এক্সপ্লেইনার

পাসপোর্টে ফিরছে ‘ইসরায়েল ব্যতীত’, নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গ করলেই সাজা?

ফাহিমা কানিজ লাভা
ফাহিমা কানিজ লাভা

বাংলাদেশি পাসপোর্টে আবারও যুক্ত হচ্ছে ‘এক্সেপ্ট ইসরায়েল’ বা ‘ইসরায়েল ব্যতীত’ শব্দবন্ধ। ফিলিস্তিনের ভূখণ্ড দখল করে প্রতিষ্ঠিত দেশটি ভ্রমণে নিরুৎসাহিত করতে স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশের পাসপোর্টে এই কথা লেখা হয়।

পাসপোর্টে লেখা থাকতো, ‘দিস পাসপোর্ট ইজ ভ্যালিড ফর অল কান্ট্রিজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড এক্সসেপ্ট ইসরায়েল (এই পাসপোর্টটি ইসরায়েল ব্যতীত বিশ্বের সব দেশের জন্য বৈধ)।’ তবে ২০২০ সালে ইপাসপোর্ট চালু করার সময় পাসপোর্ট থেকে ‘এক্সসেপ্ট ইসরায়েল’ শব্দবন্ধটি বাদ দেওয়া হয়েছিল। এখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর আবারও এটি পুনর্বহালের উদ্যোগ নিয়েছে।

বাংলাদেশের পাসপোর্টে কি শুধু ইসরায়েলের নামই ছিল? বিশ্বের অন্য দেশগুলোও কি এমন করে? বাংলাদেশ কি পাসপোর্টে এমন কথা লিখে দেওয়া একমাত্র দেশ?

শুধু ইসরায়েল নয়, পাসপোর্টে ছিল আরও দুই দেশের নাম

বাংলাদেশের পাসপোর্ট ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নথিপত্র থেকে এ বিষয়ে আরও কিছু তথ্য পাওয়া যায়। স্বাধীনতার পর ইসরায়েল ছাড়াও দক্ষিণ আফ্রিকা ও তাইওয়ানে বাংলাদেশি পাসপোর্ট প্রযোজ্য না হওয়ার কথা লেখা থাকত।

তখনকার পাসপোর্টে লেখা থাকত, ‘দিস পাসপোর্ট ইজ ভ্যালিড ফর অল কান্ট্রিজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড এক্সসেপ্ট ইসরায়েল, তাইওয়ান অ্যান্ড দ্য রিপাবলিক অব সাউথ আফ্রিকা।’

দক্ষিণ আফ্রিকায় স্বাধীনতার পর থেকে ১৯৯০-এর দশকের শুরু পর্যন্ত শ্বেতাঙ্গদের বর্ণবাদী ‘অ্যাপার্থাইড’ শাসন চালু ছিল। তখন দেশটিতে নেলসন ম্যান্ডেলার নেতৃত্বাধীন বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানায় বাংলাদেশ। দক্ষিণ আফ্রিকার তৎকালীন শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদীদের সরকারকে বৈধ বলে স্বীকার করত না বাংলাদেশ। এ কারণে পাসপোর্টে ‘এক্সসেপ্ট দ্য রিপাবলিক অব সাউথ আফ্রিকা’ লেখা হতো।

১৯৯৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদের অবসান ঘটে। নেলসন ম্যান্ডেলা প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এরপর বাংলাদেশ দেশটির সঙ্গে আবারও কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে। পরে পাসপোর্ট থেকেও দেশটির নাম বাদ দেওয়া হয়।

এছাড়া, বাংলাদেশ শুরু থেকেই ‘এক চীন নীতি’ সমর্থন করে আসছে। চীন তাইওয়ানকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। বাংলাদেশও সেই অবস্থান অনুসরণ করে। এ কারণেই আশির দশক পর্যন্ত বাংলাদেশি পাসপোর্টে ‘ব্যতীত’ তালিকায় তাইওয়ানের নাম ছিল। 

পরে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলালে ধীরে ধীরে তাইওয়ান ও দক্ষিণ আফ্রিকার নাম বাদ পড়ে। শেষ পর্যন্ত শুধু ইসরায়েলের নামই থেকে যায়।

এমন নজির আছে অন্য দেশেও

পাসপোর্টে নাম উল্লেখ করে দেওয়ার নজির বিশ্বের আরও অনেক দেশে আছে। কোনো রাষ্ট্র যদি অন্য কোনো রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি না দেয়, অথবা তাদের মধ্যে তীব্র বৈরী সম্পর্ক থাকে, তাহলে পাসপোর্টে নির্দিষ্ট দেশের নাম উল্লেখ করে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হতে পারে। 

পাকিস্তানি পাসপোর্টেও লেখা থাকে, ‘দিস পাসপোর্ট ইস ভ্যালিড ফর অল কান্ট্রিস অব দ্য ওয়ার্ল্ড এক্সেপ্ট ইসরায়েল’।

বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মতো আলজেরিয়া, লেবানন, ইরানসহ বেশ কিছু মুসলিম দেশ ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয়নি। তাদের নাগরিকদের সরাসরি ইসরায়েল ভ্রমণে নানা বিধিনিষেধ রয়েছে।

স্নায়ুযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রও কিছু কমিউনিস্ট দেশে ভ্রমণে নিজেদের নাগরিকদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল।

তখন কিউবা, উত্তর কোরিয়া, উত্তর ভিয়েতনাম ও চীনের মূল ভূখণ্ডে ভ্রমণের ক্ষেত্রে মার্কিন নাগরিকদের বিশেষ অনুমতি প্রয়োজন হতো। এখনো উত্তর কোরিয়ায় ভ্রমণে মার্কিন নাগরিকদের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আছে।

অন্যদিকে ফিদেল কাস্ত্রোর শাসনামলে কিউবান পাসপোর্টে যুক্তরাষ্ট্রসহ নির্দিষ্ট কিছু দেশে ভ্রমণের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ বা বিশেষ এক্সিট পারমিটের বাধ্যবাধকতা ছিল।

আবার অনেক দেশ পাসপোর্টে সরাসরি কোনো দেশের নাম লেখে না। সেক্ষেত্রে কূটনৈতিকভাবে তাদের নাগরিকদের নির্দিষ্ট দেশে যেতে বাধা দেওয়া হয়।

আজারবাইজান ও আর্মেনিয়ার মধ্যে নাগর্নো-কারাবাখ অঞ্চল নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। কারও পাসপোর্টে আর্মেনিয়ার ভিসা বা ভ্রমণের সিল থাকলে আজারবাইজান তাকে প্রবেশের অনুমতি দিতে চায় না। এমনকি জাতিগত আর্মেনীয়দেরও আজারবাইজানে প্রবেশাধিকার সীমিত। 

একইভাবে দীর্ঘদিন ধরে আরব বিশ্বের অনেক দেশ ইসরায়েলি ভিসা থাকা ব্যক্তিদের প্রবেশ করতে দিত না।

পাসপোর্টে ‘ব্যতীত’ লেখা থাকলে কি সেই দেশে যাওয়া অসম্ভব?

একটি দেশ যখন তার পাসপোর্টে আরেকটি দেশের নাম লিখে ‘ব্যতীত’ শব্দটি জুড়ে দেয়, তখন এর অর্থ হলো ওই পাসপোর্টটি নির্দিষ্ট দেশটিতে ভ্রমণের জন্য কোনো বৈধ দলিল নয়।

বাংলাদেশ যদি পাসপোর্টে ইসরায়েলে ভ্রমণ বৈধ নয় (নট ভ্যালিড) বলে, তাহলে কোনো বাংলাদেশি সেখানে গেলে দেশের পাসপোর্ট আইন ভাঙা হবে। এই আইন ভঙ্গ করলে পাসপোর্ট বাজেয়াপ্ত এমনকি শাস্তির বিধান আছে।

তবে বাংলাদেশ ইসরায়েলকে স্বীকৃতি না দিলেও ইসরায়েল চাইলে বাংলাদেশি নাগরিককে ভিসা দিতে পারে। এ ক্ষেত্রে সাধারণত পাসপোর্টে সরাসরি সিল না মেরে আলাদা কাগজে ভিসা বা ইমিগ্রেশনের অনুমতি দেওয়া হয়। একে ‘পেপার ভিসা’ বলা হয়।

ফলে সফর শেষে দেশে ফিরলেও পাসপোর্ট দেখে বোঝা কঠিন হয় যে তিনি ইসরায়েল গিয়েছিলেন।

অনেক বাংলাদেশির যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য বা কানাডার মতো অন্য দেশের নাগরিকত্বও নিয়ে থাকেন। তারা সেই দেশের পাসপোর্ট ব্যবহার করে সহজেই ইসরায়েল বা নিষেধাজ্ঞা থাকা অন্য দেশে যেতে পারেন। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশি পাসপোর্টের বিধিনিষেধ কার্যকর হয় না।

যখন বাংলাদেশি পাসপোর্টে দক্ষিণ আফ্রিকা বা তাইওয়ানের নাম ছিল, তখনও বিশেষ ব্যবসায়িক বা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে অনেকে তৃতীয় কোনো দেশের মাধ্যমে সেখানে যেতেন।

সেক্ষেত্রে তখন হংকং, ব্যাংকক বা অন্য কোনো শহরকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করা হতো। সরাসরি ফ্লাইট না থাকা এবং পাসপোর্টে সিল না মারার কারণে বাস্তবে ভ্রমণ পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব হতো না।