ওষুধ ছাড়াই স্ট্রেস কমাতে পারেন যেভাবে
প্রতিদিনের কর্মব্যস্ত জীবনের দৌড়ঝাঁপে নানা দায়িত্ব ও কর্তব্যের ভিড়ে স্ট্রেস যেন অনেকের জীবনেই নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে। এই মানসিক চাপ আমাদের শরীর ও মনের ওপর নানা নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এ চাপ নিয়ন্ত্রণে অনেককেই চিকিৎসকের পরামর্শে নিয়মিত ওষুধ সেবন করতে হয়।
তবে ওষুধের কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকতেই পারে। অন্যদিকে, স্ট্রেস সবসময় উদ্বেগ বা ডিপ্রেশনের মতো কোনো মানসিক অসুস্থতা নয়। স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণে সবসময় ওষুধ সেবনের প্রয়োজন পড়ে না। জীবনযাত্রার কিছু পরিবর্তন আমাদের মানসিক চাপ মোকাবিলায় সাহায্য করতে পারে। তাই ওষুধ ছাড়াও কীভাবে মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করা যায়, সে বিষয়ে জানা জরুরি।
বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. সীফাত জাহান শশী।
প্রথমেই জেনে নেওয়া যাক, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের ওষুধ সেবন করলে কী ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে। স্ট্রেস কমানোর জন্য ব্যবহৃত ওষুধগুলোর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ওষুধভেদে ভিন্ন হতে পারে। যেমন:
ঘুম ঘুম ভাব বা অতিরিক্ত তন্দ্রা।
মাথা ঘোরা।
ক্লান্তি বা দুর্বলতা অনুভব করা।
মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তি সাময়িকভাবে কমে যাওয়া।
মুখ শুকিয়ে যাওয়া।
বমি বমি ভাব বা হজমের সমস্যা।
মাথাব্যথা।
ওজন বৃদ্ধি বা হ্রাস।
যৌন আগ্রহ বা কর্মক্ষমতায় পরিবর্তন।
কিছু ওষুধ, বিশেষ করে বেঞ্জোডায়াজেপিন-জাতীয় ওষুধ, দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে ডিপেন্ডেন্সি বা আসক্তির ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
ওষুধ ছাড়া মানসিক চাপ কমানোর উপায়
শারীরিক ব্যায়াম
শারীরিক ব্যায়াম, যেমন: সাইকেল চালানো বা হাঁটাহাঁটি, মানসিক চাপ সম্পূর্ণ দূর না করলেও তা অনেকাংশে কমাতে সাহায্য করে। যে অনুভূতির কারণে মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়, ব্যায়াম সেই চাপের তীব্রতা কিছুটা হ্রাস করে। ফলে ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করে চাপ সৃষ্টিকারী সমস্যাগুলোর সমাধানের জন্য কার্যকর পরিকল্পনা করা সম্ভব হয়।
পরিমিত ও স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস
আল্ট্রা-প্রসেসড খাবার ও চিনি-সমৃদ্ধ খাবার বেশি খেলে মানসিক চাপ বৃদ্ধি পেতে পারে। অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের কারণে শরীরে প্রয়োজনীয় পুষ্টির ঘাটতি দেখা দেয়। ম্যাগনেসিয়াম ও ভিটামিন বি-এর মতো কিছু গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান আমাদের মানসিক চাপ ও মেজাজ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। তাই শাকসবজি, ফলমূল, মাছ, বাদামসহ পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ খাবার নিয়মিত খাদ্যতালিকায় রাখা উচিত।
স্ক্রিন টাইম কমানো
স্ক্রিন টাইম কমালে আমাদের মানসিক চাপের মাত্রা কমতে পারে। স্মার্টফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার মানসিক চাপ বৃদ্ধি করে এবং ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়। আর পর্যাপ্ত ঘুম না হলে স্ট্রেস আরও বেড়ে যেতে পারে।
নিজের যত্ন
আমাদের অনেকেরই দিনের দীর্ঘ একটি সময় কর্মব্যস্ততার মধ্যেই কেটে যায়। ফলে আমরা যে কাজগুলো করতে ভালোবাসি, সেগুলোর জন্য আলাদা করে সময় বের করা হয়ে ওঠে না। তাই প্রতি সপ্তাহে নিয়ম করে কিছুটা সময় নিজের জন্য বরাদ্দ রাখা উচিত, যাকে আমরা ‘মি টাইম’ বলি। এই সময়ে নিজের পছন্দের কাজগুলো করা যেতে পারে, যা মনকে প্রফুল্ল ও সতেজ রাখবে।
চ্যালেঞ্জ গ্রহণ
কর্মজীবন বা ব্যক্তিজীবনে নিজের জন্য কিছু লক্ষ্য নির্ধারণ করতে পারেন এবং নতুন কিছু শেখার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে পারেন। যেমন: নতুন কোনো ভাষা বা নতুন কোনো খেলা বা রান্না শেখা যেতে পারে। এসব উদ্যোগ আপনার আত্মবিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করবে। পাশাপাশি, নতুন কিছু শেখার কাজে মনোযোগী থাকলে মানসিক চাপের বিষয়গুলো থেকে মন কিছুটা সরে আসে, যা স্ট্রেস মোকাবিলায় অনেকটা সাহায্য করে।
অস্বাস্থ্যকর অভ্যাস পরিত্যাগ
আপনার যদি অ্যালকোহল পান, অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ বা ধূমপানের অভ্যাস থাকে, তবে তা পরিত্যাগ করা উচিত। এসব অভ্যাস হয়তো সাময়িকভাবে ভালো লাগার অনুভূতি দিতে পারে। কিন্তু এগুলো মানসিক চাপের প্রকৃত সমাধান নয়। বরং দীর্ঘমেয়াদে এগুলো শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে এবং নতুন নানা সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে।
সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া
কখনো কি ভেবে দেখেছেন, আপনি যখন কারো উপকার করেন হোক না খুব ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা, মনে এক ধরনের নির্মল আনন্দ অনুভব করে থাকেন। অন্যের পাশে দাঁড়ানো বা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলে তা আপনাকে দৃঢ়চেতা করে তোলে। হতে পারে আপনি কাউকে রাস্তা পার হতে সাহায্য করলেন বা কাজের ফাঁকে সহকর্মীর জন্য এক কাপ চা বা কফি এনে দিলেন—খুব ছোট ছোট কাজগুলোও মনকে অনেক প্রশান্তি দেয়।
কাজের ক্ষেত্রে কৌশলী হওয়া
মিরাজ সাহেব আজ অফিসের শুরুতেই একবার তার ‘টু-ডু’ লিস্টটা দেখে নিলেন। তালিকাটি দেখেই একটি দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো—এত কাজ আজ! কোনটি ছেড়ে কোনটি করবেন, সেটিই যেন বুঝে উঠতে পারছেন না। চোখ বন্ধ করে গভীর একটি শ্বাস নিয়ে তিনি ঠিক করলেন, কোন কাজটি আগে করবেন আর কোনটি পরে করবেন।
কাজের ক্ষেত্রে অবশ্যই প্রায়োরিটি সেট করতে হবে। যেসব কাজ অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ, সেগুলো তালিকার শেষের দিকে রাখুন। এভাবে পরিকল্পিত ও কৌশলীভাবে কাজ করলে মানসিক চাপ অনেকটাই কমে যায়।
ইতিবাচক চিন্তা
আমাদের চিন্তাভাবনায় ইতিবাচকতা আনতে হবে। জীবনে যেসব বিষয় বা মানুষের জন্য আপনি কৃতজ্ঞ, সেগুলো নিয়ে দিনের শুরুতে বা শেষে ডায়েরিতে কয়েকটি কথা লিখতে পারেন। কৃতজ্ঞতার চর্চা এবং ইতিবাচক চিন্তা মনকে স্বস্তি দেয় এবং প্রফুল্ল রাখতে সাহায্য করে।
যা বদলানো সম্ভব নয়, তা মেনে নেওয়া
আমরা আমাদের জীবনের অনেক কিছুই নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। তবে এমন কিছু পরিস্থিতিও থাকে, যা আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে বা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তাই এমন পরিস্থিতিতে তা মেনে নেওয়া কিংবা বিকল্প উপায় খুঁজে বের করাই শ্রেয়।
ধরুন, আপনার অফিসে কর্মী ছাঁটাই চলছে। এ অবস্থায় আপনার চাকরি থাকবে কি না, তা নিয়ে আপনি অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। এমন পরিস্থিতিতে করণীয় কী? নতুন চাকরির সুযোগ খোঁজা হতে পারে একটি বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ। মানসিক চাপের কাছে হার না মেনে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করাই উত্তম।
স্ট্রেস কমানোর এসব কৌশল কোনো ওষুধের বিকল্প নয়। তবে একবার ভেবে দেখুন, এই অভ্যাসগুলো নিয়মিত চর্চার ফলে যদি আপনার মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে, তাহলে ‘ওষুধ সেবন’ পর্যন্ত যাওয়ার প্রয়োজনই পড়ে না।


