শিশু খেতে চায় না, অভিভাবকের করণীয়

লীনা ফেরদৌস
লীনা ফেরদৌস

‘আমার সন্তান কিছুই খেতে চায় না’—অভিভাবকদের মুখে এমন অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়। শিশু খাবার দেখলেই মুখ ফিরিয়ে নেয়, অল্প কিছু খেয়ে বলে ‘আর খাব না’ কিংবা পছন্দের খাবার ছাড়া অন্য কিছু খেতে চায় না। স্বাভাবিকভাবেই এতে মা-বাবার দুশ্চিন্তা বাড়ে।

তবে একবেলার খাবারের পরিমাণ দেখেই শিশুর খাবারের অভ্যাস সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিশু বিভাগের অধ্যাপক ডা. ফেরদৌসী হাসনাত বলেন, শিশুর ক্ষুধা প্রতিদিন সমান থাকে না। বয়স, শারীরিক বৃদ্ধি, খেলাধুলা ও ঘুমের ওপর নির্ভর করে কখনো বেশি, কখনো কম খেতে পারে।

খেতে না চাওয়া কি দুষ্টুমি?

অনেক সময় শিশুর খেতে না চাওয়াকে অভিভাবকেরা দুষ্টুমি বলে মনে করেন। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এর পেছনে কোনো না কোনো কারণ থাকে। তাই জোর করে খাওয়ানোর আগে শিশুটি কেন খেতে চাইছে না, সেটি বোঝা জরুরি।

ডা. ফেরদৌসী হাসনাতের মতে, শিশুর খাবারের পরিমাণ বড়দের মাপকাঠিতে বিচার করা ঠিক নয়। একদিন শিশু পেট ভরে খেতে পারে, আবার অন্যদিন অল্প খেয়েই মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রেই এটি স্বাভাবিক।

শিশুর পুষ্টি বোঝার ক্ষেত্রেও শুধু ‘কতটুকু ভাত খেল’—এটি যথেষ্ট নয়। ভাত কম খেলেও ডিম, মাছ, ডাল, শাকসবজি, ফল বা দুধ থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি পেতে পারে। তাই একবেলা কম খাওয়াকে কেন্দ্র করে দুশ্চিন্তা না করে শিশুর সামগ্রিক খাবারের অভ্যাস, সক্রিয়তা এবং বয়স অনুযায়ী ওজন ও উচ্চতা বাড়ছে কি না, সেদিকে নজর দেওয়া জরুরি।

খাবার দেখলেই মুখ ফিরিয়ে নেয় কেন?

ডা. ফেরদৌসী হাসনাত জানান, শিশুর খেতে না চাওয়ার পেছনে নানা কারণ থাকতে পারে। পেটে গ্যাস, কোষ্ঠকাঠিন্য, মুখে ঘা কিংবা দাঁত ওঠার সময় মাড়ির ব্যথার কারণে তার খাবারের প্রতি অনীহা দেখা দিতে পারে।

আবার একই ধরনের খাবার প্রতিদিন খেতে দিলে একঘেয়েমিও তৈরি হতে পারে। খাবারে তাই মাঝে মাঝে বৈচিত্র্য আনা দরকার।

আরেকটি বড় কারণ হলো অতিরিক্ত নাশতা। বিস্কুট, চিপস, চকলেট বা জুস খেয়ে শিশুর পেট আগেই ভরে গেলে মূল খাবারের সময় তার ক্ষুধা থাকে না।

খাবার নিয়ে জোরজবরদস্তি করাও ঠিক নয়। ‘পুরো খাবার শেষ না করলে খেলতে পারবে না’ বা ‘সবজি না খেলে টিভি বন্ধ’—এ ধরনের চাপ শিশুর খাবারের প্রতি অনীহা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

অভিভাবকের করণীয়

প্রথমত খাবারে বৈচিত্র্য আনতে হবে। শিশুর খাবার দেখতে আকর্ষণীয় হওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। সাদা ভাতের সঙ্গে গাজর, মটরশুঁটি বা অন্য সবজি যোগ করা যেতে পারে। সিদ্ধ ডিম, ফল বা সবজি একটু সুন্দর করে সাজিয়ে দিলে শিশুর আগ্রহ বাড়তে পারে।

দ্বিতীয়ত, খাবারের সময় নির্দিষ্ট করা। সকাল, দুপুর ও রাতের খাবারের জন্য একটি নিয়মিত সময় ঠিক করুন। খাবারের মাঝখানে বারবার নাশতা দিলে মূল খাবারের সময় ক্ষুধা কমে যেতে পারে।

তৃতীয়ত অল্প পরিমাণ খাবার দিতে হবে। প্লেটে একসঙ্গে বেশি খাবার না দিয়ে অল্প করে দিন। প্রয়োজন হলে পরে আরও দেওয়া যাবে। শিশুকে জোর না করে নিজের মতো খাওয়ার সুযোগ দিন।

চতুর্থত, খাবারের সময় স্ক্রিন বন্ধ রাখতে হবে। স্ক্রিন বন্ধ রাখা। টিভি, মোবাইল বা অন্য কোনো স্ক্রিন দেখিয়ে খাওয়ানোর অভ্যাস না করাই ভালো। পরিবারের সবাই মিলে খাবার টেবিলে বসে খাওয়ার অভ্যাস করা উচিত।

এছাড়া নিয়মিত খেলাধুলা ও শারীরিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ দিলে শিশুর স্বাভাবিক ক্ষুধা তৈরি হতে পারে।
খেতে না চাওয়ার পেছনে থাকতে পারে শারীরিক সমস্যাও

ডা. ফেরদৌসী হাসনাত বলেন, বাংলাদেশের শিশুদের খাবারের প্রতি অনীহার পেছনে কৃমির সংক্রমণ, অ্যানিমিয়া বা রক্তস্বল্পতা, ঘন ঘন পেটের সংক্রমণ, টাইফয়েড বা অন্যান্য জ্বরের মতো শারীরিক সমস্যাও থাকতে পারে। এর পাশাপাশি অতিরিক্ত স্ন্যাকস, খাবারের একঘেয়েমি ও স্ক্রিনে অতিরিক্ত সময় কাটানোর কারণেও শিশু খেতে চাইতে পারে।

তিনি আরও জানান, শিশুর কৃমিনাশক, আয়রন বা জিংকের প্রয়োজন আছে কি না, তা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ঠিক করা উচিত। জোর করে বা ভয় দেখিয়ে খাওয়ানোর বদলে শিশুর পছন্দের স্বাস্থ্যকর খাবার দিতে হবে এবং ধীরে ধীরে নিজে হাতে খাওয়ার অভ্যাস তৈরি করতে হবে।

চিপস, চকলেট, জুস ও বাইরের খাবার কমিয়ে নির্দিষ্ট সময়ে ঘরের পুষ্টিকর খাবার দেওয়ার পরামর্শও দেন তিনি।

কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?

শিশু প্রতিদিন সমান পরিমাণ খাবার খাবে না—এটি স্বাভাবিক। তবে খেতে না চাওয়ার সঙ্গে অন্য কোনো সমস্যা দেখা দিলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।

ডা. ফেরদৌসী হাসনাত বলেন, শিশুর ওজন ক্রমশ কমে গেলে, অস্বাভাবিকভাবে দুর্বল বা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়লে, চোখ-মুখ ফ্যাকাশে দেখালে, খাবার গিলতে সমস্যা হলে কিংবা বারবার বমি করলে শিশুবিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

কারণ, অনেক সময় রক্তস্বল্পতা, ভিটামিনের ঘাটতি বা অন্য কোনো শারীরিক সমস্যার কারণেও শিশুর ক্ষুধা কমে যেতে পারে।
শিশু একবেলা কম খেলেই ধরে নেওয়ার কারণ নেই যে সে অপুষ্টিতে ভুগছে। তার বয়স, শারীরিক বৃদ্ধি, সামগ্রিক খাবারের ধরন ও স্বাস্থ্যের দিকে একসঙ্গে নজর দিতে হবে।

তিনি পরামর্শ দেন, খাবার নিয়ে শিশুর ওপর চাপ না দিয়ে নিয়মিত সময়ে বৈচিত্র্যপূর্ণ ও পুষ্টিকর খাবার দিন, অতিরিক্ত নাশতা ও স্ক্রিনের ব্যবহার কমান এবং তাকে নিজের মতো করে খাওয়ার সুযোগ দিন। আর দীর্ঘদিন খাবারের প্রতি অনীহা থাকলে বা শারীরিক কোনো লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।