খাওয়ার পর কেন ঘুম পায়?
ধরুন, দিনের শুরুতে অদম্য উদ্যম ও প্রাণবন্ততা নিয়ে অফিসের কাজ শুরু করলেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী দুপুর ৩টা থেকে ৪টার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করার জন্য সময়ও নির্ধারণ করে রাখলেন। কিন্তু বিপত্তি ঘটল দুপুরের খাবারের পর। দুপুর ২টায় খাওয়ার পর থেকেই ভর করল ঘুম ঘুম ভাব, সঙ্গে দেখা দিল ক্লান্তিও।
এমন পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে অনেকেই এক কাপ চা বা কফির আশ্রয় নেন। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, এমনটা কেন হয়? এর পেছনে কি চিকিৎসাবিজ্ঞানের কোনো ব্যাখ্যা রয়েছে?
খাবার খাওয়ার কিছুক্ষণ পরই অনেকের চোখে ঘুম নেমে আসে। কমবেশি আমাদের সবারই এমন অভিজ্ঞতা হয়েছে। বিশেষ করে দুপুরের খাবারের পর এই অনুভূতিটি আরও বেশি প্রকট হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এ অবস্থাকে বলা হয় ‘পোস্টপ্র্যান্ডিয়াল সমনোলেন্স’।
খাবার খাওয়ার পর কেন এমন ঘুম ঘুম ভাব আসে, এর বৈজ্ঞানিক কারণ এবং এ থেকে মুক্তির উপায় সম্পর্কে বিস্তারিত জানিয়েছেন এমএইচ শমরিতা হাসপাতাল অ্যান্ড মেডিকেল কলেজের পুষ্টিবিদ আঞ্জুমান আরা শিমুল।
খাওয়ার পর কেন ঘুম পায়?
খাওয়ার পর কিছু সময়ের জন্য ঘুম ঘুম ভাব অনুভব করার পেছনে আমাদের শরীরের কিছু স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া কাজ করে। তবে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা জরুরি যে, এই ঘুমের তীব্রতা যদি প্রচণ্ড এবং ঘন ঘন হয়, তবে তা স্বাভাবিক নয়। এটি আপনার শরীরের কোনো স্বাস্থ্যগত জটিলতার পূর্বসংকেত হতে পারে। তাই এমন ক্ষেত্রে দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।
কার্বোহাইড্রেট বেশি খেলে
কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ বেশি রয়েছে এমন খাবার, যেমন সাদা পাউরুটি, মিষ্টি বা সিরিয়ালজাতীয় খাবার খেলে কিছু সময়ের জন্য আমরা বেশ এনার্জেটিক অনুভব করি। কিন্তু কিছু সময় পরই ঘুম ঘুম ভাব আসে এবং ক্লান্ত লাগে। কারণ, কার্বোহাইড্রেটজাতীয় খাবার আমাদের রক্তে সুগারের মাত্রা খুব দ্রুত বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে এই সুগারের মাত্রা কমানোর জন্য শরীর হঠাৎ করেই প্যানক্রিয়াস থেকে প্রচুর পরিমাণে ইনসুলিন নিঃসরণ করতে থাকে এবং
গ্লুকোজের মাত্রা কমিয়ে দেয়। শরীরে সুগারের মাত্রা খুব দ্রুত বেড়ে গিয়ে আবার দ্রুত কমে যাওয়ার ফলে শরীর কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই ক্লান্তি অনুভব হয় এবং ঘুম ঘুম লাগে।
বেশি পরিমাণে খাবার খেলে
একসঙ্গে অনেক বেশি খাবার খেলে শরীরকে তুলনামূলক বেশি হজমের কাজ করতে হয় এবং পেটও ভারী লাগে। এর সঙ্গে রক্তে সুগারের ওঠানামা ও হরমোনের পরিবর্তন যুক্ত হয়ে অলসতা বা তন্দ্রাভাব বাড়তে পারে।
ট্রিপটোফ্যান
ট্রিপটোফ্যান এক ধরনের অ্যামাইনো অ্যাসিড, যা বিভিন্ন ধরনের খাবার, যেমন ডিম, মাছ (টুনা মাছ), মুরগি, চিজ ও মাংসে পাওয়া যায়। এই ধরনের খাবার খেলে ট্রিপটোফ্যান রক্তের মাধ্যমে আমাদের ব্রেনে পৌঁছায়। সেখানে এটি সেরোটোনিনে রূপান্তরিত হয়। সেরোটোনিন এক ধরনের নিউরোট্রান্সমিটার, যা আমাদের দেহের বিভিন্ন কাজ, যেমন মুড নিয়ন্ত্রণ ও ঘুমের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়াগুলো নিয়ন্ত্রণ করে।
সেরোটোনিন আবার মেলাটোনিনে রূপান্তরিত হয়। মেলাটোনিন এক ধরনের হরমোন, যা সরাসরি সারকাডিয়ান রিদম (দেহ ঘড়ি) নিয়ন্ত্রণ করে এবং তন্দ্রাভাব আনতে সাহায্য করে।
অনেক বেশি পরিমাণে খাবার খাওয়ার পর, বিশেষ করে কার্বোহাইড্রেটসমৃদ্ধ খাবার খেলে, আমাদের শরীরে ইনসুলিনের নিঃসরণ বৃদ্ধি পায়, যা রক্তে অ্যামাইনো অ্যাসিডের পরিবহনকেও বাড়িয়ে দেয়। ফলে রক্ত থেকে ব্রেনেও ট্রিপটোফ্যানের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে এবং আমরা ঘুম ঘুম অনুভব করি।
প্রক্রিয়াজাতকৃত খাবার
প্রক্রিয়াজাতকৃত খাবারের সাধারণত গ্লাইসেমিক ইনডেক্স অনেক বেশি থাকে। অর্থাৎ, এই খাবারগুলো খুব দ্রুত আমাদের রক্তে সুগারের মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে। আর রক্তে সুগারের মাত্রা বেড়ে গেলে ইনসুলিন দ্রুত তা কমিয়ে আনার চেষ্টা করে, যা আমাদের ক্লান্তি ও তন্দ্রাভাব—দুটোই অনুভব করাতে পারে।
ভারী ও চর্বিযুক্ত খাবার
আমরা কোনো খাবার খাওয়ার পর প্রথমে সেটি হজম হয় এবং সেখান থেকে পুষ্টি শোষিত হয়। এ সময় আমাদের পরিপাকতন্ত্র কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে এবং বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হজম সম্পন্ন করে। অতিরিক্ত পরিমাণে লাল মাংস, যেমন গরু বা খাসির মাংস, খেলে সেগুলো হজম করতে আমাদের শরীরকে তুলনামূলক বেশি এনার্জি খরচ করতে হয়। ফলে শরীরে অস্বস্তি ও ভারী অনুভূতি তৈরি হয়, যা তন্দ্রাভাব বাড়াতে পারে।
রাতে পর্যাপ্ত ঘুম না হলে
রাতে যদি ঠিকমতো ঘুম না হয়, তাহলে দিনের বেলায় খাবার খাওয়ার পর ক্লান্তিভাব বেশি অনুভূত হতে পারে। ঘুমের ঘাটতি থাকলে খাওয়ার পর চোখ আরও ভারী লাগতে পারে।
খাওয়ার পর অতিরিক্ত ঘুম এড়াবেন যেভাবে
খাদ্যতালিকায় কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ বেশি না রেখে পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রোটিন (মুরগি, ডাল, মাছ) ও স্বাস্থ্যকর ফ্যাটসমৃদ্ধ খাবার (বাদাম, বীজজাতীয় খাবার) রাখতে হবে।
একবারে অতিরিক্ত খাবার না খাওয়া।
খাবারে শাকসবজি, প্রোটিন ও আঁশযুক্ত খাবার রাখা।
কম গ্লাইসেমিক ইনডেক্সযুক্ত খাবার খাদ্যতালিকায় রাখা।
প্রক্রিয়াজাত খাবার তুলনামূলকভাবে কম খাওয়া।
চর্বিযুক্ত লাল মাংস খাওয়ার পরিমাণ কমানো।
খাবারের পর ১০–১৫ মিনিট হালকা হাঁটাহাঁটি করা।
রাতে পর্যাপ্ত ও নিয়মিত ঘুমানো।


