নিউইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণ

হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করতে কেন ব্যর্থ হলো লেবানন?

স্টার অনলাইন ডেস্ক

চলতি বছরের শুরুতে লেবাননের শীর্ষ নেতারা হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার দীর্ঘদিনের লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন বলে মনে হচ্ছিল। ইরান সমর্থিত শক্তিশালী এই সশস্ত্র গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রের ভেতরে আরেকটি রাষ্ট্রের মতো কার্যক্রম চালিয়ে আসছে।

শুরু থেকেই সতর্ক ও ধীরগতির সেই উদ্যোগ এখন থমকে গেছে।

সীমান্তের ওপার থেকে ইসরায়েল হামলা চালালেও এক বছরের বেশি সময় ধরে তুলনামূলকভাবে সংযত ছিল হিজবুল্লাহ। সম্প্রতি ইরান যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে তারা আবারও যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে।

মার্চে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলা শুরুর পর, মিত্র ইরানের প্রতি সংহতি জানিয়ে ইসরায়েলে হামলা শুরু করে হিজবুল্লাহ। এতে কয়েকজন ইসরায়েলি সেনা নিহতও হয়েছে বলে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এখন লেবানন আবারও একটি পরিচিত সংকটে আটকে পড়েছে। হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান জোরদার করেছে ইসরায়েল। ফলে গোষ্ঠীটির নিরস্ত্র হওয়ার সম্ভাবনা আরও কমে গেছে।

অন্যদিকে, হিজবুল্লাহর স্থায়ী শক্তি এবং গৃহযুদ্ধের স্মৃতিতে শঙ্কিত লেবানন সরকার পশ্চিমা চাপ থাকা সত্ত্বেও বলপ্রয়োগে তাদের অস্ত্রভাণ্ডার জব্দ করার কার্যক্রম থেকে সরে এসেছে।

সোমবার ইসরায়েল সরকার বৈরুতের দক্ষিণে ফের বোমা হামলা চালানোর পরিকল্পনা ঘোষণা করে। একই সময়ে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলি সেনা ও বসতিগুলোর ওপর নতুন হামলার দাবি করে। এসব ঘটনা দেখিয়ে দিচ্ছে, এপ্রিলে ট্রাম্প প্রশাসন ঘোষিত যুদ্ধবিরতি ক্রমেই কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে।

হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্রীকরণের সেরা সুযোগ কীভাবে ব্যর্থ হলো, তা নিয়ে একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস।

সংঘাতের কারণে লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং দক্ষিণ লেবাননের কিছু এলাকা দখল করে রেখেছে ইসরায়েল। এমন পরিস্থিতিতে লেবাননের নাগরিকেরা আশঙ্কা করছেন, সরকার ও হিজবুল্লাহর মধ্যে যেকোনো সংঘাত দেশের সংকট আরও গভীর করবে এবং পুরোনো ক্ষত আবারও উসকে দেবে।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের লেবাননবিষয়ক প্রকল্প পরিচালক হেইকো উইমেন নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, লেবাননের সেনাবাহিনীর পক্ষে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া কঠিন। কারণ এ ধরনের সিদ্ধান্তে সবার সম্মতি লাগে। আর লেবাননের রাজনীতিতে সেটা পাওয়া সহজ নয়।

ইরান যখন বড় বাধা

এক বছরেরও কম সময়ে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দুটি যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ইরানের ধর্মীয় শাসকগোষ্ঠী এখনো দৃঢ়ভাবে ক্ষমতায় রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের ফলে ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব ও শক্তি প্রদর্শনের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত না হলে হিজবুল্লাহর অস্ত্র ছেড়ে দেওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।

হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের মিডল ইস্ট ইনিশিয়েটিভের ভিজিটিং স্কলার লিনা খতিব বলেন, হিজবুল্লাহকে দুর্বল করতে হলে লেবাননকে আসলে ইরানের রাজনীতিতে পরিবর্তনের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। কারণ হিজবুল্লাহর শক্তির মূল উৎস তেহরান।

স্বল্প সময়ের সুযোগ

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে যে যুদ্ধ শুরু হয়, তাতে ইরানের আঞ্চলিক মিত্ররা ব্যাপকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয় হিজবুল্লাহ।

গত তিন বছরে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ দুটি যুদ্ধে জড়িয়েছে। ২০২৪ সালের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত যুদ্ধবিরতিতে প্রথম সংঘাত থেমে যায়। এরপর লেবাননসহ পশ্চিমা ও মধ্যপ্রাচ্যের সরকারগুলো হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার একটি বিরল সুযোগ দেখতে পায়।

যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে ধারণা করা হয়েছিল, ইসরায়েলের সীমান্তসংলগ্ন লিতানি নদীর দক্ষিণাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে ধীরে ধীরে হিজবুল্লাহ তাদের অস্ত্র সমর্পণ করবে। আর এর বিনিময়ে লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান বন্ধ হবে।

২০২৫ সালের শুরুতে নতুন প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতায় এসে হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিলে উদ্যোগটি গতি পেতে শুরু করে। গত আগস্টে প্রধানমন্ত্রী নওয়াফ সালামের মন্ত্রিসভা বছরের শেষ নাগাদ হিজবুল্লাহর অস্ত্রভাণ্ডার বিলুপ্ত করার জন্য পরিকল্পনা দিতে সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দেয়।

সেপ্টেম্বরে মন্ত্রিসভা যখন সেই পরিকল্পনা পর্যালোচনা করছিল, তখন হিজবুল্লাহ সমর্থিত মন্ত্রীরা বৈঠক বর্জন করেন। তারা গোষ্ঠীটির দীর্ঘদিনের সেই বক্তব্যই পুনরাবৃত্তি করেন যে, হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করা হলে লেবানন ইসরায়েলের সামনে অরক্ষিত হয়ে পড়বে।

তবুও সে সময়ে প্রক্রিয়াটি এগিয়ে চলছিল।

নিরস্ত্রীকরণে অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা করতে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরায়েলি ও লেবাননি কর্মকর্তারা দক্ষিণ লেবাননের একটি জাতিসংঘ ঘাঁটিতে নিয়মিত বৈঠক করতেন।

অক্টোবরে মার্কিন সামরিক বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, আগের এক বছরে লেবাননের সেনাবাহিনী দক্ষিণাঞ্চল থেকে প্রায় ১০ হাজার রকেট ও প্রায় ৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র সরিয়ে নিয়েছে।

জানুয়ারিতে সেনাবাহিনী জানায়, দক্ষিণ লেবানন থেকে হিজবুল্লাহর অস্ত্র সরানোর প্রথম ধাপ শেষ হয়েছে। ইসরায়েল এটিকে 'ভালো শুরু' বললেও 'যথেষ্ট নয়' বলে মন্তব্য করে।

পথ হারানো সম্ভাবনা

কিন্তু ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর হামলা চালানোর পর সব অগ্রগতি থেমে যায়।

কিছুদিনের মধ্যেই ইসরায়েলে পাল্টা হামলা চালায় হিজবুল্লাহ। এতে স্পষ্ট হয়, তাদের কাছে এখনো প্রচুর রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র মজুত আছে। এছাড়া তারা নতুন ধরনের ড্রোনও ব্যবহার করছে। যেগুলো ঠেকানো আগের চেয়ে অনেক কঠিন।

পাল্টা জবাবে দক্ষিণ লেবাননে ব্যাপক সামরিক অভিযান চালায় ইসরায়েল। এতে বহু বেসামরিক মানুষ নিহত হয়, এলাকা ধ্বংস হয় এবং দেশটির কিছু অংশ ইসরায়েল দখলে করে নেয়। তবে এত কিছুর পরেও হিজবুল্লাহ দমেনি। তারা এখন অস্ত্র ছাড়তেও নারাজ।

মে-তে হিজবুল্লাহর মুখপাত্র হাজ্জ ইউসুফ আল-জেইন সাংবাদিকদের বলেন, ইসরায়েলিরা বিস্মিত হয়েছে। আমেরিকানরাও বিস্মিত হয়েছে। প্রতিরোধ বাহিনীর সক্ষমতা দেখে পুরো বিশ্বই বিস্মিত হয়েছে।

এই অচলাবস্থা লেবানন সরকারকে কঠিন অবস্থায় ফেলেছে। মার্চে সরকার হিজবুল্লাহকে সামরিক কার্যক্রমে অংশ নিতে নিষেধ করেছিল, কিন্তু সেই নির্দেশ অকার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। এখন গোষ্ঠীটিকে আরও কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য সরকারের ওপর চাপ বাড়ছে।

গৃহযুদ্ধের স্মৃতি

১৯৮২ সালে প্রতিষ্ঠিত হিজবুল্লাহ নিজেকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে লেবাননের প্রধান রক্ষক হিসেবে উপস্থাপন করে। দক্ষিণ সীমান্তজুড়ে নিজেদের শক্ত অবস্থানও গড়ে তুলেছে তারা।

গোষ্ঠীটির নেতারা বলে আসছেন, দেশ রক্ষা এবং শিয়া মুসলমানদের রাজনৈতিক অধিকার টিকিয়ে রাখতে তাদের অস্ত্র দরকার। লেবাননের তিনটি প্রধান ধর্মীয় গোষ্ঠীর মধ্যে শিয়ারাই হিজবুল্লাহর মূল সমর্থক।

নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সময়ের সঙ্গে হিজবুল্লাহ লেবাননের প্রধান রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। অনেকের দৃষ্টিতে দেশটির নিজস্ব সশস্ত্র বাহিনীর চেয়েও হিজবুল্লাহ শক্তিশালী। তবে একের পর এক বিধ্বংসী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ায় বহু লেবাননি এখন গোষ্ঠীটির প্রতি ক্ষুব্ধ।

লেবানন সীমান্তে ইসরায়েলের সেনারা। ছবি: রয়টার্স

গবেষক খতিব বলেন, হিজবুল্লাহ শিয়া সম্প্রদায়ের একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। ফলে তাদের বিরুদ্ধে কথা বললেই সেটাকে শিয়াবিরোধী হিসেবে দেখানো হয়। এ কারণে লেবানন সরকার চাইলেও হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারছে না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জাতিসংঘ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যুদ্ধ শুরুর আগে দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর অস্ত্র লুকানোর সন্দেহজনক জায়গাগুলোতে অভিযান চালাতে লেবাননের সেনাবাহিনী রাজি ছিল না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের অভিযান লেবাননের ১৫ বছরের গৃহযুদ্ধের তিক্ত স্মৃতি ফিরিয়ে আনতে পারে। দেশে নতুন করে অস্থিরতাও তৈরি করতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী সালাম বারবার ১৯৮৯ সালের তাইফ চুক্তির কথা মনে করিয়ে দিচ্ছেন। ওই চুক্তি গৃহযুদ্ধ শেষ করেছিল এবং সব মিলিশিয়াকে অস্ত্র ছাড়তে বলেছিল।

তিনি বলেছেন, হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার বিষয়ে লেবানন ৩০ বছরেরও বেশি সময় পিছিয়ে আছে।

নিরস্ত্রীকরণের পথে আরেকটি জটিলতা হলো, লেবানন চায় ইসরায়েল আগে তাদের ভূখণ্ড থেকে সেনা সরিয়ে নিক, তারপর নিরস্ত্রীকরণের প্রশ্ন আসবে।

সাবেক মার্কিন কূটনীতিক ডেভিড শেংকার বলেছেন, লেবানন সরকার হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে চাইলে জনগণকে দেখাতে হবে যে, এর বিনিময়ে দেশ কিছু পাচ্ছে।

‘সত্যের মুখোমুখি হওয়ার মুহূর্ত’

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে চলমান আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণ। হিজবুল্লাহ ও ইরান উভয়ই এই বিরল কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার সমালোচনা করেছে।

আরব ও পশ্চিমা কর্মকর্তাদের পাশাপাশি আঞ্চলিক বিশ্লেষকেরাও বিভিন্ন পরিকল্পনা প্রস্তাব করেছেন। এর মধ্যে উত্তর আয়ারল্যান্ডের পুনর্মিলন প্রক্রিয়ার আদলে একটি স্বাধীন আন্তর্জাতিক কমিশন গঠনের প্রস্তাবও রয়েছে, যা পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ তদারকি করবে।

এপ্রিলে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র চায় লেবাননের সেনাবাহিনী নিজেই হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিক। এছাড়া কেউ কেউ প্রস্তাব করেছেন, বিদেশি সাহায্য বন্ধের হুমকি দিয়ে লেবানন সরকারকে নিরস্ত্রীকরণে বাধ্য করা যেতে পারে।

হিজবুল্লাহকে মোকাবিলায় লেবাননের সেনাবাহিনীতে বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন হবে বলেও মনে করা হচ্ছে।

বর্তমানে বাহিনীটিতে পর্যাপ্ত জনবল, সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষণের ঘাটতি রয়েছে। তবে এর ব্যয় কে বহন করবে, তা স্পষ্ট নয়। সম্ভাব্য অর্থদাতা উপসাগরীয় দেশগুলোও আঞ্চলিক যুদ্ধের প্রভাবে চাপে রয়েছে। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক আর্থিক সহায়তা পাওয়ার জন্য যে রাজস্ব ও অর্থনৈতিক সংস্কার প্রয়োজন, লেবানন তা এখনো বাস্তবায়ন করেনি।

মে-তে যুক্তরাষ্ট্র নয়জন ব্যক্তির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, যাদের মধ্যে লেবাননের সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরাও ছিলেন। তাদের বিরুদ্ধে হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্রীকরণে বাধা দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের হেইকো উইমেন বলেন, লেবানন এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণের প্রশ্নটি তারা এড়িয়ে যাবে, নাকি সরাসরি মোকাবিলা করবে—এই সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করছে লেবাননের ভবিষ্যৎ।