গ্যাস সংকট আরও প্রকট, মাশুল গুনছে শিল্পকারখানা
গত ২১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া গ্যাস সংকটের প্রভাব এখন দেশের শিল্পাঞ্চলগুলোতে ছড়িয়ে পড়ছে। কারখানাগুলো উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে, কোনো কোনো ইউনিট বন্ধ রাখা হচ্ছে এবং শ্রমিকদের ছুটিতে পাঠানো হচ্ছে।
গত বুধবার এক্সিলারেট এনার্জির এলএনজি টার্মিনালটি মজুত ফুরিয়ে যাওয়ায় বন্ধ হয়ে যায়, যার ফলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। এর ফলে আগে থেকেই সংকটাপন্ন গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
বর্তমানে দেশে দিনের বেলা ১৩ হাজার থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াট এবং সন্ধ্যায় ১৫ হাজার থেকে ১৬ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। এর ফলে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় দেড় হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানা, গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো প্রতিদিন ৯৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পেয়ে ৫ হাজার ২০০ মেগাওয়াট এবং কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো ৫ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে।
এর অর্থ হলো, জাতীয় গ্রিডে আসা গ্যাসের সিংহভাগই বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় হচ্ছে। ফলে যেসব শিল্পকারখানা বয়লার, উৎপাদন প্রক্রিয়া বা নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনের (ক্যাপটিভ পাওয়ার) জন্য সরাসরি গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল, তারা পর্যাপ্ত গ্যাস পাচ্ছে না।
গত সপ্তাহে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও গত দুদিন ধরে শিল্পাঞ্চলগুলোতে আবারও তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে।
নরসিংদীর পরিস্থিতি বিবেচনা করলে দেখা যায়, সেখানে গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসায় গত দুই দিনে ১০০টিরও বেশি টেক্সটাইল কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে।
নরসিংদী সদরের আবেদ টেক্সটাইল মিলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, তার কারখানায় গত ২০ দিন ধরেই উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।
চৌয়ালা এলাকার ভাই ভাই টেক্সটাইল-এর মালিক জাহাঙ্গীর আলম তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোনো সদুত্তর না পেয়ে গতকাল অনির্দিষ্টকালের জন্য উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছেন এবং শ্রমিকদের ছুটিতে পাঠিয়েছেন।
কারখানা মালিকরা জানান, এই সংকটের আগে থেকেই গ্যাসের চাপ ধীরে ধীরে কমছিল। গত সপ্তাহে চাপ স্বাভাবিক ১৫ পিএসআই থেকে কমে ২-৪ পিএসআই-তে নামে এবং গত কয়েক দিনে তা প্রায় শূন্যে ঠেকেছে।
নরসিংদী টেক্সটাইল, ডাইং অ্যান্ড প্রিন্টিং অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নিজাম উদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, দেশের পোশাক চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশই নরসিংদী থেকে সরবরাহ করা হয়।
তিনি সতর্ক করে বলেন, এই অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে কারখানা মালিকদের পক্ষে শ্রমিকদের বেতন বা গ্যাসের বিল পরিশোধ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
গ্যাস সংকটের এই প্রভাব গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও সাভারের পোশাক কারখানাগুলোতেও তীব্রভাবে পড়ছে।
গাজীপুরের শিল্প পুলিশ সুপার আমজাদ হোসেন জানান, সেখানে এখন পর্যন্ত কোনো কারখানা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। তবে অনেক কারখানা কর্তৃপক্ষ শ্রমিকদের বিভিন্ন শিফটে ভাগ করে কাজ চালাচ্ছে, যার ফলে উৎপাদন প্রায় ২০-২৫ শতাংশ কমে গেছে।
লিড টাইম অ্যাপারেলস"-এর ম্যানেজার কাঞ্চন ঘোষ জানান, প্রায় এক মাস ধরে সেখানে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সমস্যা চলছে।
তিনি বলেন, ‘বর্তমানে দিনে প্রায় চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না, সেই সাথে জেনারেটরও আমাদের বন্ধ রাখতে হচ্ছে।’
নারায়ণগঞ্জের বিসিক এলাকার সাফিয়া অ্যাপারেলসে মাত্র দুই মাস আগেও দৈনিক ২৫ হাজার পিস পোশাক উৎপাদন হতো, যা এখন কমে মাত্র ৮ হাজারে নেমে এসেছে।
৬০০ শ্রমিকের এই কারখানার পরিচালক রোকন উদ্দিন জানান, উৎপাদন কমে যাওয়ায় নগদ অর্থের তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘গত মাসে শ্রমিকদের বেতন দিতে আমাদের ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হয়েছে।’
ভোগ এক্সিস অ্যাসোসিয়েটসের উৎপাদন ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ টুটুল জানান, ডাইং কারখানাগুলো সময়মতো কাপড় সরবরাহ করতে না পারায় তাদের উৎপাদন এখন মোট ক্ষমতার ৪০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে।
অন্যদিকে, সাভারে পাকিজা গ্রুপের দুটি ইউনিট—পাকিজা ডাইং অ্যান্ড প্রিন্টিং ইন্ডাস্ট্রিজ এবং পাকিজা টেক্সটাইল—প্রায় এক মাস ধরে বন্ধ রয়েছে, যার ফলে বিপাকে পড়েছেন প্রায় আড়াই হাজার শ্রমিক।
গ্রুপের উপদেষ্টা নাইমুল ইসলাম নাঈম জানান, তাদের নিটিং সেকশনে প্রায় ১৩ হাজার কর্মী কাজ করেন। এই সেকশনের কার্যক্রম বর্তমানে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, যেসব জেনারেটর সাধারণত গ্যাসে চলে, সেগুলো এখন জ্বালানি তেল দিয়ে চালানো হচ্ছে। ফলে খরচ প্রায় পাঁচ গুণ বেড়ে গেছে।
আনলিমা টেক্সটাইলের মহাব্যবস্থাপক রেজাউল কাইউম জানান, আগে যেখানে প্রতিদিন ১২-১৪ টন কাপড় উৎপাদন হতো, এখন তা কমে মাত্র ২ টনে নেমে এসেছে। গত মাসে যেখানে ৩০০ টন কাপড় ডাইং করার কথা ছিল, তারা করতে পেরেছে মাত্র ৬০ টন।
সাভার ট্যানারি শিল্প এলাকার আজমেরি লেদার ইন্ডাস্ট্রিজের উৎপাদনও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
এদিকে ময়মনসিংহের ভালুকা শিল্পাঞ্চলে গতকাল ২০টি কারখানার শ্রমিকদের আংশিকভাবে ছুটিতে পাঠানো হয়েছে।
শিল্প পুলিশ-৫-এর পুলিশ সুপার মো. আনসার উদ্দিন জানান, ওই এলাকার ২৯৩টি কারখানার মধ্যে ৯৯টি গ্যাসচালিত এবং এর প্রায় সবগুলোই বর্তমানে গ্যাস সংকটের মুখে পড়েছে।
তিতাস গ্যাসের ভালুকা আঞ্চলিক অফিস থেকে জানানো হয়েছে, ওই এলাকার দুটি লাইনে গ্যাসের চাপ ১৪০ এবং ৫০ পিএসআই থেকে কমে ৩০ থেকে ৫০ পিএসআই-তে নেমে এসেছে।
উৎপাদন কমে যাওয়া বা পুরোপুরি বন্ধ থাকা সত্ত্বেও কারখানাগুলোকে নিয়মিত শ্রমিকদের বেতন চালিয়ে যেতে হচ্ছে।
অন্যদিকে, সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় শিপমেন্টের সময়সূচি বিপর্যয়ের মুখে পড়ছে, যা ব্যয়বহুল বিমানে পণ্য পাঠানোর (এয়ার ফ্রেট) ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
এ ছাড়া গাজীপুরে কারখানা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, উৎপাদন কোনোমতে সচল রাখতে তারা শ্রমিকদের বিভিন্ন শিফটে ভাগ করে কাজ করাচ্ছে।
শ্রমিক নেতা শফিউল আলম সতর্ক করে বলেছেন, এই দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা কারখানার আয় কমিয়ে দিতে পারে এবং শ্রমিকদের মধ্যে হতাশা তৈরি করতে পারে।
তিনি বলেন, পরিস্থিতি যদি দীর্ঘদিন এভাবে চলতে থাকে, তবে শ্রমিক অসন্তোষ, কাজ বন্ধ রাখা বা বিক্ষোভের ঝুঁকি রয়েছে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সহ-সভাপতি মোর্শেদ সারোয়ার সোহেল বলেন, ‘শুধু পোশাক কারখানার মালিকরাই ভুগছেন না—এই সংকট শ্রমিকদের এবং আমাদের জাতীয় অর্থনীতিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে।’
গ্যাসের চাপ অত্যন্ত কম থাকায় চট্টগ্রামের রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (সিইপিজেড), কর্ণফুলী ইপিজেড এবং বায়েজিদ ও কালুরঘাট শিল্প এলাকার কারখানাগুলোও তাদের সক্ষমতার চেয়ে অনেক কম উৎপাদন করছে।
এই সংকট টেক্সটাইল, পোশাক, ইস্পাত, কাঁচ, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণসহ অন্যান্য গ্যাস-নির্ভর শিল্পে বড় আঘাত হেনেছে। বিশেষ করে যেসব কারখানা গ্যাসচালিত বয়লার এবং নিজস্ব বিদ্যুৎকেন্দ্র (ক্যাপটিভ পাওয়ার) ব্যবহার করে, তারা এখন ব্যয়বহুল বিকল্প ব্যবস্থা বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে।
চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, কিছু কারখানায় উৎপাদন সক্ষমতার অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে এবং কিছু কারখানা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে দেশের রপ্তানি, পণ্যের সরবরাহ এবং শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর নগদ অর্থের প্রবাহ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
কেএসআরএম গ্রুপের পরিচালক জসিম উদ্দিন জানান, গত আট দিন ধরে তাদের দুটি কারখানায় উৎপাদন প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা দিনে এক থেকে দেড় ঘণ্টার জন্যও গ্যাস পাচ্ছি না। পরিস্থিতি এভাবে চলতে থাকলে লে-অফ ঘোষণা করা ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় থাকবে না।’
[প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন আমাদের নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদী, চট্টগ্রাম, সাভার ও ময়মনসিংহ সংবাদদাতা]