তমানে তার মোট ১৭ দশমিক ৫ একর জমি আছে। এরমধ্যে টিনশেড মার্কেট, বসতভিটা ও পুকুর রয়েছে ৪ দশমিক ২৫ একর জমিতে। ধান, আলু ও কলার পাশাপাশি তিনি জমির আইল ও পুকুরপাড়ে প্রায় পাঁচ হাজার সুপারি গাছ লাগিয়েছেন। বসতভিটা ও পুকুরে আনারস, ড্রাগন ফল, লটকন, নাশপাতি, গোলমরিচ ও চুইঝালসহ বিভিন্ন ফসল ও মসলা চাষ করছেন বলেও জানান তিনি।
তিনি আরও জানান, গত কয়েক বছর ধরে ইউটিউব দেখে এবং ফলচাষ বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে আঙুর চাষ বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করছিলেন।
গত বছরের শুরুতে দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার এক চাষির কাছ থেকে প্রথম আঙুরের চারা সংগ্রহ করেন তিনি। পরে ফলনের মান ভালো হওয়ায় যশোর, নোয়াখালীসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে আরও চারা সংগ্রহ করেন।
নিজের অভিজ্ঞতায় আজাদ জানান, তার বাগানের ২২টি জাতের মধ্যে সাত–আটটি জাত বাণিজ্যিকভাবে চাষের জন্য উপযোগী। এর মধ্যে বাইকুনুর, সিলভা, অ্যাপোলো, ব্ল্যাক ম্যাজিক, ব্ল্যাক জাম্বো, ডিক্সন ও ভ্যালেজ উল্লেখযোগ্য।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, আঙুর গাছ দ্রুত বাড়ে; মার্চ মাসে ফুল আসে এবং জুনের শেষ সপ্তাহে ফল পাকতে শুরু করে। রোপণের ছয় থেকে সাত মাসের মধ্যেই ফল পাওয়া যায়।
ফল চাষের পাশাপাশি তিনি আঙুর গাছের চারা উৎপাদনও শুরু করেছেন। প্রতিটি চারা ৩০০ টাকায় বিক্রি করছেন এবং আগ্রহীদের চাষপদ্ধতি সম্পর্কেও পরামর্শ দিচ্ছেন।
গত বছর প্রথম ফলন পাওয়ার পর তা তিনি আত্মীয়স্বজন, দর্শনার্থী ও স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ীর মধ্যে বিতরণ করেন। তাদের অনেকেই ফলের স্বাদ আমদানিকৃত আঙুরের মতোই মিষ্টি বলে প্রশংসা করেছেন।
বর্তমানে স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও তার উৎপাদিত আঙুর কিনতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন বলে জানান আজাদ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার বাগানের ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এসে বাগানটি দেখতে ভিড় করছেন।
রাণীশংকৈল উপজেলার বুড়িপুকুর গ্রামের বাসিন্দা মতিউর রহমান বলেন, ‘এত বেশি আঙুরের ফলন দেখে আমি অভিভূত।’ অব্যবহৃত জমিতে এভাবে চাষের পদ্ধতি তাকে বেশ আকৃষ্ট করেছে বলেও জানান তিনি। শিগগিরই নিজেও আঙুর চাষ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে তার।
আজাদের বাড়ির পাশের ঝলঝলি বাজারের রেস্তোরাঁর মালিক গোপাল সরকার বলেন, ‘গত মৌসুমে আঙুর খেয়ে দেখেছি। স্বাদ ভালো, বাজারে পাওয়া আমদানিকৃত আঙুরের মতোই।’
পীরগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নজমুল হাসান বলেন, ‘এই এলাকায় সাধারণত আঙুরের ফলন খুব একটা মিষ্টি হয় না। তবে আজাদ দাবি করছেন তার বাগানের আঙুর মিষ্টি। যদি তার সংগ্রহ করা জাতগুলো ভালো মানের ফল দিতে পারে, তাহলে এ অঞ্চলে আঙুর চাষ সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ অঞ্চলের দোঁআশ মাটি আঙুর চাষের জন্য উপযোগী। তবে আঙুরের বাগানে সাধারণত লাল মাকড়ের আক্রমণ বেশি হয়। এটি দমনে সেক্স ফেরোমন ফাঁদ ও হলুদ আঠালো ফাঁদ ব্যবহার করা যেতে পারে।’