এক্সপ্লেইনার

মধ্যপ্রাচ্যের দরকষাকষি: ইরান কী করবে আর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল কী চায়?

স্টার অনলাইন ডেস্ক

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত একপ্রকার স্থবির অবস্থার মধ্যে দিয়েই যাচ্ছিল। এরই মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক বিমান হামলা। যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকার মধ্যেই দক্ষিণ ইরানে মার্কিন হামলা আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নতুন প্রশ্ন তুলেছে।

তবে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর খবর অনুযায়ী, বাইরে থেকে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত মনে হলেও, সংকট সমাধানের জন্য ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের মধ্যে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে এই আলোচনায় দুই পক্ষের চাওয়া ও লক্ষ্য সম্পূর্ণ আলাদা।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের বিশ্লেষক আলী ভায়েজ বলেন, ইরানের জন্য এই আলোচনা হলো নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার এক মরণপণ লড়াই। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এর উদ্দেশ্য শুধুই সাময়িক বা স্বল্পমেয়াদি।

বার্তাসংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে এই আলোচনার গতি বেশ ধীর হয়ে গেছে। কারণ ইরান স্পষ্ট জানিয়েছে যে, তারা এখনই কোনো চুক্তিতে সই করতে প্রস্তুত নয়।

অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও সতর্ক করে দিয়েছেন যে, চুক্তির বিষয়ে তারও কোনো তাড়া নেই। এই জটিল সমীকরণে ইসরায়েলও গভীরভাবে যুক্ত, যারা শুরু থেকেই ইরানের সঙ্গে যেকোনো চুক্তির তীব্র বিরোধিতা করে আসছে।

ইরানের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই

ইরানের বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত সংকটজনক। তাদের অর্থনীতিও একেবারেই ভেঙে পড়েছে। বছরের পর বছর ধরে চলা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশের অবস্থা এতটাই খারাপ যে, যুদ্ধ শুরুর ঠিক কয়েক সপ্তাহ আগেই জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে দেশটিতে ব্যাপক জনবিক্ষোভ শুরু হয়েছিল।

যদিও ইরান সরকার অত্যন্ত কঠোর হাতে সেই বিক্ষোভ দমন করে।

বিশ্লেষক আলী ভায়েজ বলেন, ইরানের এখন আবার ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য শত বিলিয়ন ডলারের বিশাল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন। কিন্তু ইরান যদি বহির্বিশ্বের সঙ্গে তাদের সমস্যাগুলোর একটি স্থায়ী ও মৌলিক সমাধান করতে না পারে, তবে তারা এই অর্থ কোনোভাবেই পাবে না।

হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তেলের বাজারে তীব্র সংকট। ছবি: রয়টার্স

এ প্রসঙ্গে ভায়েজ বলেন, উত্তপ্ত যুদ্ধ থেকে বেঁচে ফেরা আর একটি শীতল শান্তিতে জমে যাওয়া এক বিষয় নয়।

অর্থাৎ, শুধুমাত্র যুদ্ধ থামলেই হবে না, দেশের ভেতরে নিজেদের ক্ষমতা শক্তভাবে ধরে রাখার জন্য তাদের সামরিক শক্তি ও দেশকে নতুন করে পুনর্গঠন করতে হবে।

পুনর্গঠন ছাড়া ইরানের ভবিষ্যৎ ঘোর সংকটের মুখে পড়বে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

তা ছাড়া ইরান দীর্ঘদিন ধরে দাবি করছে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে আটকে থাকা তাদের বিপুল পরিমাণ অর্থ ছেড়ে দিতে হবে।

ইরানের সংবাদ সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেকোনো প্রাথমিক চুক্তির প্রধান শর্তই হতে হবে এই আটকে থাকা অর্থের অন্তত কিছু অংশে তাদের অধিকার দেওয়া। যুক্তরাষ্ট্র যদি এই অর্থ না দেয়, তবে ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ কাজে লাগিয়ে রাজস্ব আয়ের চেষ্টা চালিয়ে যাবে।

যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি অবরুদ্ধ করে রেখেছে, যার ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম দ্রুতই বাড়ছে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতি ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

এর পাশাপাশি, ইরান যেকোনো চুক্তির মধ্যে লেবাননকেও অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে জেদ ধরে আছে।

ট্রাম্পের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক হিসাব

যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্যগুলো ইরানের চেয়ে একেবারেই আলাদা।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক মেইরাভ জোনসজেইনের মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন এই যুদ্ধে জড়িয়েছিলেন, তখন তিনি ভেবেছিলেন যুদ্ধটি খুব দ্রুত এবং সফলভাবে শেষ হবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান দাবি হলো, ইরানকে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বাদ দিতে হবে।

তবে একাধিক দফার আলোচনা এবং যুদ্ধ সত্ত্বেও তারা এখনো এই লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি এবং এ বিষয়ে বড় ধরনের মতবিরোধ রয়ে গেছে। এই কারণে পারমাণবিক ইস্যুটিকে আপাতত ভবিষ্যতের জন্য রেখে দেওয়া হতে পারে।

আলী ভায়েজ মনে করেন, পারমাণবিক ইস্যুতে আটকে থাকার চেয়ে হরমুজ প্রণালির মতো অন্যান্য জরুরি সমস্যাগুলো আগে সমাধান করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বেশি যুক্তিসঙ্গত।

স্বল্প মেয়াদে ট্রাম্পের প্রধান লক্ষ্য হলো যেকোনোভাবে যুদ্ধ থামানো। কারণ তাকে বিশ্ববাজারে এবং আমেরিকার অভ্যন্তরীণ বাজারের গ্যাস পাম্পগুলোতে জ্বালানির দাম দ্রুত কমাতে হবে। সম্প্রতি কয়েক সপ্তাহে ট্রাম্পের নানা ধরনের মন্তব্য তেলের বাজারকে চরম অস্থিতিশীল করে তুলেছে। তেলের দাম একবার বাড়ছে, আবার কমছে।

এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোনো একটি চুক্তির ফলে হয়তো হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া হবে বলে সবাই আশায় আছে। এছাড়া ট্রাম্পকে এখন আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের দিকেও মনোযোগ দিতে হচ্ছে, যাতে রিপাবলিকান দল কংগ্রেসের উভয় কক্ষে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারে।

বিশ্লেষক জোনসজেইনের মতে, এসবের পাশাপাশি ট্রাম্পের ব্যক্তিগত একটি চাওয়াও রয়েছে। তা হলো, নিজেকে বিশ্বের সামনে একজন বিজয়ী হিসেবে তুলে ধরা।

ইসরায়েলের উদ্দেশ্য

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই চলমান আলোচনার সবচেয়ে বড় ও কট্টর বিরোধী হলো ইসরায়েল। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প একমত হয়েছিলেন যে, যেকোনো চূড়ান্ত চুক্তিতে ইরানের পারমাণবিক হুমকি পুরোপুরি দূর করতে হবে।

বিশ্লেষক জোনসজেইনের মতে, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শুরু করেছিল এই জুয়া খেলে যে, এটি তাদের পক্ষে যাবে, কিন্তু স্পষ্টতই তা হয়নি। এখন ইসরায়েলের কৌশল হলো ইরানের ওপর ক্রমাগত সামরিক হুমকি ও অর্থনৈতিক চাপ ধরে রাখা, এই আশায় যে একদিন তা থেকে ভালো কোনো ফলাফল আসবে।

এএফপি জানায়, ইসরায়েল এর আগে ২০১৫ সালেও বারাক ওবামার আমলে হওয়া পারমাণবিক চুক্তি আটকানোর চেষ্টা করেছিল। তখন তারা ব্যর্থ হলেও ট্রাম্প ক্ষমতায় আসা পর্যন্ত তারা সেই চাপ অব্যাহত রেখেছিল।

বিশ্লেষক আলী ভায়েজ মনে করেন, এমন কোনো চুক্তি নেই যা ইসরায়েলকে পুরোপুরি সন্তুষ্ট করতে পারে। এমনকি যদি কোনো প্রাথমিক চুক্তি চূড়ান্তও হয়, ইসরায়েল তার বিরোধিতা করেই যাবে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও ইসরায়েল ক্রমাগত লেবাননে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।

তাদের দাবি, তারা হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করে এই হামলা করছে। যেহেতু ইরান চুক্তিতে লেবাননকে চায়, তাই ইসরায়েলের এই হামলা ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া যেকোনো বোঝাপড়া বা চুক্তিকে ভেঙে দেওয়ার একটি বড় হাতিয়ার হিসেবে কাজ করতে পারে।

আলী ভায়েজ সতর্ক করে বলেছেন, ইসরায়েলের এই পদক্ষেপগুলো চুক্তির বিষাক্ত অংশ বা পয়জন পিল হিসেবে কাজ করছে, যা শেষ পর্যন্ত পুরো চুক্তিকেই বানচাল করে দিতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যের এই পরিস্থিতি একটি অত্যন্ত জটিল সমীকরণে আটকে আছে। ইরান চাইছে তাদের ধ্বংসপ্রায় অর্থনীতিকে পুনর্গঠন করতে এবং যেকোনো মূল্যে নিজেদের অস্তিত্ব ও ক্ষমতা ধরে রাখতে।

যুক্তরাষ্ট্র, বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্প চাইছেন নিজের রাজনৈতিক ভাবমূর্তি রক্ষা করতে, আসন্ন নির্বাচনে জয়লাভ করতে এবং দেশের তেলের বাজার সামলাতে।

অন্যদিকে, ইসরায়েল চাইছে যেকোনো মূল্যে ইরানের সঙ্গে বহির্বিশ্বের চুক্তি বানচাল করে তাদের চিরতরে দুর্বল করে দিতে।

এই তিন পক্ষের এমন পরস্পরবিরোধী লক্ষ্যের কারণে এই সংকটের কোনো স্থায়ী সমাধান এখনো দূরবর্তী।