ওজন কমাতে ঘুম কি গুরুত্বপূর্ণ
আমরা প্রতিদিন কী খাচ্ছি এবং কতটা শারীরিক পরিশ্রম করছি—এই দুটির ওপরই মূলত আমাদের শরীরের ওজন নির্ভর করে বলে আমরা ধরে নিই। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, ওজন ও সুস্বাস্থ্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে, যেটি আমরা প্রায়ই উপেক্ষা করি—সেটা হচ্ছে ঘুম।
স্লিপ ফাউন্ডেশনের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শরীর সবসময় ক্লান্তি প্রকাশ না করলেও খাবার হজম ও শক্তি উৎপাদনের প্রক্রিয়ায় নিজে থেকেই কিছু পরিবর্তন এনে ফেলে। স্বাভাবিক অবস্থায় আমাদের শরীর লেপটিন (যা পেট ভরে যাওয়ার সংকেত দেয়) এবং ঘ্রেলিন (যা ক্ষুধার সংকেত দেয়) হরমোনের মাধ্যমে ক্ষুধা ও শক্তির ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু ঘুমের ঘাটতি হলে এই ভারসাম্য নষ্ট হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, লেপটিনের মাত্রা কমে গেলে এবং ঘ্রেলিনের মাত্রা বেড়ে গেলে ক্ষুধা বাড়ে এবং বারবার কিছু না কিছু খেতে ইচ্ছে করে।
এই প্রক্রিয়াটি কেবল অতিরিক্ত খাবার খাওয়ার ইচ্ছার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ঘুমের ঘাটতি হলে মানুষ সাধারণত বেশি ক্যালোরি গ্রহণ করতে শুরু করে—বিশেষ করে শর্করা-জাতীয় খাবার এবং দিনের শেষভাগে হালকা নাশতা করার প্রবণতা বাড়ে। একইসঙ্গে রেস্টিং মেটাবলিক রেট (বিশ্রামরত অবস্থায় যে পরিমাণ ক্যালোরি খরচ হয়) এই অতিরিক্ত ক্যালোরির সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখতে পারে না। ফলে গ্রহণ করা খাবার শরীরের প্রয়োজনীয় কাজে শক্তি হিসেবে ব্যবহৃত না হয়ে ধীরে ধীরে ফ্যাট হিসেবে জমা হতে থাকে।
আপনি যদি নির্দিষ্ট ডায়েট মেনে খাবার খান এবং নিয়মিত শরীরচর্চা করার পরও লক্ষ্য করেন যে ওজন কমছে না, কিংবা জামাকাপড় এখনো আগের মতোই টাইট লাগছে, তাহলে এবার আপনার ঘুমের অভ্যাসের দিকে মনোযোগ দেওয়া জরুরি। প্রতিদিন সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুমকে অগ্রাধিকার দেওয়া কেবল বিশ্রামের জন্য নয়—বরং শরীরের মেটাবলিক সুস্থতা বজায় রাখার জন্য এটি একটি অত্যন্ত কার্যকর ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ।
আপনি ঠিক কত ঘণ্টা ঘুমাচ্ছেন, সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নয়। পর্যাপ্ত সময় ঘুমানোর পরও যদি ঘুমের মান ভালো না হয়, তাহলে অতিরিক্ত খাবার খাওয়ার প্রবণতা এবং অস্বাস্থ্যকর খাদ্য বেছে নেওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়—যা নারীদের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। ভালো ঘুম নিশ্চিত করতে কিছু বিষয় মেনে চলা জরুরি: প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া, ঘুমে দেরি বা ব্যাঘাত ঘটাতে পারে এমন বিষয়গুলো সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং সেগুলো কমানোর চেষ্টা করা; পাশাপাশি নাক ডাকা বা স্লিপ অ্যাপনিয়ার মতো সমস্যাগুলো যেন ভালো ঘুমের অন্তরায় না হয়, সেদিকে বিশেষ নজর দেওয়া।
তবে, শুধু ভালো ঘুমই কোনো জাদুকরি ওষুধ নয়। ধূমপান, উচ্চ চর্বিযুক্ত খাদ্যাভ্যাস কিংবা পর্যাপ্ত শারীরিক পরিশ্রমের অভাব—এই বিষয়গুলো ঘুমের ইতিবাচক প্রভাবকে অনেকটাই নিষ্ক্রিয় করে দিতে পারে। তবু সুস্বাস্থ্যের সামগ্রিক চিত্রে ঘুম এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, যা প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে, অথচ শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখতে এর ভূমিকা অপরিসীম।
তাই সবসময় মানসম্মত ঘুমের চেষ্টা করুন, যেন শরীর স্বাভাবিক ও সঠিকভাবে কাজ করতে পারে। অপর্যাপ্ত ঘুম আপনাকে শুধু ক্লান্তই করে না; এটি আপনার দেহের মেটাবোলিজমকে এমন এক সংকেত পাঠায়, যাতে খাবার থেকে পাওয়া শক্তি খরচ না করে তা জমিয়ে রাখার প্রবণতা তৈরি হয়।
অনুবাদ করেছেন শবনম জাবীন চৌধুরী


