হৃদরোগ-ডায়াবেটিস প্রতিরোধসহ আরও যেসব পুষ্টিগুণ আছে এলাচের

শবনম জাবীন চৌধুরী

কথায় আছে, ‘প্যাকেজ ছোট, ধামাকা বড়!’ আমাদের রান্নাঘরের ছোট্ট মশলা এলাচের ব্যাপারে বলতে গেলে এর চেয়ে ভালো উপমা বোধহয় আর হয় না। ভারত উপমহাদেশে বহুল ব্যবহৃত সুগন্ধযুক্ত এই মশলাটি দেখতে সাধারণ হলেও, এর রয়েছে বহুগুণ।

এলাচের রয়েছে হালকা মিষ্টি গন্ধ, মৃদু মিষ্টতা এবং কিছুটা ঝাঁঝালো স্বাদ। এই মশলাকে ‘কুইন অব স্পাইস’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়ে থাকে। প্রায় ৪ হাজার বছরেরও অধিক সময় ধরে এলাচ রান্নার মশলা এবং ওষুধি গুণের জন্য প্রসিদ্ধ।

এলাচের স্বাস্থ্য উপকারিতা সম্পর্কে আমাদের বিস্তারিত জানিয়েছেন এমএইচ শমরিতা হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজের পুষ্টিবিদ আঞ্জুমান আরা শিমুল

এলাচের পুষ্টিগুণ

এক চামচ এলাচ গুঁড়োতে নিম্নোক্ত পুষ্টি উপাদানগুলো রয়েছে—
• ক্যালোরি: ১৮
• ফ্যাট: ০.৪ গ্রাম
• কার্বোহাইড্রেট: ৪.০ গ্রাম
• ফাইবার: ১.৬ গ্রাম
• প্রোটিন: ০.৬ গ্রাম
• পটাশিয়াম: ৬৪.৯ মিলিগ্রাম
• ক্যালসিয়াম: ২২.২ মিলিগ্রাম
• আয়রন: ০.৮১ মিলিগ্রাম
• ম্যাগনেসিয়াম: ১৩.৩ মিলিগ্রাম
• ফসফরাস: ১০.৩ মিলিগ্রাম

Cardamom
ছবি: সংগৃহীত

এলাচের স্বাস্থ্য উপকারিতা

অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল বৈশিষ্ট্য

এলাচের ভেতরে থাকা দানা থেকে তৈরি তেল দেহের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করতে সাহায্য করে। বিশেষ করে দাঁতের মাড়ির বিভিন্ন ক্ষত বা রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে এটি কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। এলাচের নির্যাস ব্যাকটেরিয়ার বাইরের আবরণ নষ্ট করে ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি ব্যাহত করে এবং সেগুলোকে ধ্বংস করতে সাহায্য করে।

অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বৈশিষ্ট্য

এলাচে উপস্থিত বিভিন্ন অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরকে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস থেকে সুরক্ষা দিতে সাহায্য করতে পারে। অক্সিডেটিভ স্ট্রেস দীর্ঘমেয়াদে কয়েক ধরনের ক্যানসার এবং কিছু বার্ধক্যজনিত রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

হৃদরোগ ও ডায়াবেটিস প্রতিরোধে

আঞ্জুমান আরা শিমুল বলেন, ‘বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, এলাচ মেটাবলিক সিনড্রোমের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন স্বাস্থ্যজটিলতা, যেমন: উচ্চ রক্তচাপ, রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যাওয়া, এলডিএল (ব্যাড) কোলেস্টেরলের মাত্রা বৃদ্ধি এবং স্থূলতা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। এলাচ এলডিএল (ব্যাড) কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে এবং এইচডিএল (ভালো) কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়াতে সাহায্য করে। পাশাপাশি এটি রক্তচাপ কমাতে এবং শরীরের বিভিন্ন ধরনের প্রদাহ হ্রাস করতেও সহায়তা করতে পারে। ফলে বিভিন্ন হৃদরোগ ও টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমে যেতে পারে।’

মুখের সুস্বাস্থ্য

মুখের সতেজতা ধরে রাখতে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এলাচ ব্যবহার হয়ে আসছে। এলাচ মুখের দুর্গন্ধ, ক্যাভিটি ও মাড়ির রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করে। এলাচের অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট বৈশিষ্ট্য মুখের সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতে সহায়তা করে।

লিভারের সুস্থতা

এলাচ অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমিয়ে লিভারের সুস্থতা বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে।

হজমে সহায়তা

এলাচ হজমে সহায়তা করে, বমিবমি ভাব কমাতে এবং পাকস্থলীর অস্বস্তিভাব ও পেট ফাঁপা দূর করতে সাহায্য করে।

আলসার প্রতিরোধ

এলাচে উপস্থিত এসেনশিয়াল অয়েল আলসার প্রতিরোধে সহায়তা করতে পারে।

Cardamom
ছবি: সংগৃহীত

কীভাবে এলাচ গ্রহণ করলে সর্বোচ্চ স্বাস্থ্য উপকারিতা পাওয়া যাবে?

  • প্রতিদিন খাবার গ্রহণের পর এলাচের ভেতরের ১ থেকে ২টি দানা চিবিয়ে খেলে তা হজমে সহায়তা করতে পারে এবং মুখের দুর্গন্ধ দূর করতে সাহায্য করে।

  • এলাচ চা, কফি, দুধ, স্মুদি, বিরিয়ানি, পায়েস, তরকারি বা বিভিন্ন মিষ্টান্ন তৈরিতে ব্যবহার করলে তা খাবারে শুধু সুন্দর ঘ্রাণই যোগ করে না, বরং বিভিন্নভাবে আমাদের শরীরের শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। এলাচের সঙ্গে আদা ও দারুচিনি যোগ করে চা তৈরি করে পান করলে তা শরীরের বিভিন্ন ধরনের প্রদাহ কমাতে সহায়তা করতে পারে।

  • এলাচ থেকে প্রস্তুতকৃত এসেনশিয়াল অয়েল চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যারোমাথেরাপিতে ব্যবহৃত হয়।

এলাচ গ্রহণের ক্ষেত্রে কোনো সতর্কতা রয়েছে কি?

এলাচের সাধারণত কোনো ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা ক্ষতিকর প্রভাব নেই। তবে যাদের গলব্লাডারে পাথর রয়েছে, নির্দিষ্ট কোনো মশলার প্রতি অ্যালার্জি রয়েছে বা পাকস্থলীর কোনো ব্যাধিতে আক্রান্ত, তাদের খুবই সীমিত পরিমাণে এই মশলা গ্রহণ করা উচিত।

এ ছাড়া অন্তঃসত্ত্বা নারী ও স্তন্যদানকারী মায়েদেরও খুব অল্প পরিমাণে এলাচযুক্ত খাবার খাওয়া উচিত। অন্যথায়, অতিরিক্ত পরিমাণে এলাচ গ্রহণের ফলে অ্যাসিডিটি বা পাকস্থলীতে অস্বস্তি দেখা দিতে পারে।