ইরান যুদ্ধ যেভাবে যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পের রাজনৈতিক এজেন্ডাকে চাপে ফেলেছে
ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ এবং তা ঘিরে বারবার হুমকি ও অবস্থান পরিবর্তনের কারণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক এজেন্ডা বড় ধরনের চাপে পড়েছে।
একদিকে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বেড়েছে, কংগ্রেসের রিপাবলিকান সদস্যদের এমন একটি যুদ্ধের অর্থায়ন ও পক্ষে অবস্থান নিতে হচ্ছে, যার অনুমোদনে তারা ভোট দেননি। অন্যদিকে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘনিয়ে ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে জরিপগুলোতে দেখা যাচ্ছে যে, এই যুদ্ধের প্রতি জনসমর্থন দ্রুত কমে যাচ্ছে।
আজ মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে আসে।
এতে বলা হয়, ইরান যুদ্ধের কারণে দেশের ভেতরে অন্তত তিনটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন ট্রাম্প। সেগুলো হলো, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, জনসমর্থন কমে যাওয়া ও রাজনৈতিক ঝুঁকি বেড়ে যাওয়া।
জ্বালানির দাম বৃদ্ধি
ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রেও।
যুক্তরাষ্ট্রের অটোমোবাইল সংগঠন আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের (এএএ) তথ্য মতে, সোমবার দেশটিতে প্রতি গ্যালন জ্বালানির গড় দাম দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ১০ ডলার, যা ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর সর্বোচ্চ।
ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত জ্বালানির দাম প্রায় ৩৭ শতাংশ বেড়েছে। এতে আগে থেকেই উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে চলমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
তবে ট্রাম্প দাবি করেছেন, সংঘাত সত্ত্বেও প্রতি ব্যারেল তেলের দাম প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম।
সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, তার নীতির কারণে শেভরন ও এক্সনের মতো প্রতিষ্ঠান রেকর্ড মুনাফা করেছে।
পোস্টে তেল কোম্পানিগুলোকে খুচরা পর্যায়ে তেলের দাম কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন ট্রাম্প।
জনসমর্থন কমছে
আধুনিক ইতিহাসে ট্রাম্পই একমাত্র মার্কিন প্রেসিডেন্ট, যিনি জনগণের সমর্থন ছাড়াই দেশকে যুদ্ধে নিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কানেকটিকাটের কুইনিপিয়াক বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বশেষ জরিপে দেখা গেছে, ৬০ শতাংশ ভোটার ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান সমর্থন করেন না। মে মাসের তুলনায় এই বিরোধিতা আরও বেড়েছে।
সিএনএনের এক জরিপে দেখা গেছে, ৭৪ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন, আর্থিক ব্যয় ও মার্কিন সেনা হতাহতের দিক থেকে এই যুদ্ধ সার্থক হয়নি।
তবে ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুদ্ধের কারণে জনগণের ভোগান্তি সাময়িক।
একইসঙ্গে ভিয়েতনাম যুদ্ধের মতো অতীতের সংঘাতের হতাহতের সঙ্গে তুলনা করে মার্কিন সেনাদের মৃত্যুর বিষয়টিকেও গুরুত্বহীন হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্বাচনী প্রচারে যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধের বাইরে রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। কিন্তু তিনি যে যুদ্ধ ‘চার থেকে পাঁচ সপ্তাহের’ মধ্যে শেষ হবে বলেছিলেন, তা অনেক দীর্ঘ হয়েছে। এতে এখন পর্যন্ত ১৮ জন মার্কিন সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন।
রাজনৈতিক ঝুঁকি
মধ্যবর্তী নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, রিপাবলিকান পার্টির ভেতর থেকেও যুদ্ধের দ্রুত শেষ করার দাবি জোরালো হচ্ছে।
গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে ইরানে হামলা চালানোর পর প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার মাইক জনসন বলেন, ‘এটা শেষ করতে হবে।’
লুইজিয়ানার রিপাবলিকান সিনেটর জন কেনেডি এনবিসির ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে বলেন, ‘প্রেসিডেন্টের আবার নতুন করে বোমা হামলা শুরু করা উচিত কি না, আমি জানি না। কারণ আমার কাছে সামরিক গোয়েন্দা তথ্য নেই। তবে এতে মানুষের কষ্ট বাড়বে, জ্বালানির দাম বাড়বে এবং মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে। প্রতিটি বিকল্পই ভয়াবহ।’
নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই যুদ্ধ শুরু করেছিলেন ট্রাম্প। সম্প্রতি যুদ্ধের জন্য অতিরিক্ত কয়েক বিলিয়ন ডলার বরাদ্দের প্রশ্নে বিষয়টি নতুন করে বিতর্কেরও জন্ম দিয়েছে।
ডেমোক্র্যাটরা ইতোমধ্যে আসন্ন নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধকে রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে ব্যবহার শুরু করেছে।