ডুমস্ক্রলিং সম্পর্কে জানেন? কীভাবে এটি থেকে মুক্তি পাবেন?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিরামহীন স্ক্রলিং বা ডুমস্ক্রলিংয়ের অভ্যাসে বাঁধা পড়ছেন প্রায় সব বয়সীরা। নীরব ঘাতক ডুমস্ক্রলিং ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়, নেতিবাচক প্রভাব ফেলে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যেও।
বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সাবেক পরিচালক, কথাসাহিত্যিক এবং মনোশিক্ষাবিদ অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল।
ডুমস্ক্রলিং কী
অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল বলেন, ডুমস্ক্রলিং হলো মোবাইল বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একের পর এক খবর, ভিডিও, পোস্ট বা রিল দেখতে থাকা—বিশেষ করে নেতিবাচক, উদ্বেগজনক বা উত্তেজনাপূর্ণ বিষয়গুলো বারবার দেখা। ‘আর মাত্র এক মিনিট’ দেখব ভেবে শুরু হলেও অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যায়।
মানুষ তখন তথ্য খোঁজে না, বরং তথ্যের স্রোতে ভেসে যায়। কোনো তথ্য মিস হয়ে যেতে পারে—এই ভয় থেকে বারবার একই পেজ রিফ্রেশ করে কিংবা পুশ নোটিফিকেশন চেক করতে থাকে।
ডুমস্ক্রলিংয়ের লক্ষণ
কিছু সাধারণ লক্ষণ হলো—রাতে ঘুমানোর আগে ‘আর একটু দেখি’ বলতে বলতে অনেক সময় পার করে ফেলা। মোবাইল সরিয়ে রাখার পরও মনের মধ্যে খবর বা ভিডিও ঘুরতে থাকা। সকালে ঘুম থেকে উঠেই ফোন চেক করার পর দিনের শুরুতেই মস্তিষ্ককে উত্তেজিত করে তোলা। কোনো নতুন নোটিফিকেশন না এলেও বারবার ফোন দেখতে দেখতে নিজের অজান্তেই দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে কাটিয়ে ফেলা। ফলে কর্মময় দিনের যাত্রা বিঘ্নিত হয়।
ডুমস্ক্রলিং (সোশ্যাল মিডিয়া বনাম স্লিপ সাইকেল) কীভাবে ঘুম নষ্ট করে?
অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল বলেন, ঘুমের সঙ্গে ডুমস্ক্রলিংয়ের দ্বন্দ্ব কয়েকটি কারণে ঘটে থাকে।
১. মোবাইলের নীল আলো মস্তিষ্কের পিনিয়াল গ্ল্যান্ড থেকে নিঃসৃত মেলাটোনিন নামের ঘুম সহায়ক হরমোনের স্বাভাবিক নিঃসরণে ব্যাঘাত ঘটায় বা তা বিলম্বিত করে। ফলে ঘুম আসতে দেরি হয়।
২. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট বা বিষয়বস্তু মস্তিষ্ককে উত্তেজিত করে রাখে। যুদ্ধ, দুর্ঘটনা, রাজনৈতিক সংঘাত, ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি বা বিতর্কিত বিষয় দেখলে মস্তিষ্ক সতর্ক অবস্থায় চলে যায়। তখন শরীর বিছানায় থাকলেও মস্তিষ্ক ঘুমের জন্য প্রস্তুত হতে পারে না।
৩. রিল বা শর্ট ভিডিওর দ্রুত পরিবর্তন মস্তিষ্কের ডোপামিন নির্ভর ব্যবস্থাকে সক্রিয় করে। ফলে মস্তিষ্ক আরও নতুন কনটেন্ট খুঁজতে থাকে এবং ঘুম পিছিয়ে দেয়, কিংবা ঘুমের শুরুটায় বিঘ্ন তৈরি করে। এভাবে ঘুমাতে দেরি হয় এবং ঘন ঘন ঘুম ভেঙে যায়। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর তখন ক্লান্তি লাগে, দিনের বেলায় কাজে বা পড়ায় মনোযোগ আসে না।
ডুমস্ক্রলিং শুধু ঘুমই নষ্ট করে না, মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলে।
মানসিক ক্ষতি—উদ্বেগ ও মানসিক চাপ, হতাশাবোধ বাড়িয়ে দেয়, মনোযোগ এবং স্মৃতিশক্তিও কমে যায়।
শারীরিক ক্ষতি—ঘুমের ঘাটতি, মাথাব্যথা, চোখে ক্লান্তি, সারাদিন অবসাদ ভোগা।
সামাজিক ক্ষতি—পরিবারে সময় কম দেওয়া, বাস্তব সম্পর্ক থেকে দূরে সরে যাওয়া, কাজ বা পড়াশোনার ক্ষতি।
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যাওয়া দিয়ে সমস্যার শুরু হলেও এর পেছনে থাকে দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে কাটানোর অভ্যাস।
রাতে ঘুম নষ্টের নীরব ঘাতক ডুমস্ক্রলিং থেকে মুক্তির উপায়
মোবাইল ব্যবহার পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়া নয়, বরং ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করাই লক্ষ্য। অর্থাৎ স্ক্রিন টাইম সীমিত করতে হবে।
মোবাইল বা ল্যাপটপের নির্দিষ্ট অ্যাপগুলোর জন্য দৈনিক সময় বেঁধে দিতে হবে। অ্যাপ ব্লকার ব্যবহার করে তা করা সম্ভব।
সকালে ঘুম থেকে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে এবং সন্ধ্যার পর থেকেই রাতে ঘুমানো পর্যন্ত ফোন থেকে দূরে থাকা নিশ্চিত করতে হবে।
পজিটিভ কনটেন্ট নির্বাচন—সোশ্যাল মিডিয়ার ফিডে নেতিবাচক পেজ বা গ্রুপগুলো আনফলো বা মিউট করে ইতিবাচক ও গঠনমূলক কনটেন্ট যুক্ত পেজ অনুসরণ করার বিষয়ে জানতে হবে।
অফলাইন শখ বা সৃজনশীল কাজে মনোযোগ বাড়াতে হবে। স্ক্রল করার অভ্যাস দূর করতে বই পড়া, ব্যায়াম করা, গান শোনা বা পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
বিছানাকে মোবাইল ব্যবহারের জায়গা বানানো যাবে না।
রাতে ফোনের নোটিফিকেশন সাইলেন্ট বা ডু-নট-ডিস্টার্ব মোডে রাখতে হবে।
শোবার আগেও বই পড়া, প্রার্থনা, ধ্যান বা হালকা সংগীতের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
ফোন চার্জে দিতে হবে বিছানা থেকে বেশ দূরে।
নিজের জন্য ‘ডিজিটাল কারফিউ’ নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল বলেন, আমাদের মনে রাখতে হবে—ডুমস্ক্রলিং এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মানসিক রোগ না হলেও আধুনিক ডিজিটাল জীবনের একটি অস্বাস্থ্যকর অভ্যাস, আসক্তি বা অ্যাডিকটিভ বিহেভিয়ার হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছে।
আমরা মনে করি, ‘খবর’ দেখছি। কিন্তু অনেক ‘খবর’ই আমাদের নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। ভালো ঘুম, মানসিক প্রশান্তি এবং সুস্থ জীবনের জন্য রাতে মোবাইলের সঙ্গে একটা স্বাস্থ্যকর দূরত্ব তেরি করা এখন সময়ের দাবি। প্রযুক্তিকে ব্যবহার করতে হবে, প্রযুক্তির দ্বারা ব্যবহৃত হওয়া যাবে না।


