ঘুমের সমস্যা কেন হয়? সমাধানে যা করতে পারেন

স্মৃতি মন্ডল
স্মৃতি মন্ডল

নাগরিক জীবনের ব্যস্ততায় ঘুমের সমস্যা ক্রমশ ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। কম ঘুম, একেবারেই ঘুম না হওয়ার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে কমবেশি সবকিছুতেই।

ঘুমের সমস্যা ও সমাধানে করণীয় সম্পর্কে জানিয়েছেন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের ক্লিনিক্যাল নিউরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. এম এস জহিরুল হক চৌধুরী।

ঘুমের সমস্যা কেন হয়

অধ্যাপক ডা. এম এস জহিরুল হক চৌধুরী বলেন, ঘুম না হওয়া বা ঘুমের সমস্যা (অনিদ্রা) সাধারণত একটি মাত্র কারণে হয় না, বরং শারীরিক, মানসিক ও জীবনযাপনের নানা কারণ একসঙ্গে কাজ করে।

১. মানসিক কারণ (সবচেয়ে সাধারণ)

অতিরিক্ত চিন্তা বা দুশ্চিন্তা, স্ট্রেস (অফিস, পরিবার, সম্পর্ক), উদ্বেগ, ডিপ্রেশন অবস্থায় মস্তিষ্ক ‘অ্যাক্টিভ’ থাকে, ফলে ঘুম আসতে চায় না।

২. জীবনযাপনের অভ্যাস

রাতে দেরি করে মোবাইল বা স্ক্রিন ব্যবহার, অনিয়মিত ঘুমের সময়, রাতে বেশি কফি বা চা পান, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব—এগুলো শরীরের স্বাভাবিক ঘুমের চক্র নষ্ট করে।

৩. খাদ্য ও পানীয়

ক্যাফেইন (চা, কফি, এনার্জি ড্রিংক), ভারী বা দেরিতে রাতের খাবার খাওয়া, অতিরিক্ত মশলাযুক্ত খাবার ঘুমের আগে শরীরকে উত্তেজিত রাখে।

৪. শারীরিক অসুস্থতা

ব্যথা (মাথা, পিঠ, জয়েন্ট), অ্যাসিডিটি বা গ্যাস্ট্রিক, শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, অন্তঃসত্ত্বাকালীন, হরমোনের সমস্যা (থাইরয়েড) ইত্যাদির কারণে শরীর অস্বস্তিতে থাকলে ঘুম ভেঙে যায় বা আসে না।

৫. ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

কিছু ওষুধ ঘুমে বাধা দেয়, যেমন: স্টেরয়েড, প্রেসার বা অ্যাজমার ওষুধ, অ্যান্টিডিপ্রেসেন্টের কিছু ধরন।

৬. পরিবেশগত কারণ

বেশি আলো বা শব্দ, অতিরিক্ত গরম বা ঠান্ডা, অস্বস্তিকর বিছানা গভীর ঘুমে বাধা দেয়।

৭. অনিয়মিত রুটিন

কখনো রাত জাগা, কখনো তাড়াতাড়ি ঘুমানো, দিনের বেলা বেশি ঘুমের কারণে শরীরের অভ্যন্তরীণ ঘড়ি বিভ্রান্ত হয়ে যায়।

৮. বিশেষ ঘুমের রোগ

ইনসমনিয়া, স্লিপ অ্যাপনিয়া (ঘুমের মধ্যে শ্বাস বন্ধ হওয়া), রেস্টলেস লেগ সিনড্রোম থাকলে ঘুমের সমস্যা হয়। এসব ক্ষেত্রে চিকিৎসা প্রয়োজন হয়।

৯. বয়স্ক ব্যক্তি (৬০+)

বয়স বাড়লে ঘুম হালকা হয়ে যায়, রাতে বারবার ঘুম ভাঙে। তাই বয়স্করা সহজেই অনিদ্রায় ভোগেন।

ঘুমের সমস্যায় ক্ষতিকর দিক

  • ঘুমের সমস্যা (অনিদ্রা বা কম ঘুম) শুধু ক্লান্তি তৈরি করে না, এটি ধীরে ধীরে শরীরের প্রায় সব সিস্টেমের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, যা স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি—দুইভাবেই দেখা যায়।
  • ঘুমের সময় মস্তিষ্ক তথ্য সংরক্ষণ ও প্রসেস করে। ঘুম না হলে স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়, মনোযোগ কমে যায়, শেখার ক্ষমতা হ্রাস পায়, সিদ্ধান্ত নেওয়ায় ভুল হয়। দীর্ঘমেয়াদে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা কমে যেতে পারে।
  • মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি হয়, রাগ, বিরক্তি, উদ্বেগ, হতাশা বাড়ে, আত্মবিশ্বাস কমে যায়। অনেক ক্ষেত্রে মানসিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়।
  • ঘুমের অভাবে রক্তচাপ বেড়ে যায়, হার্টের ওপর চাপ পড়ে, হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে।
  • রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে, সহজেই ঠান্ডা-জ্বর বা সংক্রমণ হয়, অসুখ সারতে বেশি সময় লাগে।
  • ঘুম কম হলে হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয়, ক্ষুধা বেড়ে যায়, অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা হয়, ওজন বাড়ে, ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স তৈরি হয়ে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ে।
  • চোখ লাল ও ক্লান্ত লাগে, চোখের নিচে কালো দাগ পড়ে, ত্বক নিষ্প্রাণ হয়ে যায়, দ্রুত বার্ধক্যের ছাপ পড়ে।
  • ঘুম না হলে শরীরে শক্তি কমে যায়, কাজের গতি ও দক্ষতা কমে যায়, সহজেই ক্লান্ত লাগে, রিফ্লেক্স কমে যায়, মনোযোগ কম থাকে। ফলে গাড়ি চালানো বা যেকোনো কাজে দুর্ঘটনার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
  • হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয়, গ্রোথ হরমোন কমে যায়, স্ট্রেস হরমোন (কর্টিসল) বেড়ে যায়। এতে শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়।
  • দীর্ঘদিন ঘুমের সমস্যা থাকলে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, স্থূলতা, মানসিক রোগ এমনকি আয়ু কমে যেতে পারে।

ঘুমের সমস্যা সমাধানে যা করতে পারেন

অধ্যাপক ডা. এম এস জহিরুল হক চৌধুরী বলেন, ঘুমের সমস্যা (অনিদ্রা) দূর করার জন্য শুধু ওষুধ নয়, জীবনযাপন, অভ্যাস ও মানসিক নিয়ন্ত্রণ সবকিছু মিলিয়ে কাজ করতে হয়। সঠিক নিয়ম মেনে চললে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক ঘুম ফিরে আসে।

  • নির্দিষ্ট ঘুমের রুটিন তৈরি করতে হবে, প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যান (১০-১১টার মধ্যে), একই সময়ে ঘুম থেকে উঠুন (ভোর ৫-৬টা)। এতে শরীরের বায়োলজিক্যাল ক্লক ঠিক থাকে এবং ঘুম সহজে আসে।
  • ঘুমানোর আগে স্ক্রিন ব্যবহার কমাতে হবে। মোবাইল, টিভি, ল্যাপটপ ঘুমানোর অন্তত ১ ঘণ্টা আগে বন্ধ করুন। স্ক্রিনের ব্লু-লাইট মেলাটোনিন কমিয়ে দেয়, ফলে ঘুমাতে দেরি হয়।
  • ক্যাফেইন ও নিকোটিন এড়িয়ে চলতে হবে। বিকেলের পর চা বা কফি না খাওয়া ভালো, ধূমপান বন্ধ করতে হবে। এগুলো স্নায়ুকে উত্তেজিত রাখে, ঘুমে বাধা দেয়।
  • হালকা ও সময়মতো রাতের খাবার খেতে হবে। ঘুমানোর ২ থেকে ৩ ঘণ্টা আগে খাবার শেষ করুন। অতিরিক্ত মশলাযুক্ত বা ভারী খাবার এড়িয়ে চলতে হবে, এতে গ্যাস্ট্রিক বা অস্বস্তি কম হবে, ঘুম ভালো হবে।
  • ঘুমের পরিবেশ ঠিক করতে হবে, ঘর অন্ধকার ও শান্ত রাখুন, আরামদায়ক বিছানা ব্যবহার করতে হবে, ঘর খুব বেশি গরম বা ঠান্ডা রাখা যাবে না। ভালো পরিবেশ গভীর ঘুমে সাহায্য করে।
  • মানসিক চাপ কমাতে হবে, মেডিটেশন, নামাজ বা প্রার্থনা, শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম করতে হবে। অতিরিক্ত চিন্তা করা যাবে না, মন শান্ত থাকলে ঘুম দ্রুত আসে।
  • নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে, প্রতিদিন ২০-৩০ মিনিট হাঁটা বা হালকা ব্যায়ামের অভ্যাস করতে হবে। শরীর ক্লান্ত হলে ঘুম ভালো হয়, তবে ঘুমানোর ঠিক আগে ব্যায়াম করবেন না।
  • দিনের ঘুম সীমিত রাখতে হবে, দুপুরে ২০-৩০ মিনিটের বেশি ঘুমানো যাবে না। দিনে বেশি ঘুমালে রাতে ঘুম কমে যায়।
  • ঘুম না এলে বিছানায় শুয়ে জোর করে ঘুমানোর চেষ্টা করবেন না, উঠে হালকা বই পড়ুন বা শান্ত কিছু করুন। এতে মস্তিষ্ক চাপমুক্ত হয়, পরে ঘুম আসে।
  • ২ থেকে ৩ সপ্তাহ ধরে ঘুম না হয়, দিনে খুব ক্লান্ত লাগে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। নিজে নিজে ঘুমের ওষুধ খাওয়া উচিত নয়।
  • প্রাকৃতিক উপায় হিসেবে ঘুমানোর আগে হালকা গরম দুধ, কুসুম গরম পানিতে গোসল, হালকা সুরের গান শুনতে পারেন—এগুলো শরীরকে রিল্যাক্স করে।