মানুষ কেন ঘুমের মধ্যে হাঁটে, বিজ্ঞান যা বলছে
ঘুমের মধ্যে হঠাৎ উঠে হাঁটছেন। দরজা খুলছেন, সিঁড়ি দিয়ে নামছেন, এমনকি রান্নাঘরেও চলে যাচ্ছেন। অথচ সকালে ঘুম থেকে উঠে এসবের কিছুই মনে নেই!
এভাবে ঘুমের মধ্যে হাঁটাকে বলা হয় স্লিপওয়াকিং। বিষয়টি যেমন অদ্ভুত, তেমনি বেশ রহস্যময়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, মানুষই কেন ঘুমের মধ্যে হাঁটে? অন্য প্রাণীরা কি এমন করে না?
বিজ্ঞানীদের মতে, এর উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের অনেকটা পেছনে ফিরে যেতে হবে, মানুষের পূর্বপুরুষেরা কোথায় ঘুমাতেন, সেটি জানতে হবে।
আমরা ঘুমিয়েও কীভাবে হাঁটি
ঘুমের মধ্যে হাঁটা সাধারণত গভীর ঘুমের সময় ঘটে। তখন মস্তিষ্কের সব অংশ একসঙ্গে ঘুমিয়ে থাকে না। শরীর নড়াচড়া করার জন্য মস্তিষ্কের যে অংশগুলো কাজ করে, সেগুলোর কিছু জেগে উঠতে পারে। কিন্তু চিন্তা করা, সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং কোনো ঘটনা মনে রাখার সঙ্গে যুক্ত অংশ তখনো ঘুমিয়ে থাকে।
তাই একজন মানুষ ঘুমের মধ্যেই উঠে হাঁটতে পারেন, দরজা খুলতে পারেন বা সিঁড়ি দিয়ে নামতে পারেন। বাইরে থেকে মনে হতে পারে, তিনি বুঝেশুনেই এসব করছেন। কিন্তু আসলে তিনি তখন পুরোপুরি জেগে থাকেন না।
টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবর্তনীয় নৃবিজ্ঞানী ডেভিড আর. স্যামসন বলেন, কখনো কখনো মস্তিষ্ক পুরোপুরি জেগে ওঠার আগেই শরীর নড়াচড়া শুরু করে। তাই ঘুমের মধ্যে হাঁটার পর সকালে অনেকেরই সেই ঘটনা মনে থাকে না।
অন্য প্রাণীরা কেন ঘুমের মধ্যে হাঁটে না
কুকুর বা বিড়ালকে ঘুমের মধ্যে পা নাড়াতে দেখা যায়। দেখে মনে হতে পারে, তারা হয়তো স্বপ্নে দৌড়াচ্ছে।
তবে ঘুমের মধ্যে উঠে দাঁড়ানো, হাঁটা ও সামনে থাকা বাধা এড়িয়ে চলার মতো ঘটনা অন্য প্রাণীর মধ্যে মানুষের মতো করে দেখা যায়নি।
এর একটি কারণ হতে পারে, আমাদের পূর্বপুরুষদের জীবনযাপন।
গবেষক স্যামসনের মতে, বেশিরভাগ বানরজাতীয় প্রাণী মাটির ওপর ঘুমায়। তারা গাছের ডাল, গাছের কোটর বা উঁচু জায়গায় রাত কাটায়।
এ অবস্থায় কেউ যদি ঘুমের মধ্যে উঠে হাঁটতে শুরু করে, তাহলে গাছ থেকে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এতে গুরুতর আঘাত, এমনকি মৃত্যুও হতে পারে।
তাই তাদের জন্য ঘুমের মধ্যে হাঁটা খুব বিপজ্জনক হওয়ার কথা।
স্যামসন জানান কিন্তু মানুষের পূর্বপুরুষেরা যখন গাছের বদলে মাটিতে নিরাপদ জায়গায় ঘুমাতে শুরু করলেন, তখন পরিস্থিতি বদলে গেল। তারা আগুন জ্বালাতেন, থাকার জায়গা তৈরি করতেন এবং দলবদ্ধভাবে থাকতেন। ফলে রাতে নিরাপত্তাও বাড়ল।
ঘুমের মধ্যে কেউ উঠে পড়লেও আগের মতো গাছ থেকে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকল না। তাই এই আচরণ মানুষের মধ্যে থাকার সুযোগ পেল।
বিবর্তনবিজ্ঞানে বিষয়টিকে বলা হয় ‘রিল্যাক্সড সিলেকশন’। সহজ করে বললে, কোনো একটি বৈশিষ্ট্য ক্ষতিকর হলেও সেটি যদি খুব বড় বিপদ তৈরি না করে, তাহলে বিবর্তনের মাধ্যমে সেটি পুরোপুরি হারিয়ে নাও যেতে পারে।
গবেষকদের ধারণা, মানুষের স্লিপওয়াকিংও হয়তো এভাবেই টিকে গেছে।

পরিবারে থাকলে ঝুঁকি বেশি
ঘুমের মধ্যে হাঁটার সঙ্গে বংশগত সম্পর্ক আছে। অর্থাৎ পরিবারের কারও স্লিপওয়াকিংয়ের ইতিহাস থাকলে অন্য সদস্যদের মধ্যেও এর সম্ভাবনা বাড়ে।
একটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশুর পরিবারে স্লিপওয়াকিংয়ের ইতিহাস নেই, তাদের প্রায় ২২ শতাংশের ঘুমের মধ্যে হাঁটার অভিজ্ঞতা হতে পারে।
বাবা-মায়ের একজনের এমন অভ্যাস থাকলে এই হার বেড়ে প্রায় ৪৭ শতাংশ হয়। আর বাবা ও মা দুজনেরই স্লিপওয়াকিং থাকলে ঝুঁকি বেড়ে যায় প্রায় ৬১ শতাংশে।
তবে এর মানে এই নয়, বাবা-মায়ের স্লিপওয়াকিং থাকলেই সন্তানেরও হবে।

শিশুদের মধ্যে বেশি দেখা যায় কেন
সাধারণত শিশুদের ঘুমের মধ্যে হাঁটার ঘটনা বেশি দেখা যায়। এর একটি কারণ হলো, শিশুদের গভীর ঘুম বেশি হয়। এ ছাড়া তাদের মস্তিষ্কের ঘুম ও জেগে থাকার ব্যবস্থা তখনো পুরোপুরি তৈরি হয় না।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক শিশুর স্লিপওয়াকিং কমে যায়।
বংশগত কারণের পাশাপাশি আরও কিছু বিষয় ঘুমের মধ্যে হাঁটার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। যেমন—পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া, জ্বর, মানসিক চাপ, অ্যালকোহল পান, কিছু ওষুধ, ঘুমের সমস্যা—যেমন অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া।
তাই কারও নিয়মিত ঘুমের মধ্যে হাঁটার অভ্যাস থাকলে বিষয়টিকে শুধু মজার ঘটনা হিসেবে না দেখে এর কারণ খুঁজে দেখা ভালো।
ঘুমের মধ্যে হাঁটার সময় কী ঘটে
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, ঘুমের মধ্যে হাঁটা মানুষের কাছে অনেক সময় একেবারেই স্বাভাবিক মনে হতে পারে।
ডেভিড স্যামসন তার এক বন্ধুর স্লিপওয়াকিংয়ের একটি ঘটনা বলেছেন। এক রাতে তিনি অন্ধকার করিডরে হাঁটার সময় বন্ধুর মুখোমুখি হন। তার বন্ধু হঠাৎ ছুটে এসে তাকে ধরে ফেলেন। কিছুক্ষণ পর আবার নিজের ঘরে ফিরে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন।
পরদিন বন্ধুটির কিছুই মনে ছিল না।
তবে তিনি জানান, স্বপ্নে ও বন্ধু নাকি দেখেছিলেন, একটি কাঠের দেওয়াল স্যামসনের ওপর পড়ছে। তাই তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করছিলেন।
অর্থাৎ, বাইরে থেকে ঘটনাটি অদ্ভুত বা ভয়ংকর মনে হলেও, ঘুমের মধ্যে থাকা ব্যক্তির কাছে সেটি তার স্বপ্নেরই অংশ হতে পারে।

বিবর্তনের এক অদ্ভুত ঘটনা
ঘুমের মধ্যে হাঁটা মানুষের কোনো বিশেষ ক্ষমতা নয়। বরং এটি ঘুমের সময় মস্তিষ্কের কাজের একটি অদ্ভুত সমস্যা বলেই মনে করেন গবেষকেরা।
তবে মানুষের পূর্বপুরুষেরা যখন গাছের বদলে নিরাপদ জায়গায় ঘুমাতে শুরু করলেন, তখন এই সমস্যাটি খুব বড় বিপদ তৈরি করত না। তাই সময়ের সঙ্গে এটি পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।
এ কারণেই আজও কিছু মানুষ ঘুমের মধ্যে উঠে হাঁটেন, কথা বলেন বা নানা কাজ করেন। অথচ সকালে তাদের কিছুই মনে থাকে না।
অর্থাৎ, ঘুমের মধ্যে হাঁটা হয়তো বিবর্তনের কোনো বিশেষ ক্ষমতা নয়। বরং এটি এমন একটি পুরোনো বৈশিষ্ট্য, যা মানুষের জন্য খুব বড় সমস্যা না হওয়ায় এখনো টিকে আছে।
সূত্র: পপুলার সায়েন্স


