রক্তচাপ-ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণসহ আরও যেসব উপকার করে দারুচিনি
লেখার শুরুতেই আপনাদের একটি চমকপ্রদ তথ্য দিই। আপনি কি জানেন, আমাদের রান্নাঘরের বহুল ব্যবহৃত মশলা দারুচিনি একসময় বিনিময়ের ক্ষেত্রে মুদ্রা হিসেবে ব্যবহৃত হতো? না, সেসব বিস্তারিত আলোচনায় যাব না আমরা। দারুচিনি নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানাব।
মিষ্টি গন্ধের জন্য বিভিন্ন রান্নায়, বিশেষ করে মিষ্টান্ন, বেকিংয়ের খাবার ও তরকারিতে ব্যবহার করা হয় দারুচিনি। আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় দারুচিনি যোগ করার বেশকিছু স্বাস্থ্যগত উপকারিতা রয়েছে। এ ব্যাপারে আমাদের বিস্তারিত জানিয়েছেন এমএইচ শমরিতা হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজের পুষ্টিবিদ আঞ্জুমান আরা শিমুল।
দারুচিনির পুষ্টিগুণ
এক চা-চামচ দারুচিনি গুঁড়োতে নিম্নোক্ত পুষ্টি উপাদানগুলো রয়েছে:
ক্যালোরি: ৭
প্রোটিন: ০.১ গ্রাম
কার্বোহাইড্রেট: ২ গ্রাম
ফাইবার: ১.৬ গ্রাম
দারুচিনির স্বাস্থ্য উপকারিতা
অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট বৈশিষ্ট্য
অন্যান্য মশলার মতো দারুচিনিতেও রয়েছে পলিফেনল, যা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন। অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট আমাদের দেহের অক্সিডেটিভ ড্যামেজ কমাতে সাহায্য করে। দারুচিনি গ্রহণের ফলে আমাদের শরীরে অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের পরিমাণ বেড়ে যায়, যা বিভিন্ন স্বাস্থ্যজটিলতা, যেমন: ফুসফুস বা শ্বাসতন্ত্র, পরিপাকতন্ত্র ও বিভিন্ন ধরনের হৃদরোগের বিরুদ্ধে কাজ করে।
অ্যান্টিইনফ্ল্যামেটরি বৈশিষ্ট্য
দারুচিনি আমাদের শরীরের প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে।
ইনফ্ল্যামেশন বা প্রদাহ বলতে আমরা কী বুঝি? এটি আমাদের দেহের একটি স্বাভাবিক ও উপকারী শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া, যা আমাদের শরীরকে ইনফেকশনের বিরুদ্ধে লড়াই করতে এবং ক্ষতিগ্রস্ত টিস্যুগুলোকে সারিয়ে তুলতে সাহায্য করে।
কিন্তু সমস্যা হয় তখনই, যখন এই প্রদাহ আমাদের শরীরে দীর্ঘসময় ধরে স্থায়ী হয়। এই দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ আমাদের শরীরকে বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এবং বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা বার্ধক্যজনিত নানা রোগের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
দারুচিনিতে উপস্থিত অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট প্রদাহের এই দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব কমাতে সাহায্য করে।
অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল এবং অ্যান্টিফাঙ্গাল বৈশিষ্ট্য
দারুচিনির স্বাদ ও গন্ধ মূলত আসে এর বাকলে উপস্থিত সিনামালডিহাইড নামক এক ধরনের উপাদান থেকে। সিনামালডিহাইড আমাদের শরীরকে ইনফেকশন সৃষ্টিকারী বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়া ও ফাঙ্গাসের হাত থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে।
অ্যান্টিভাইরাল বৈশিষ্ট্য
দারুচিনিতে উপস্থিত বিভিন্ন উপাদান আমাদের শরীরকে বেশ কিছু ভাইরাসের হাত থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। উপাদানগুলো ভাইরাসগুলোর রেপ্লিকেশন বন্ধ করে দিতে পারে। এ ছাড়া, সিনামালডিহাইড ইনফ্লুয়েঞ্জা ও ডেঙ্গু ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করতে পারে।
ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণ
দারুচিনি ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে। এটি শারীরবৃত্তীয় বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় ইনসুলিনের ব্যবহার বাড়াতে এবং কার্বোহাইড্রেট ভেঙে সুগারে পরিণত হওয়ার প্রক্রিয়াকে ধীর করতে সাহায্য করে। এর ফলে কোনো খাবার গ্রহণের পর রক্তে তুলনামূলকভাবে কম সুগার পৌঁছাতে পারে।
ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স কমায়
প্রথমেই ইনসুলিন কী, সে সম্পর্কে একটু ধারণা নেওয়া যাক। ইনসুলিন এক ধরনের হরমোন, যা আমাদের রক্তে উপস্থিত সুগারকে রক্ত থেকে বিভিন্ন কোষে পৌঁছে দেয় এবং তা শক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
আমাদের বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ইনসুলিনের প্রতি আমাদের দেহের সংবেদনশীলতা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। এর ফলে ইনসুলিন ঠিকমতো কাজ করতে পারে না এবং রক্তে সুগারের মাত্রা বেড়ে যায়, যা টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
দারুচিনির নির্যাস অনেকটা ইনসুলিনের মতো কাজ করে এবং শরীরে সুগার পরিবহনে সাহায্য করে। এর ফলে শরীরের ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স কমে যায়।
ব্রেনের জন্য উপকারী
আমাদের বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ব্রেনের কোষগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে এবং অ্যালঝেইমার ও পারকিনসন ডিজিজের মতো নিউরোডিজেনারেটিভ ডিজিজ দেখা দিতে শুরু করে।
অ্যালঝেইমার ডিজিজে সাধারণত কিছু কিছু প্রোটিন ব্রেনে জমা হতে শুরু করে। এর ফলে চিন্তা করার ক্ষমতা এবং স্মৃতিশক্তি ধীরে ধীরে কমে যেতে পারে।
দারুচিনিতে দুই ধরনের উপাদান রয়েছে, যা ব্রেনে এই প্রোটিনগুলো জমা হতে বাধা দিতে পারে।
রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ
নিয়মিত দারুচিনি সেবনের ফলে রক্তচাপ কিছুটা কমতে পারে।
হৃদযন্ত্রের জন্য উপকারী
রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইড ও কোলেস্টেরলের মাত্রা কমিয়ে দারুচিনি হৃদপিণ্ডের সুস্থতা বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে।
অন্ত্রের জন্য হিতকর
দারুচিনি আমাদের অন্ত্রে শরীরের জন্য উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলোর বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। এর ফলে শরীরে ভালো ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য বজায় থাকে এবং হজমে সহায়তা করে।
মুখের সুস্বাস্থ্য
অনেক আগে থেকেই দারুচিনি দাঁতব্যথা নিরাময়ে, মুখের দুর্গন্ধ দূর করতে এবং মুখের ভেতরকে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার হাত থেকে রক্ষা করতে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
দারুচিনি আমাদের জন্য কতটা নিরাপদ?
দারুচিনির বিভিন্ন প্রজাতি রয়েছে। অল্প পরিমাণে গ্রহণ করলে যেকোনো প্রজাতির দারুচিনিই আমাদের জন্য নিরাপদ। তবে অতিরিক্ত দারুচিনি খেলে তা বিভিন্ন ধরনের ওষুধের, বিশেষ করে ডায়াবেটিস, হার্ট ডিজিজ বা লিভার ডিজিজের জন্য সেবন করা ওষুধের সঙ্গে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে।
এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয় যে, ক্যাসিয়া সিনামন প্রজাতির দারুচিনিতে কুমারিন নামক এক ধরনের উপাদান থাকে। তাই এই প্রজাতির দারুচিনি অতিরিক্ত সেবন করলে তা লিভারের ক্ষতির কারণ হতে পারে।


