বাইরে অমায়িক ঘরে রূঢ় মেজাজ—এমন আচরণের কারণ কী, বেরোবেন যেভাবে

শবনম জাবীন চৌধুরী

ভেবে দেখুন তো, আপনিও কি এমনটা করে থাকেন? ঘরের বাইরে সবার সঙ্গে খুব ভালো ব্যবহার করছেন, কিন্তু ঘরে ফিরলেই যেন রুদ্রমূর্তিতে আবির্ভূত হন? খুব দুঃখজনক হলেও আমাদের মধ্যে অনেকেই এমনটা করে থাকেন। বাইরের মানুষের সঙ্গে অমায়িক ব্যবহার করলেও ঘরে ফিরে পরিবারের মানুষগুলোর সঙ্গে বাজে আচরণ করেন।

এমনটা কি হওয়া উচিত? এমন আচরণের পেছনে কারণ কী? কিংবা এ ধরনের আচরণ শোধরানোর জন্য করণীয় কী, তা নিয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন মানসিক রোগবিশেষজ্ঞ ডা. মেখলা সরকার

এমনটা কি হওয়া উচিত?

কর্মক্ষেত্রে বা দৈনন্দিন জীবনে চলার পথে আমাদের বহু মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়। আমাদের কখনোই পরিবারের মানুষকে অবহেলা, উপেক্ষা বা অসম্মান করে সমাজের বাকি সব মানুষের কাছে সুন্দর আচরণের প্রতিমূর্তি হয়ে ওঠা উচিত নয়। খুব দুঃখজনক হলেও, আমরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এমনটাই করে থাকি।

ডা. সরকার বলেন, ‘যারা এমন ধরনের আচরণ করে থাকেন, দিনশেষে হয়তো তারা অনুতপ্ত হন না। এই ধরনের ব্যবহার তারা দিনের পর দিন করে চলেন, ফলে তাদের পরিবারের প্রতিটি মানুষ মানসিক ও আবেগগত দিক দিয়ে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করেন।’

এমন আচরণের পেছনে কারণ

বাইরের লোকের কাছে পজিটিভ ইমেজ ধরে রাখার চেষ্টা

কর্মক্ষেত্রে বস বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে কটু কথা শুনেও আমরা হাসিমুখে প্রতিক্রিয়া জানাই। অতিরিক্ত কাজের চাপ কাঁধে এসে পড়লেও দ্রুততা ও দক্ষতার সঙ্গে তা সম্পন্ন করার চেষ্টা করি। বন্ধু বা প্রতিবেশীর সঙ্গে হয়তো কোনো কিছু নিয়ে মনোমালিন্য হয়েছে, সেখানেও আমরা হেসে সম্পর্কের স্বাভাবিকতা বজায় রেখে চলে আসি। অথচ আমরাই দিনশেষে ঘরে ফিরে অকারণে এবং অযৌক্তিকভাবে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বাজে আচরণ করে থাকি।

প্রতিটি আচরণের সঙ্গেই মানসিক সম্পর্ক রয়েছে। বাইরের মানুষ আমাদের সম্পর্কে খুব বেশি কিন্তু জানে না; আমরা তাদের সামনে নিজেকে যেভাবে ও যতটুকু তুলে ধরি, তারা সেভাবেই আমাদের চিনে থাকে। তাই পজিটিভ ইমেজ ধরে রাখার একটা চাপ থেকেই আমরা তাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করি।

শুধু তাই নয়, আমরা সকলে খুব ভালো করেই জানি যে পরিবারের বাইরের মানুষগুলো আমাদের কোনো ভুল সহজে ক্ষমা করবে না এবং আমাদের মেজাজ সহ্য করবে না।

এই যেমন ধরুন, একজন মানুষ কর্মক্ষেত্রে বিরূপ প্রতিক্রিয়া জানান না। কারণ:

  • চাকরি হারানোর ভয় থাকে

  • অফিসে নিজের ইতিবাচক ভাবমূর্তি ধরে রাখার চেষ্টা থাকে

  • প্রমোশনের আশা থাকে

আবার বন্ধু বা প্রতিবেশীর সঙ্গে মনোমালিন্য হলেও সেখানে রূঢ় আচরণ করেন না। কারণ:

  • সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার তাগিদ থাকে

  • ভবিষ্যতে তাদের কাছ থেকে সাহায্য পাওয়ার আশা থাকে

পরিবারকে ‘ফর গ্রান্টেড’ হিসেবে বিবেচনা করা

আমরা যখন ভীষণ ব্যস্ততার মধ্যে থাকি বা মানসিক চাপে থাকি, তখন আমাদের প্রিয় পরিবারের মানুষগুলোর সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রেই খুব রূঢ়ভাবে কথা বলি, অবজ্ঞা করি এবং তারা কোনো কথা বললে তা ঠিকমতো শুনিও না কখনো কখনো। আমরা নিজেদের সমস্যা নিয়ে এত ব্যস্ত হয়ে যাই যে পরিবারের মানুষগুলোকে ভালোবাসতে ভুলে যাই।

বাড়ি এমন একটি জায়গা যেখানে মানুষ স্বস্তিতে নিজের প্রকৃত রূপে থাকে। পরিবারের মানুষগুলো একই ছাদের নিচে থাকতে থাকতে একে অন্যের দুর্বলতাগুলো সম্পর্কে জেনে যায় এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা মেনেও নেয়। ডা. মেখলা সরকার বলেন, ‘আমরা ধরেই নিই আমরা যাই করি না কেন, পরিবার আমার সবকিছুই মেনে নেবে এবং স্বাভাবিকভাবেই আচরণ করবে। ওরা তো আছেই সবসময় আমার পাশে! আমরা পরিবারের ভালোবাসা আর ধৈর্যকে “ফর গ্রান্টেড” হিসেবে ধরে নিই। আর এমন ধারণার কারণেই হয়তো অনেক সময় আমরা ঘরে ফিরেই কোনো কারণ ছাড়াই অহেতুক পরিবারের মানুষগুলোর ওপর সারাদিনের যত ক্ষোভ আর জমিয়ে রাখা হতাশা বাজে আচরণের মাধ্যমে প্রকাশ করে থাকি।’

ছোটবেলার ট্রমা

ডা. মেখলা সরকারের মতে, ছোটবেলা থেকেই যাদের নিম্নোক্ত বিষয়গুলোর অভিজ্ঞতা রয়েছে, পরিণত বয়সে তাদের অনেকের মাঝেই এ ধরনের আচরণ দেখা যায়:

  • হাইপার ভিজিল্যান্স

  • সবাইকে সবসময় খুশি রাখার প্রচেষ্টা বা প্রবণতা

  • একাকীত্ব

  • ব্যর্থ হওয়া বা সঙ্গীহীন হয়ে পড়ার ভয়

  • নিজের অনুভূতিগুলোকে প্রাধান্য না দেওয়া বা দমিয়ে রাখা

এ ধরনের আচরণ থেকে বেরিয়ে আসতে করণীয়

ঘর হচ্ছে একটি ভালোবাসা ও পরম মমতার জায়গা। তাই এখানে আপনার আচরণের সবচেয়ে বাজে দিকটির প্রকাশ কোনোভাবেই কাম্য নয়। আপনারও যদি ঘরের বাইরে আচরণ ‘সরি’ বা ‘নো প্রবলেম’ ধরনের হয়ে থাকে আর ঘরে প্রবেশ করলেই বন্ধ দরজার ওপাশে বিনয়হীন ও অসম্মানজনক আচরণ হয়ে থাকে, তাহলে আজই আপনার সচেতন হওয়া উচিত। নিচের ইতিবাচক অভ্যাসগুলোর অনুশীলন আপনাকে এমন ব্যবহার থেকে পরিত্রাণের সুযোগ করে দেবে:

কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন

একান্তে একবার ভাবুন তো, আপনার পরিবারের এই ভালোবাসার মানুষগুলো ছাড়া আপনার জীবনটা কেমন হতো? এভাবে ভাবলে তা আপনাকে আপনজনদের মূল্যায়ন করতে সাহায্য করবে এবং আপনার জীবনে তাদের অবদানকে কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্বীকার করতে শেখাবে।

পরিবারের প্রতি স্নেহশীল আচরণ

খেয়াল করলে দেখবেন যে, আমাদের সামনে বাইরের মানুষ থাকলে আমরা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ওই সময়টুকুর জন্য অপেক্ষাকৃত ভালো ব্যবহার করি। তারা চলে গেলেই আবার আগের রূপে ফিরে আসি। এমনটা করা থেকে বিরত থাকতে হবে। এর জন্য বেশি বেশি করে পরিবারের মানুষদের সময় দিতে হবে এবং তাদের প্রতি যত্নশীল হতে হবে।

সবার থেকে দূরে নিজেকে আলাদা করে কিছু সময় দেওয়া

অনেক সময় সম্পর্কের টানাপোড়েনে কিছুটা তিক্ততা চলে আসে। তাই সবার কাছ থেকে কিছুটা সময়ের জন্য বিরতি নিন; দূরে কোথাও আপনার পছন্দের কোনো জায়গা থেকে ঘুরে আসতে পারেন। এতে করে আপনার মন শান্ত হবে, মানসিক চাপ কমবে, দৃষ্টিভঙ্গি বদলাবে এবং ফিরে এসে নতুনভাবে সবকিছু শুরু করতে সাহায্য করবে।