শিশু ঘুমাতে চায় না, জেনে নিন ৭ সহজ কৌশল
সারাদিনের ব্যস্ততার পরও অনেক শিশু রাতে সহজে শান্ত হতে চায় না। বিছানায় যাওয়ার পরও গল্প, খেলনা কিংবা নানা আবদার চলতে থাকে। এমন পরিস্থিতিতে ঘুমের আগে কয়েক মিনিটের মেডিটেশন বা মন শান্ত করার কৌশল ধীরে ধীরে শিশুর ঘুমের প্রস্তুতিতে সহায়তা করতে পারে।
কিডজলিডজ চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট সেন্টারের আরলি চাইল্ডহুড এডুকেশন কনসালটেন্ট লীনা ফেরদৌস বলেন, শিশুর মানে মেডিটেশন বড়দের মতো দীর্ঘ সময় চোখ বন্ধ করে বসে থাকা নয়। শান্তভাবে শ্বাস নেওয়া, গল্প শোনা, দিনের ভালো দিকগুলো নিয়ে কথা বলা কিংবা কল্পনার জগতে হারিয়ে যাওয়ার মতো সহজ কিছু কাজও এর অংশ হতে পারে।
শিশুর জন্য মেডিটেশনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্বস্তিদায়ক পরিবেশ। এটি যেন কোনো বাধ্যতামূলক কাজ মনে না হয়। বরং ঘুমের রুটিনের একটি আনন্দের অংশ হয়ে ওঠে।

ঘুমের পরিবেশে শিশুকে কিছুটা স্বাধীনতা দেওয়া
কোন খেলনাটি সঙ্গে নিয়ে ঘুমাবে, কোন বালিশ ব্যবহার করবে কিংবা কোন চাদর পছন্দ, এমন ছোটখাটো বিষয়ে শিশুকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দিন।
লীনা ফেরদৌস জানান, তবে নিয়মের বাইরে কোনো কিছু বেছে নেওয়ার সুযোগ না দিয়ে গ্রহণযোগ্য দু-তিনটি বিকল্প থেকে তাকে পছন্দ করতে দিন। এতে নিজের ঘুমের পরিবেশ নিয়ে শিশুর মধ্যে স্বস্তি ও নিয়ন্ত্রণের কৌশল তৈরি হতে পারে।
নিজের গল্প বানানোর সুযোগ দেওয়া
শিশুকে শুধু বই পড়ে শোনানোর বদলে কখনো তাকে বানিয়ে গল্প বলতে দিন। জিজ্ঞেস করতে পারেন, ‘আজ বই পড়ব, নাকি তুমি একটা গল্প বানাবে?’
গল্পের চরিত্র, জায়গা বা ঘটনা শিশুই ঠিক করতে পারে। যেমন, ‘একটি ছোট পাখি রাতে ঘুমাতে পারছিল না। সে চাঁদের কাছে গেল। তারপর কী হলো?’
শিশুকে গল্পের পরের অংশ বলতে দিন। এতে কল্পনাশক্তির চর্চার পাশাপাশি ঘুমের আগে মনও ধীরে ধীরে শান্ত হতে পারে।

শান্ত কণ্ঠে কথা বলা
ঘুমের আগে গল্প কিংবা মেডিটেশনের সময় আপনার কণ্ঠ শিশুর জন্য সবচেয়ে স্বস্তিদায়ক হতে পারে। তবে কোন ধরনের কণ্ঠ বা শব্দে শিশু আরাম পায়, সেটি তার ওপর নির্ভর করে।
লীনা ফেরদৌস বলেন, কথা বলার সময় গলার স্বর একটু নিচু রাখুন এবং ধীরে ধীরে কথা বলুন। চাইলে শিশুর পছন্দের শান্ত কোনো গল্প বা গাইডেড মেডিটেশনও শোনাতে পারেন।
অল্প সময় দিয়ে শুরু করা
তিনি পরামর্শ দেন, প্রথম দিন থেকেই দীর্ঘ সময় মেডিটেশন করানোর প্রয়োজন নেই। শিশুর বয়স অনুযায়ী অল্প সময় দিয়ে শুরু করুন। একটি সহজ পদ্ধতি হলো—শিশুর বয়স যত বছর, শুরুতে প্রায় তত মিনিট অনুশীলন করা।
যেমন, চার বছরের শিশুর জন্য চার মিনিট দিয়ে শুরু করা যেতে পারে। পরে অভ্যাস হয়ে গেলে সময় বাড়ানো যাবে।
প্রিস্কুল বয়সী শিশুর জন্য কয়েক মিনিটই যথেষ্ট। স্কুলপড়ুয়া শিশুদের ক্ষেত্রে প্রায় ১০ মিনিট পর্যন্ত করা যেতে পারে। তবে সময়ের চেয়ে শিশুর স্বস্তিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিরক্ত বা অস্বস্তি বোধ করলে তাকে জোর করবেন না।

শুরুতে আগ্রহ না দেখালে অন্যভাবে চেষ্টা করা
নতুন কোনো অভ্যাস শিশুর ভালো না-ও লাগতে পারে। তাই প্রথম কয়েকবার কাজ না করলে হতাশ হওয়ার দরকার নেই।
লীনা ফেরদৌসের ভাষ্য, ঘুমের সময়ের বদলে দিনের অন্য সময়ে এটিকে মজার খেলা হিসেবে শুরু করতে পারেন। যেমন, এক মিনিট চোখ বন্ধ করে শান্তভাবে শ্বাস নেওয়া বা কল্পনায় একটি সুন্দর জায়গায় ঘুরে আসার খেলা।
পরে ধীরে ধীরে এটিকে ঘুমের রুটিনে যুক্ত করা যায়।
দিনের ভালো মুহূর্ত নিয়ে কথা বলা
ঘুমের আগে শিশুর সঙ্গে দিনের ভালো ঘটনাগুলো নিয়ে কথা বলুন। যেমন—
‘আজ তোমার কী কী সবচেয়ে ভালো লেগেছে?’
‘আজ কী কারণে তুমি খুশি হয়েছ?’
‘আজ তুমি কাকে সাহায্য করেছ?’
এ ধরনের কথোপকথন শিশুকে দিনের ব্যস্ততা থেকে বেরিয়ে শান্ত হতে সাহায্য করতে পারে।
একে অন্যকে প্রশংসা করা
ঘুমের আগে বাবা-মা ও শিশু একে অন্যকে একটি করে ভালো কথা বলতে পারেন।
আপনি বলতে পারেন, ‘আজ তুমি খুব সুন্দর করে খেলনাগুলো গুছিয়েছ।’
শিশুও বলতে পারে, ‘আম্মু, তুমি আজ আমার সঙ্গে খেলেছ।’
এ ধরনের আন্তরিক প্রশংসা পারিবারিক সম্পর্ককে উষ্ণ করে এবং শিশুর আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।
শিশুর মেডিটেশন কেমন হবে
লীনা ফেরদৌসীর ভাষ্য, শিশুর মেডিটেশন খুব সহজ হওয়াই ভালো। কখনো ধীরে শ্বাস নেওয়া, কখনো গল্প শোনা, কখনো দিনের ভালো ঘটনা নিয়ে কথা বলা—সবই হতে পারে এর অংশ।
মূল লক্ষ্য শিশুকে চুপ করিয়ে রাখা নয়; বরং তার শরীর ও মনকে ধীরে ধীরে বিশ্রামের জন্য প্রস্তুত করা।

একটি সহজ ঘুমের অনুশীলন
শিশুকে আরাম করে শুইয়ে বলুন, ‘চলো, আমরা ধীরে ধীরে শ্বাস নিই।’
নাক দিয়ে ধীরে শ্বাস নিতে এবং ধীরে ধীরে ছাড়তে বলুন। এরপর শান্ত কণ্ঠে বলতে পারেন, ‘চোখ বন্ধ করে ভাবো, তুমি একটা সুন্দর বাগানে আছ। চারদিকে হালকা বাতাস। গাছের পাতাগুলো আস্তে আস্তে নড়ছে। তুমি নিরাপদ ও আরামে আছ।’
কিছুক্ষণ এভাবে বলার পর শিশুকে নিজের মতো শান্ত হয়ে থাকতে দিন।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, শিশুর ঘুমের সমস্যা হলেই মেডিটেশন সমাধান, এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়। তবে ঘুমের আগে নিয়মিতভাবে কিছু অনুশীলন অনেক শিশুর রাতের রুটিন আরামদায়ক করে তুলতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, শিশুর ওপর এটি চাপিয়ে না দেওয়া। তার বয়স, পছন্দ ও মেজাজ অনুযায়ী পদ্ধতি বদলান। কয়েক মিনিটের গল্প, ইতিবাচক কথা, দিনের সুন্দর স্মৃতি কিংবা ধীরে শ্বাস নেওয়ার অভ্যাস দিয়েই তৈরি হতে পারে শিশুর শান্ত ও আরামদায়ক ঘুমের রুটিন।



