ট্রিলিয়নিয়ার হতে যাচ্ছেন ইলন মাস্ক, এই পরিমাণ অর্থ দিয়ে কী করা সম্ভব?
বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার হওয়ার পথে রয়েছেন ইলন মাস্ক। এটি এমন এক ‘বিস্ময়কর’ সম্পদের পরিমাণ, যা মানব বাণিজ্যের ইতিহাসে আগে কখনো দেখা যায়নি।
সিএনএনের তথ্য অনুযায়ী, টেসলার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুবাদে মাস্কের হাতে ইতোমধ্যেই ২৭৩ বিলিয়ন ডলারের শেয়ার ও স্টক অপশন রয়েছে।
এদিকে আগামী সপ্তাহে রকেট ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের প্রাথমিক শেয়ার বিক্রির (আইপিও) পরিকল্পনা রয়েছে মাস্কের। এই বিক্রির পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে তার সম্পদে আরও ৮৪১ বিলিয়ন ডলার যোগ হতে পারে।
স্পেসএক্সের প্রায় অর্ধেক শেয়ারের মালিক থাকবেন তিনি। আর আইপিওর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির মোট মূল্যায়ন দাঁড়াতে পারে ১ দশমিক ৭৭ ট্রিলিয়ন ডলার।
সব মিলিয়ে, শুধু এই দুটি কোম্পানি থেকেই মাস্কের সম্পদের পরিমাণ দাঁড়াবে ১ দশমিক ১১ ট্রিলিয়ন ডলারে।
তবে মাস্কের এই সম্পদ মূলত কাগুজে সম্পদ। এটি কোথাও ব্যাংকে জমা রাখা নগদ অর্থের স্তূপ নয়। ভবিষ্যতে বিনিয়োগকারীরা টেসলা ও স্পেসএক্সের মূল্য কত নির্ধারণ করেন, তার ওপরই এই সম্পদের প্রকৃত মূল্য নির্ভর করবে।
১ ট্রিলিয়ন ডলার মানে ১০ লাখ মিলিয়ন ডলার, যা ১২২ লাখ কোটি টাকার সমান। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের নামমাত্র (নমিনাল) জিডিপি ছিল ৫১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ৬২ লাখ ৬২ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ, মাস্কের এই সম্পদের পরিমাণ বাংলাদেশের বার্ষিক জিডিপির প্রায় দ্বিগুণ।
একজন মানুষের পুরো জীবনে স্বাভাবিক কোনো উপায়ে এত অর্থ ব্যয় করা কার্যত অসম্ভব। কেউ যদি প্রতিদিন প্রতি ঘণ্টায় ১০ লাখ ডলার করে খরচ করেন, তাহলেও ১ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে তার এক শতাব্দীরও বেশি সময় লাগবে।
এই বিপুল অর্থের পরিমাণকে বাস্তবতার সঙ্গে তুলনা করে বোঝার জন্য নিচে এমন ছয়টি উদাহরণ দেওয়া হলো, যেগুলোর মূল্য শিগগিরই ইলন মাস্কের সম্পদের চেয়েও কম হতে পারে।
অধিকাংশ দেশের অর্থনীতি
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের মাত্র ২০টি দেশের অর্থনীতির আকার ১ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি। অর্থাৎ বিশ্বের অধিকাংশ দেশের অর্থনীতির মূল্যই মাস্কের সম্ভাব্য সম্পদের চেয়ে কম।
এসব দেশের মধ্যে রয়েছে তাইওয়ান (৯৭৭ বিলিয়ন ডলার), আয়ারল্যান্ড (৭৭৯ বিলিয়ন ডলার), সুইডেন (৭৬০ বিলিয়ন ডলার), সিঙ্গাপুর (৬৬০ বিলিয়ন ডলার) এবং মাস্কের জন্মভূমি দক্ষিণ আফ্রিকা(৪৮০ বিলিয়ন ডলার)।
ম্যানহাটনের অর্থনীতি
অবশ্য মাস্কের বিনিয়োগ পোর্টফোলিওর চেয়ে ছোট অর্থনীতি খুঁজতে বিভিন্ন দেশ দেখার প্রয়োজন নেই।
ম্যানহাটন দ্বীপ, যেখানে ওয়াল স্ট্রিটসহ যুক্তরাষ্ট্রের বহু আর্থিক ও করপোরেট শক্তিকেন্দ্র অবস্থিত, সেই এলাকার মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ২০২৪ সালে ছিল ১ ট্রিলিয়ন ডলারের সামান্য কিছু বেশি। এটি ফেডারেল রিজার্ভের সর্বশেষ প্রাপ্য তথ্যভিত্তিক বছরের হিসাব।
হিউস্টনের সব সম্পত্তি
হিউস্টন যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় বৃহত্তম শহর। এর আগে রয়েছে শুধু নিউইয়র্ক সিটি ও লস অ্যাঞ্জেলেস।
মেক্সিকো উপকূলে অবস্থিত টেক্সাসের এই শহরটি যুক্তরাষ্ট্রের সমৃদ্ধ তেল ও গ্যাস শিল্পের অন্যতম কেন্দ্র। সর্বশেষ প্রাপ্য তথ্য অনুযায়ী, শহরটির আবাসিক ও বাণিজ্যিকসহ সব ধরনের সম্পত্তির মোট মূল্য প্রায় ৮৭৯ বিলিয়ন ডলার।
যুক্তরাষ্ট্রে কেনা সব নতুন যানবাহন
আবাসনের পর অধিকাংশ আমেরিকানের সবচেয়ে বড় ব্যয় হয় গাড়ি ও ট্রাক কেনার ক্ষেত্রে।
গত বছর সব ধরনের বিক্রয় মিলিয়ে একটি নতুন গাড়ির গড় মূল্য রেকর্ড ৪৮ হাজার ৪০২ ডলারে পৌঁছায়। এরপরও ২০২৫ সালে আমেরিকানরা ১ কোটি ৬৩ লাখ নতুন গাড়ি কিনেছেন, যার মোট মূল্য ছিল ৭৮৯ বিলিয়ন ডলার।
প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ ধনকুবেরদের সম্মিলিত সম্পদ
মাস্ক ইতোমধ্যেই বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি। তবে তার সম্পদের পরিমাণ শিগগিরই প্রযুক্তি খাতের অন্য বিলিয়নিয়ারদের অনেক পেছনে ফেলে দিতে পারে।
বিশ্বের পরবর্তী চার ধনকুবের—ল্যারি পেইজ, সের্গেই ব্রিন, ল্যারি এলিসন এবং জেফ বেজোসের আনুমানিক মোট সম্পদ একত্র করলেও তা ১ দশমিক ০৯ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। অর্থাৎ তাদের সম্মিলিত সম্পদও মাস্কের সম্ভাব্য সম্পদের চেয়ে সামান্য কম।
মাস্কের মতো তারাও নিজেদের প্রতিষ্ঠিত প্রযুক্তি কোম্পানির শেয়ার থেকেই বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন।
বিশ্বের প্রায় সব পেশাদার ক্রীড়া দল
ক্রীড়া দলগুলো বিলিয়নিয়ারদের সবচেয়ে পছন্দের এবং সবচেয়ে ব্যয়বহুল সম্পদগুলোর একটি। কিন্তু ১ ট্রিলিয়ন ডলার থাকলে পৃথিবীর প্রায় সব ক্রীড়া দলই কেনা সম্ভব।
বাস্তবে বিশ্বের ৫০টি সবচেয়ে মূল্যবান ক্রীড়া দলের সম্মিলিত মূল্যও তার মাত্র তিনভাগের এক ভাগ। ফোর্বসের হিসাব অনুযায়ী, এ মূল্য প্রায় ৩৫৩ বিলিয়ন ডলার।
এর মধ্যে সবচেয়ে মূল্যবান আমেরিকান ফুটবল বা রাগবি দল ডালাস কাউ বয়েজ, যার আনুমানিক মূল্য ১৩ বিলিয়ন ডলার। আর তালিকার ৫০তম স্থানে থাকা বাস্কেটবল দল টরেন্টো র্যাপটরসের মূল্য প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার।
সংখ্যাটা এত বড় যে মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার সঙ্গে এর তুলনা করা প্রায় অসম্ভব। তাই ১ ট্রিলিয়ন ডলারকে বোঝার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো এটিকে দেশ, শহর, শিল্পখাত কিংবা বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদগুলোর সঙ্গে তুলনা করা।
সেই তুলনায় দেখা যাচ্ছে, ইলন মাস্কের সম্ভাব্য সম্পদ বিশ্বের অধিকাংশ দেশের অর্থনীতি, যুক্তরাষ্ট্রের বৃহৎ নগর অর্থনীতি, এমনকি প্রযুক্তি খাতের কয়েকজন শীর্ষ ধনকুবেরের সম্মিলিত সম্পদের চেয়েও বড় হতে পারে।