খাল সাঁতরে স্কুলে, ভিজে যায় বই-খাতা-ইউনিফর্ম
বাড়ি থেকে স্কুলে যেতে প্রতিদিন পাঁচটি খাল সাঁতরাতে হয় দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. জহিরুল ইসলামকে। তার সঙ্গে আরও ৭-৮ জন শিশু খালে নামে। বই-খাতা ভিজে যায়, শরীরও থাকে ভেজা। বৃষ্টি বেশি হলে দুর্ভোগ আরও বাড়ে।
চরকারফারমার একেবারে দক্ষিণ প্রান্তে, ম্যানগ্রোভ বনের পাশে জহিরুলদের বাড়ি। স্কুলে যাওয়ার অন্য কোনো পথ নেই। তাই শীত, বর্ষা কিংবা বসন্ত, বারো মাসই খাল সাঁতরে স্কুলে যেতে হয় তাকে ও তার সহপাঠীদের।
শুধু জহিরুল নয়, পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন চরকারফারমা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থীরই প্রতিদিনের বাস্তবতা এটি। স্কুলে যাতায়াতের জন্য নেই কোনো নৌযান, সড়ক কিংবা বিকল্প ব্যবস্থা। ফলে ধীরে ধীরে অনেক শিশুই স্কুলে আসার আগ্রহ হারাচ্ছে।
মঙ্গলবার বিদ্যালয়টিতে গিয়ে দেখা যায়, ৫১ জন শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষক আছেন মাত্র তিনজন। তবে শিক্ষার্থীদের অনেকে নিয়মিত স্কুলে আসে না।
প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইয়াসিন জানায়, বৃষ্টি ও খালের পানিতে শরীর প্রায়ই ভেজা থাকে। এতে অসুস্থ হয়ে পড়লে কয়েক দিন স্কুলে যাওয়া হয় না।
সে আরও বলে, আমাদের একটা নৌকা আছে। কিন্তু ওই নৌকা দিয়ে নদীতে মাছ ধরতে যায়। তাই খাল সাঁতরেই স্কুলে যেতে হয়।
চরকারফারমায় প্রায় ৮০টি জেলে ও কৃষক পরিবার বসবাস করে। এসব পরিবারের শিশুদের পড়াশোনার সুযোগ করে দিতে ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় চরকারফারমা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বর্তমানে বিদ্যালয়ে ২৬ জন ছাত্র ও ২৫ জন ছাত্রী রয়েছে। তবে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার এক যুগ পরও শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের সমস্যা কাটেনি।
চরকারফারমার দক্ষিণে ম্যানগ্রোভ বন, এরপরই বঙ্গোপসাগর। পশ্চিমে রাবনাবাদ নদী, পূর্বে তেঁতুলিয়া নদী এবং উত্তরে আগুনমুখা মোহনা। চারদিকের নদী-মোহনায় বিচ্ছিন্ন এই চরে নেই কোনো সড়ক যোগাযোগ।
গলাচিপা শহর থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দক্ষিণে বোয়ালিয়া স্লুইসগেটে যেতে হয়। সেখান থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার হেঁটে আগুনমুখার তীরে খেয়াঘাট। কারফারমা দ্বীপে যাওয়ার একমাত্র মাধ্যম এই খেয়া।
শিক্ষক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা খেয়াপারের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। উত্তাল আগুনমুখা পেরিয়ে কারফারমা ঘাটে পৌঁছানোর পরও শেষ হয় না দুর্ভোগ। এরপর বিদ্যালয়ে যেতে অন্তত পাঁচটি খাল পার হতে হয়।
বর্ষায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়ে। দ্বীপটিতে কোনো বেড়িবাঁধ না থাকায় বছরের বড় একটি সময় জোয়ারের পানিতে ডুবে থাকে স্কুল মাঠ ও আশপাশের রাস্তাঘাট। ফলে স্বাভাবিক চলাচলও ব্যাহত হয়।
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. নেছার উদ্দিন বলেন, রাস্তাঘাট না থাকায় আমাদের অনেক দুর্ভোগ পোহাতে হয়। আমরা খেয়া বা স্থানীয় জেলেদের নৌকায় যাতায়াত করতে পারলেও শিক্ষার্থীদের খাল সাঁতরে আসতে হয়। রাস্তাঘাট হলে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়বে।
বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি শাহিদা বেগম বলেন, চরটিতে প্রায় ৮০টি পরিবার বসবাস করে। তিনি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য জায়গা দিয়েছেন। কিন্তু নিজেদের উদ্যোগে রাস্তা করার সামর্থ্য তাদের নেই। তিনি বলেন, স্কুলে যাতায়াতের জন্য হলেও কিছু রাস্তাঘাট করা দরকার।
সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. জাহাঙ্গীর হোসেন টুটু বলেন, স্কুলে যাওয়ার রাস্তা নেই, এ কথা সত্য। আপাতত কোনো বরাদ্দ নেই। বরাদ্দ পেলে অবশ্যই রাস্তা নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. গোলাম সগীর বলেন, রাস্তা না থাকার কারণে স্কুলের শিক্ষার্থী কমে গেছে। বিষয়টা দুঃখজনক। স্কুলে যাওয়ার রাস্তা না থাকার বিষয়টি ইউএনও মহোদয়কে জানিয়ে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবুজর মো. ইজাজুল হক বলেন, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে। জায়গাটি পরিদর্শনের পর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।