গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণ

ট্রাম্পকে খুশি করতে গিয়ে কীভাবে কোণঠাসা হলেন তুলসি গ্যাবার্ড

স্টার অনলাইন ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালকের পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন তুলসি গ্যাবার্ড। গতকাল শুক্রবার তিনি পদত্যাগপত্র জমা দেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে লেখা এক চিঠিতে তিনি পদত্যাগের কারণ ও ১৫ মাসে তার অর্জন তুলে ধরেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে পোস্ট করা ওই চিঠিতে তিনি লিখেছেন, ‘আমার স্বামী আব্রাহাম সম্প্রতি অতি বিরল ধরনের বোন ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছেন। এই সময়ে তার পাশে থেকে সহায়তা করার জন্য আমাকে অবশ্যই সরকারি দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াতে হবে।’

তুলসি গ্যাবার্ডের পদত্যাগপত্র। ছবি: স্টার অনলাইন গ্রাফিক্স

চিঠিতে লেখা কারণই তুলসি গ্যাবার্ডের পদত্যাগের প্রকৃত কারণ? নাকি তাকে জোর করে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে? নাকি এর পেছনে অন্য কিছু রয়েছে?—এমন অনেক প্রশ্ন উঠেছে তার পদত্যাগের পর।

আজ শনিবার ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে উঠে এসেছে—কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্রের এই গুরুত্বপূর্ণ পদে বসা গ্যাবার্ড গত ১৫ মাসে কী করেছেন, প্রেসিডেন্টকে খুশি করতে গিয়ে কীভাবে উল্টো তার থেকে দূরে সরে গেছেন এবং আরও নানা বিতর্কিত বিষয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ডিরেক্টর অব ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স (ওডিএনআই) পদের জন্য ব্যতিক্রমী পছন্দ ছিলেন গ্যাবার্ড। সাবেক এই ডেমোক্র্যাট নেত্রীর কোনো গোয়েন্দা ব্যাকগ্রাউন্ডও ছিলো না।

বৈদেশিক নীতি প্রশ্নে তার পররাষ্ট্রনীতি সংক্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি অনেক সময় ডোনাল্ড ট্রাম্পের চেয়ে আলাদা ছিলো। বিশেষ করে বিদেশে সামরিক হস্তক্ষেপ ইস্যুতে তিনি বরাবরই সতর্ক অবস্থানে ছিলেন।

তিনি মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ভেতর থেকে ‘রাজনৈতিক প্রভাব’ দূর করার অঙ্গীকার করেছিলেন। একইসঙ্গে নির্বাচনী কারচুপির বিষয়ে ট্রাম্পের এজেন্ডাকে সমর্থনও করেছিলেন।

১৫ মাসে যা যা করেছেন

ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর গত বছরের জানুয়ারিতে তুলসী গ্যাবার্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ গোয়েন্দা প্রধানের পদে মনোনীত করেছিলেন।

ওই সময় সিনেটে নিশ্চিতকরণ শুনানিতে রিপাবলিকান সিনেটর টম কটন গ্যাবার্ডকে বলেছিলেন, ‘আপনার সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করবে আপনি ওডিএনআইকে তার মূল আকার, দায়িত্ব ও লক্ষ্য অনুযায়ী ফিরিয়ে নিতে পারেন কি না, তার ওপর।’

ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে পদত্যাগকারী মন্ত্রিসভার  চতুর্থ সদস্য হলেন তুলসী গ্যাবার্ড। ছবি: সংগৃহীত

অনেক আইনপ্রণেতার মতে, ২০ বছরের বেশি সময়ের কার্যক্রমে এই গোয়েন্দা সংস্থাটির পরিবেশ অনেক জটিল হয়ে গিয়েছিল।

তখন গ্যাবার্ড আইনপ্রণেতাদের জানিয়েছিলেন, তিনি ২ হাজার সদস্যের এই সংস্থাটির ‘দক্ষতা, পুনরাবৃত্তি ও কার্যকারিতা’ নিয়ে কাজ করবেন।

তার দাবি, দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি কর্মীসংখ্যা ৩০ শতাংশ কমিয়েছেন। আগাম অবসরে পাঠিয়েছেন অন্তত ১০০ কর্মীকে।

খরচ কমানো এবং গোয়েন্দা মহলে ক্ষমতার অপব্যবহার হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে ‘ডিরেক্টরস ইনিশিয়েটিভস গ্রুপ’ বা ডিআইজি নামে একটি টাস্কফোর্সও গঠন করেন।

ট্রাম্পের অগ্রাধিকার দেওয়া বিষয়গুলো নিয়ে তদন্ত করেছে ডিআইজি। এর মধ্যে ছিল কোভিড-১৯-এর উৎস, ২০১৬ সালের নির্বাচনে রুশ হস্তক্ষেপের অভিযোগ এবং ‘হাভানা সিনড্রোমের’ মতো স্বাস্থ্য সমস্যা।

নানা বিতর্কের জেরে গত বছর ডিসেম্বরে এই টাস্কফোর্স কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।

তবে শেষ পর্যন্ত এটি তার লক্ষ্য কতটা পূরণ করতে পেরেছিল, তা স্পষ্ট নয়।

যেভাবে ট্রাম্পের সঙ্গে দূরত্ব

প্রেসিডেন্টের আস্থাভাজন হওয়ার জন্য গ্যাবার্ড বেশ কিছু নজিরবিহীন পদক্ষেপ নিয়েছিলেন বলে জানায় গার্ডিয়ান।

তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ট্রাম্পের কাছ থেকে ক্রমেই দূরে সরে যান তিনি।

ইরান ও ভেনেজুয়েলা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় নিরাপত্তা আলোচনায় তাকে আর অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছিল না বলে জানিয়েছেন ওডিএনআই সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তি।

ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংক ট্যাংক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) গোয়েন্দা, জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রযুক্তি কর্মসূচির পরিচালক এমিলি হার্ডিং গার্ডিয়ানকে বলেন, ‘অনেক দিন ধরেই তিনি মূল ক্ষমতার বলয়ের বাইরে ছিলেন।’

২০২৫ সালের জুনে ট্রাম্প প্রথমবার প্রকাশ্যে গ্যাবার্ডের মূল্যায়নকে গুরুত্বহীন করে তোলেন। সে সময় ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা ও বিজ্ঞানীদের হত্যার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথ অভিযান চালাচ্ছিল।

সাংবাদিকরা ট্রাম্পকে স্মরণ করিয়ে দেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে না বলে সিনেটে শুনানিতে দাবি করেছিলেন গ্যাবার্ড।

জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘তিনি কী বলেছেন, তা নিয়ে আমি ভাবি না। আমার মনে হয় তারা খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল।’

এর কিছুদিন পর গ্যাবার্ড নিজের অবস্থান বদলে বলেন, ইরান কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে সক্ষম হতে পারে।

এই ঘটনাকে অনেকেই গোয়েন্দা প্রধানের সঙ্গে ট্রাম্পের দূরত্বের প্রতীক হিসেবে দেখেছেন।

হোয়াইট হাউসের রোজ গার্ডেনে একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যাচ্ছেন তুলসী গ্যাবার্ড। ছবি: সংগৃহীত

তাদের মতে, আগ্রাসী সামরিক অবস্থানের দিকে এগোচ্ছিলেন ট্রাম্প।

অন্যদিকে গ্যাবার্ড দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে সামরিক হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করে আসছিলেন।

গ্যাবার্ডের সাবেক ডেপুটি জো কেন্ট ইরান যুদ্ধের বিরোধিতা করে পদত্যাগ করলে ট্রাম্পের সঙ্গে তার সম্পর্ক আবারও টানাপোড়েনে পড়ে।

ইরান যুদ্ধের বিরোধীতা করে পদত্যাগ করেন গ্যাবার্ডের সাবেক ডেপুটি জো কেন্ট। ছবি: সংগৃহীত

ওই সময় গ্যাবার্ড প্রকাশ্যে কেন্টের নিন্দা করেননি।

এরপর থেকেই ট্রাম্প গ্যাবার্ডের নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্চ থেকেই গ্যাবার্ডকে বরখাস্ত করার বিষয়ে মন্ত্রিসভার সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করেন ট্রাম্প।

কার্যালয়ে ব্যক্তিগত আনুগত্য

ট্রাম্পের মতো গ্যাবার্ডও নিজ কার্যালয়ে ব্যক্তিগত আনুগত্যকে গুরুত্ব দিতেন।

চলতি বছরের শুরুতে তার কার্যালয় সম্পর্কে অবগত এক ব্যক্তি বলেন, ‘এখন তিনি খুব সীমিত একটি অভ্যন্তরীণ বলয়ের ওপর নির্ভরশীল।’

গ্যাবার্ডের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠদের একজন ছিলেন তার ভারপ্রাপ্ত চিফ অব স্টাফ অ্যালেক্সা হেনিং।

ট্রাম্প প্রশাসনের প্রথম মেয়াদে কাজ করা এই রাজনীতিক এর আগে আরকানসাসের গভর্নর সারা হাকাবি স্যান্ডার্সের কার্যালয়ে কাজ করেছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্টে তিনি নিজেকে গভর্নরের সহযোগীদের একজন বলেও উল্লেখ করেছিলেন।

গ্যাবার্ড দায়িত্ব নেওয়ার পর হেনিং প্রায়ই সংবাদমাধ্যম ও অন্যান্য গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক অবস্থান নেন।

তিনি এক্সে সিনেট ইন্টেলিজেন্স কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান মার্ক ওয়ার্নারকে বারবার কটাক্ষ করেন এবং গ্যাবার্ডের মনোনয়নের বিরোধিতা করা রিপাবলিকানদেরও সমালোচনা করেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন অভিজ্ঞ কংগ্রেস সহকারী দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন, তিনি এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ভর পদ নিয়ে নির্বাচনী প্রচারণার মতো আচরণ করছেন। এটি নজিরবিহীন। ঐতিহাসিকভাবে এটি কোনো দলীয় পদ নয়।

গ্যাবার্ডের প্রতি হেনিংয়ের এই অতি আনুগত্য তখন প্রশ্নের মুখে পড়ে এবং এ নিয়ে দলের ভেতরে সমালোচনাও হয়।

বিতর্কিত যেসব ইস্যু

ট্রাম্প প্রশাসনে নিয়োগ পাওয়ার আগে থেকেই তুলসি গ্যাবার্ডের বিরুদ্ধে বেশ কিছু অভিযোগ ছিলো।

এর মধ্যে রয়েছে—হাওয়াইভিত্তিক ধর্মীয় গোষ্ঠী ‘সায়েন্স অব আইডেন্টিটি ফাউন্ডেশনের’ সঙ্গে তার সম্পর্ক এবং রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও সাবেক সিরীয় নেতা বাশার আল আসাদের প্রতি সহানুভূতি দেখানো।

নিয়োগ পাওয়ার পর আলোচনায় আসে একটি ভোটকেন্দ্রে এফবিআই অভিযানে তার উপস্থিত থাকা। ওই অভিযানে ২০২০ সালের নির্বাচনে ব্যবহৃত ব্যালট ও অন্যান্য সামগ্রী জব্দ করা হয়েছিল।

এফবিআই-এর তল্লাশি অভিযানে উপস্থিত ছিলেন তুলসি গ্যাবার্ড। ২৮ জানুয়ারি, ২০২৬। ছবি: সংগৃহীত

সে সময় ডেমোক্র্যাটরা অভিযোগ করেন, জাতীয় গোয়েন্দা প্রধানের একটি অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা অভিযানে উপস্থিত থাকা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

সিনেটর মার্ক ওয়ার্নার বলেন, দেশের শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তা যখন বিদেশি হুমকির সঙ্গে সম্পর্ক নেই এমন বিষয়ে নিজেকে জড়ান, তখন মনে হয় তার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিলো অর্থাৎ ট্রাম্পের আস্থা অর্জন করা।

তবে ট্রাম্প তখন গ্যাবার্ডের প্রশংসাই করেছিলেন।

সিআইএর র‌্যাটক্লিফের উত্থান

গ্যাবার্ডের সঙ্গে যখন ট্রাম্পের সম্পর্কে টানাপোড়ন শুরু হয়, তখন ধীরে ধীরে ট্রাম্পের আস্থাভাজন হতে শুরু করেন সিআইএর পরিচালক জন র‌্যাটক্লিফ।

পরবর্তীতে তাকে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, হোয়াইট হাউস বেছে বেছে নির্দিষ্ট মানুষদের গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় যুক্ত করেছে। র‌্যাটক্লিফকেও সবকিছুতে অন্তর্ভুক্ত করে তারা।

জন র‌্যাটক্লিফ ও ট্রাম্প। ছবি: সংগৃহীত

বলা হয়, ট্রাম্পের সঙ্গে র‌্যাটক্লিফের ঘনিষ্ঠতাও গ্যাবার্ডের সরে যাওয়ার অন্যতম একটি কারণ। যদিও দুটি বিষয়কে সরাসরি যুক্তি দিয়ে দেখানো কঠিন।

পদত্যাগপত্র অনুযায়ী, তুলসি গ্যাবার্ড ৩০ জুন পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করবেন। নতুন অন্তর্বর্তী গোয়েন্দা পরিচালক হিসেবে অ্যারন লুকাসের নাম ঘোষণা করেছে হোয়াইট হাউস।

ছবি: স্টার অনলাইন গ্রাফিক্স

গ্যাবার্ডের পদত্যাগ নিয়ে ট্রাম্প এখনো বিস্তারিত মন্তব্য করেননি।

তবে নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘তুলসি অসাধারণ কাজ করেছেন। আমরা তাকে মিস করব।’