পরিশ্রম না করলেও ঘুম পায় কেন?
ঘুমের সঙ্গে পরিশ্রমের একটি সম্পর্ক আছে। তবে পরিশ্রম না করলেও ঘুম পেতে পারে।
এই বিষয়ে কথা বলেছেন বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. সোহেল মাহমুদ আরাফাত।
পরিশ্রম না করলেও ঘুম পায় কেন
অধ্যাপক সোহেল মাহমুদ আরাফাত বলেন, ঘুম শুধুমাত্র শারীরিক পরিশ্রমের ওপর নির্ভর করে না। বরং আরও অনেক কারণ এর পেছনে থাকতে পারে।
দীর্ঘ সময় একই ধরনের কাজ বা একঘেয়ে কাজ করা, শারীরিক নড়াচড়া কম হওয়া, দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা, রাতের শিফটে কাজ করার কারণে দিনের বেলায় ঘুম পেতে পারে।
শরীরে বিভিন্ন হরমোনের তারতম্যের কারণে ঘুম পেতে পারে। বিশেষ করে থাইরয়েড হরমোনের পরিমাণ কমে গেলে, যাকে হাইপোথাইরয়েডিজম বলা হয়, তখন শরীরের বিপাকক্রিয়া ধীর হয়ে যায়। ফলে শরীরে ক্লান্তি, অবসাদ ও অতিরিক্ত ঘুমের প্রবণতা দেখা দিতে পারে।
ডায়াবেটিসের কারণে ঘুম পেতে পারে। রক্তে শর্করার মাত্রা অনেক বেড়ে গেলে বা খুব কমে গেলে—উভয় অবস্থাতেই ক্লান্তি, দুর্বলতা এবং ঘুম ঘুম বা তন্দ্রা অনুভূত হতে পারে।
কিডনি জটিলতা, কিডনি ফেইলিউর, লিভার ফেইলিউর বা লিভার সিরোসিসের কারণে শরীরে বর্জ্য পদার্থ জমে যেতে পারে। এসব বর্জ্য পদার্থ মস্তিষ্কের কার্যকারিতার ওপর প্রভাব ফেলার কারণে ঘুম ঘুম ভাব দেখা দিতে পারে।
ডায়রিয়া, বমির কারণে শরীর থেকে অতিরিক্ত পানি ও লবণ বের হয়ে যায়। এর ফলে দুর্বলতা ও ঘুম ভাব হতে পারে।
শরীরে পানিশূন্যতা বা পানির পরিমাণ কমে গেলে রক্তসঞ্চালন ও স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় কার্যক্রম ব্যাহত হয়, ফলে ক্লান্তি, মাথা ঝিমঝিম এবং ঘুম ঘুম ভাব দেখা দিতে পারে।
রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ কমে গেলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে পর্যাপ্ত অক্সিজেন পৌঁছাতে পারে না। ফলে রক্তশূন্যতার (অ্যানিমিয়া) কারণে ক্লান্তি, দুর্বলতা ও ঘুম পেতে পারে।
ভাইরাল সংক্রমণের সময় এবং অনেক ক্ষেত্রে ভাইরাল সংক্রমণ থেকে সুস্থ হয়ে যাওয়ার পরও কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত ঘুম ঘুম ভাব থাকতে পারে।
স্লিপ অ্যাপনিয়া সিনড্রোমে ঘুমের সময় বারবার শ্বাসপ্রশ্বাসে বাধা সৃষ্টি হয়, ফলে রাতে ঘুম ভালো হয় না। স্লিপ অ্যাপনিয়াসহ বিভিন্ন কারণে ঘুমে ব্যাঘাত ঘটলে, পর্যাপ্ত বা ভালো মানের ঘুম না হওয়ার কারণে দিনে ঘুম পেতে পারে।
ওবেসিটি বা অতিরিক্ত ওজনের কারণে তন্দ্রা দেখা দিতে পারে।
অতিরিক্ত মানসিক চাপ, বিষণ্ণতা বা উদ্বেগের কারণে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে এবং অতিরিক্ত ঘুম আসতে পারে।
ঠান্ডা, অ্যালার্জির ওষুধ, কিছু ব্যথানাশক, উদ্বেগ বা বিষণ্ণতার ওষুধসহ কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে ঘুম আসতে পারে।
ঘুম ঘুম ভাবের সঙ্গে আরও কিছু উপসর্গ থাকতে পারে, যেমন: সবসময় ক্লান্তি ও অবসাদ, মাথাব্যথা, মাথা ঝিমঝিম করা, মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়া, বিরক্তি লাগা, কর্মক্ষমতা, স্মরণশক্তি ও মনোযোগ কমে যেতে পারে।
করণীয়
পরিশ্রম না করেও ঘুম ঘুম ভাব দৈনন্দিন জীবনে মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। ঘুম ঘুম ভাব থাকার কারণে মনোযোগ ও কর্মদক্ষতা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কমে যায়। যারা ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় নিয়োজিত, যেমন: চালক, ভারী যন্ত্রপাতির কাজ করেন যারা, নিরাপত্তাকর্মী—তাদের জন্য ঘুম ঘুম ভাব অত্যন্ত বিপজ্জনক হতে পারে। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
পরিশ্রম না করেও যদি ঘুম পায় বা দীর্ঘদিন ধরে ঘুম ঘুম ভাব থাকে তাহলে অবহেলা করা উচিত নয়। সাধারণ কারণ থেকে শুরু করে গুরুতর শারীরিক বা মানসিক যেকোনো কারণে এটি হতে পারে। সঠিক কারণ নির্ণয় করে ঘুমের সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
অধ্যাপক সোহেল মাহমুদ আরাফাত বলেন, মানসিক চাপ, উদ্বেগ, বিষণ্ণতা, ভাইরাল জ্বর বা কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে ঘুম পাওয়ার সমস্যা সাধারণত কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ভালো হয়ে যায়। তবে যদি ২ থেকে ৪ সপ্তাহের বেশি সময় ধরে ঘুম ঘুম ভাব থাকে, কর্মক্ষমতা কমে যায়, দিনের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয় অথবা অন্য কোনো শারীরিক লক্ষণ দেখা দেয়, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। চিকিৎসক প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে ঘুম ঘুম ভাবের পেছনের কারণ বা রোগ নির্ণয় করে সে অনুযায়ী চিকিৎসা দেবেন।
এছাড়া কিছু নিয়ম মেনে চলতে হবে:
১. প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানো এবং নির্দিষ্ট সময় ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস করতে হবে। একেক দিন একেক সময়ে ঘুমানোর অভ্যাস ত্যাগ করতে হবে। পর্যাপ্ত সময় ঘুমাতে হবে।
২. স্ক্রিন টাইম কমাতে হবে, দীর্ঘক্ষণ একটানা বসে থাকা যাবে না।
৩. প্রতিদিন হাঁটাহাঁটি ও ব্যায়াম করতে হবে, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।
৪. নিয়মিত পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে। পুষ্টিকর ও সুষম খাবার খেতে হবে।
৫. ডায়াবেটিস, থাইরয়েড, কিডনি, লিভারের রোগ, স্লিপ অ্যাপনিয়া থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চলতে হবে। ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে ঘুম পেলে প্রয়োজনে চিকিৎসককে অবহিত করতে হবে।


