সঙ্গীর সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাক্টিভিটি কতটা গুরুত্ব দেওয়া উচিত?
সোশ্যাল মিডিয়াকে যতই গালমন্দ করি না কেন, এই সময়ের বাস্তবতায় আমাদের জীবনের অনেকটা জায়গাজুড়ে এর অবস্থান। কোথায় যাচ্ছি, কী খাচ্ছি, এমনকি কার সঙ্গে ঘুরছি-ফিরছি—এই সবকিছুরই একটা পদচিহ্ন কোথাও না কোথাও আমরা রেখে যাচ্ছি। আমাদের চলার পথের এই নকশা কখনো আনন্দ দিচ্ছে, কখনো আবার জীবনে তৈরি করছে নানা দ্বন্দ্ব।
এই দ্বন্দ্বের একটি বড় জায়গা সাধারণত হয়ে থাকে রোমান্টিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে। সঙ্গী কার ছবিতে রিঅ্যাক্ট দিচ্ছে, ইনবক্সে কার সঙ্গে কথা বলছে বা তার নিউজফিডে কী ধরনের পোস্ট শেয়ার করছে ইত্যাদি বিষয় নিয়ে অনেকের মধ্যেই অনেকসময় মনোমালিন্য দেখা দেয়। সেই মনোমালিন্য থেকে তুমুল ঝগড়া কিংবা বিচ্ছেদের পথে যাওয়াও অস্বাভাবিক কিছু নয়। এমন ঘটনা হরহামেশাই আমাদের আশেপাশে ঘটে থাকে।
তবে এখানে সবকিছুর বাইরে যে প্রশ্নটি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, তা হচ্ছে—আদতে সঙ্গীর সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাক্টিভিটির কতটুকু প্রভাব নিজের মধ্যে পড়া উচিত? কতটা গুরুত্ব দেওয়া উচিত এই বিষয়টিতে?
ব্যক্তিগত গোপনীয়তা
সম্পর্ক যতই কাছের হোক, প্রতিটি ব্যক্তির জীবন আলাদা। এই বিষয়টি স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করলে অনেকসময় অনেক কিছুই সহজ হয়ে যায়। বিশেষ করে প্রেম বা বিয়ের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটি আরও বেশি প্রযোজ্য। কেননা সম্পর্কে জড়ানোর পর নিজেদের ব্যক্তিগত পরিসরটা তখন কিছুটা পর্যায় পর্যন্ত ভাগ হয়ে যায়, সেই ভাগ হয়ে যাওয়ার ফলে কখনো কখনো ব্যক্তি তার নিজস্বতা নিয়ে বিপাকেও পড়তে পারেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কে কী করছে, কার সঙ্গে কতটুকু এবং কী বিষয়ে কথা বলছে ইত্যাদি সব বিষয়েই যদি সঙ্গী মাথা ঘামাতে শুরু করেন, তখন অন্য পক্ষে মনে হতেই পারে—তিনি আটকে গেছেন। আর এই মানসিক বন্দিত্বের অনুভূতি থেকে পরবর্তীতে অন্যান্য অনেক নেতিবাচক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। কিন্তু দুপক্ষই যদি ব্যক্তিগত গোপনীয়তার বিষয়টি সম্মান করে শান্তিতে দিন কাটাতে পারেন, তাহলে তেমন কোনো সমস্যার জন্ম হওয়ার কথা নয়।
মতাদর্শের বিরোধ
আর কিছুদিনের মধ্যেই বিশ্বকাপ ফুটবলের ঝড়ে মেতে ওঠার অপেক্ষায় আছেন ফুটবলপ্রেমীরা। এর মধ্যে প্রেমিক যদি হন আর্জেন্টিনা সাপোর্টার, আর প্রেমিকাটি ব্রাজিলের পতাকায় নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রোফাইলটি রাঙিয়ে রাখেন—তবে কিছুটা খুনসুটি হওয়া খুব স্বাভাবিক। কিন্তু অনলাইনের এই দলাদলি যদি অফলাইনেও মন কষাকষি নিয়ে আসে, তবে বোধহয় একটু ভেবে দেখা দরকার।
খেলা, রাজনীতি, মানবাধিকার বিষয়ক চিন্তা-ভাবনা, জেন্ডার ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়েই একটি জুটির মধ্যে ভিন্ন মতাদর্শ থাকতে পারে। সেটি তাদের মধ্যে সম্পর্কের শুরু বা কিছুদিন পর থেকেই স্পষ্ট হয়ে গেলে তা বারবার সংঘাত কিংবা সমঝোতা দুভাবেই এগিয়ে যেতে পারে। কিন্তু অনেকদিনের জানাশোনা এই বিষয়গুলোই যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সঙ্গীর প্রোফাইল থেকে সমর্থন করা হয়, তখন অপরজনের জন্য তা কিছুটা বিব্রতকর মনে হতে পারে। কিন্তু সেই বিব্রতবোধ থেকে আসলে সঙ্গীর সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাক্টিভিটিতে কতটা হস্তক্ষেপ করা উচিত—এ বিষয়টি একইসঙ্গে প্রশ্নসাপেক্ষ।
বিষয়টি কি আপনার জন্য ক্ষতিকর?
আলাপের এই পর্যায়ে এই প্রশ্নটি অনেক বেশি গুরুত্ব রাখে। দুজন মানুষ যখন একটি সম্পর্কে জড়িয়ে আছেন, তখন সাধারণত আশপাশের সকলেই সেটি জানেন—তা সে বিয়ের পর বা প্রেমের সময়, যেকোনো পর্যায়েই হতে পারে। ফলে সঙ্গীর সামাজিক মাধ্যমের কোনো একটি স্ট্যাটাস বা কোনো কাজ যদি আপনার নিজস্ব ইমেজের জন্য ক্ষতিকর হয় বা সামাজিক মাধ্যমের কোনো আচরণ যদি বাস্তব জীবনে আপনার ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করে, তবে সেটি নিয়ে খতিয়ে দেখা দরকার।
ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের জায়গা থেকে যার যার আচার-আচরণ কাজ আলাদা, এমন নীতিতে বিশ্বাসী অনেকেও হয়তো এধরনের জায়গায় এসে হোঁচট খান। তখন এ নিয়ে কোনো ধরনের দুশ্চিন্তা করা প্রয়োজন কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়। খটকা যদি মাত্রা ছাড়িয়ে যেতে থাকে, তবে এমন অবস্থায় সবকিছু এড়িয়ে না যাওয়াই ভালো। কেননা সামাজিক জীবনে দুজনের একটি সম্মিলিত জীবনযাপনের জায়গা আছে, যেখানে অনেকসময় একক আচরণও প্রভাব ফেলে।
যদি কারো মনে হয়ে থাকে, তার সঙ্গীর সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাক্টিভিটি তার জন্য ক্ষতিকর বা অপমানজনক, এক্ষেত্রে লুকিয়ে-চুরিয়ে অন্যের ফোন ঘাঁটা বা অন্যের কাছ থেকে কিছু শুনে সেটি নিয়ে প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে ওঠা মোটেও কোনো সমাধান নয়। এরচেয়ে বরং কোন কোন জায়গায় সমস্যা হচ্ছে, সেটি নিয়ে অপরপক্ষের সঙ্গে সোজাসুজি কথা বলাটাই ভালো।
কথোপকথনের পর যদি কোনো সুরাহা না আসে, তখন নিজেদের মধ্যে একটি সীমারেখা তৈরি করা বা প্রয়োজনমতো পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। তবে একটি বিষয় সবক্ষেত্রেই খেয়াল রাখা জরুরি যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি লাইক বা শেয়ারের থেকেও অনেক বেশি গুরুত্ব রাখে বাস্তব জীবনের যোগাযোগ। দুটো মানুষের মধ্যকার সেই যোগাযোগ যদি স্পষ্ট ও সংবেদনশীল হয়, তবে সমাধানের পথ অনেক কঠিন হওয়ার কথা নয়।



