ঘরোয়া মসলায় লুকিয়ে থাকা চিকিৎসাগুণ সম্পর্কে জানেন?
রান্নাঘরের তাকে সাজানো থাকে হরেক রকমের মসলা। রান্নায় একটুখানি মসলার ব্যবহার রান্নাকে করে তোলে আরও সুস্বাদু। তবে মসলার ক্ষেত্রে শুধু রান্নায় স্বাদের কথাই কেন বলি; আমাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় রয়েছে এর দারুণ সব চিকিৎসাগুণ। যেন একের ভেতর দুই!
মসলায় রয়েছে বিভিন্ন ধরনের ভিটামিন, খনিজ উপাদান ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা স্বাস্থ্য সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ওষুধি গুণের কারণে প্রাচীনকাল থেকেই বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় নানা ধরনের মসলার ব্যবহার প্রচলিত হয়ে আসছে।
মসলার চিকিৎসাগুণ সম্পর্কে আমাদের বিস্তারিত জানিয়েছেন এমএইচ সমরিতা হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজের পুষ্টিবিদ আঞ্জুমান আরা শিমুল। তিনি বলেন, ‘রান্নাঘরের চিরচেনা মসলাগুলো আমাদের প্রতিদিনের ছোটখাটো অসুস্থতা থেকে দূরে রাখে। তবে এগুলোকে ওষুধের বিকল্প হিসেবে নিয়মিত গ্রহণের আগে নিজের শরীরের অবস্থা ও প্রয়োজন বুঝে পরিমিত পরিমাণে খাওয়া উচিত।’
হলুদ
হলুদ আমাদের শরীরের জন্য এক অনন্য ‘সুরক্ষা প্রাচীর’। হলুদের মূল উপাদান হলো কারকিউমিন, যার রয়েছে শক্তিশালী অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি বৈশিষ্ট্য। যারা আর্থ্রাইটিসে ভুগছেন, তাদের ব্যথা ও ফোলাভাব কমাতে হলুদ সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। এছাড়া আলঝেইমার ও ডিপ্রেশনে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মস্তিষ্কের প্রদাহ কমাতেও কারকিউমিনের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে।
এখানেই শেষ নয়। হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস এবং হজমজনিত সমস্যার ক্ষেত্রে হলুদ উপকারী ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি রক্ত পরিশোধন, সোরিয়াসিস ও ত্বকের চুলকানির উপশমে এবং কিছু কিছু ক্যানসার প্রতিরোধে হলুদের সম্ভাব্য কার্যকারিতা রয়েছে। এছাড়াও হলুদের অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল ও অ্যান্টিভাইরাল বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা ঠান্ডা-কাশি উপশমে সহায়তা করতে পারে।
আদা
আদাকে আমাদের পরিপাকতন্ত্রের পরম বন্ধু বলা যেতে পারে। এর ঝাঁঝালো স্বাদের ভেতরে লুকিয়ে আছে জিঞ্জেরল নামের একটি উপকারী উপাদান, যা আদার ওষুধি গুণের মূল উৎস। বদহজম, বমিবমি ভাব, পেট ফাঁপা এবং মোশন সিকনেস দূর করতে আদার জুড়ি মেলা ভার।
আদা আমাদের দেহের কোষকে সুরক্ষিত রাখতে সাহায্য করে। এতে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি উভয় ধরনের বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা শরীরের বিভিন্ন ধরনের প্রদাহ কমায়। এছাড়া আদা রক্তচাপ ও রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে।
দারুচিনি
দারুচিনির মিষ্টি সুবাস কেবল পায়েস বা মাংসের স্বাদই বাড়ায় না, এটি আমাদের শরীরের শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণেও সহায়ক ভূমিকা পালন করে। যাদের রক্তে সুগারের মাত্রা বেশি, তাদের জন্য দারুচিনি উপকারী হতে পারে। এটি খাবারে প্রাকৃতিক মিষ্টি স্বাদ যোগ করে, ফলে অনেক ক্ষেত্রে চিনির ব্যবহার কমানো সম্ভব হয়। বিশেষ করে টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের রক্তে সুগারের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে দারুচিনি সহায়তা করে। তবে এটি কোনো ওষুধের বিকল্প নয়; বরং স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এছাড়াও দারুচিনি রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইড ও কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে হার্টের সুরক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে। একইসঙ্গে শরীরের বিভিন্ন প্রদাহ কমাতে এবং কোষকে সুরক্ষা দিতে সাহায্য করে। পাশাপাশি কিছু ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে এবং অ্যালঝেইমার ও পারকিনসনস রোগের ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রেও দারুচিনি কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে।
রসুন
রসুনকে আমাদের হৃদপিণ্ডের এক বিশ্বস্ত প্রহরী বলা চলে। রসুনে অ্যালিসিন নামক একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান রয়েছে, যা স্বাস্থ্য সুরক্ষায় শক্তিশালী ভূমিকা পালন করে। রসুনের কোয়া কুঁচি করে কেটে বা থেঁতলে কিছুক্ষণ রেখে দিলে অ্যালিসিন নিঃসৃত হয়।
রসুনকে প্রাকৃতিক অ্যান্টিবায়োটিক বলা যেতে পারে। এটি হার্টকে সুস্থ রাখতে এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করতে পারে। এছাড়া রসুন রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং কিছু কিছু ক্যানসার কোষের বৃদ্ধি প্রতিরোধে সহায়ক।
কালোজিরা
ছোট্ট কালো দানার এই মসলাটি দীর্ঘদিন ধরে ওষুধি গুণের জন্য পরিচিত। কালোজিরার প্রধান উপাদান থাইমোকুইনোন। এটি শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী করতে সাহায্য করতে পারে।
পাকস্থলীতে আলসারের অন্যতম কারণ হলো হেলিকোব্যাক্টার পাইলোরি ব্যাকটেরিয়া। কালোজিরা এই ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে কাজ করে এবং অ্যান্টিআলসারেন্ট হিসেবে কাজ করে।
এছাড়াও কালোজিরা হাঁপানি, অ্যাজমা, কাশি ও শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় বেশ উপকারী। এর অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ও অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল বৈশিষ্ট্য বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সাহায্য করে। কালোজিরা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে, কিডনির সুরক্ষায় এবং নাকের অ্যালার্জি কমাতেও ভূমিকা রাখতে পারে।
কালোজিরা ক্ষুধা কমায়, যা ওজন নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করতে পারে। এছাড়া এতে আয়রন ও ক্যালসিয়াম রয়েছে, যা স্তন্যদানকারী মায়েদের দুধ উৎপাদন বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।
লবঙ্গ
ছোট্ট লবঙ্গটি দেখতে অনেকটা পেরেকের মতো। আর এটি আমাদের শরীরের বিভিন্ন জীবাণুকেও ঠিক সেভাবেই আটকে দেয়। এতে উপস্থিত ইউজেনল নামক উপাদান প্রাকৃতিক ব্যথানাশক হিসেবে কাজ করে।
দাঁতের তীব্র ব্যথা বা মাড়ির সংক্রমণে লবঙ্গ দ্রুত আরাম দিতে পারে। মুখে একটি লবঙ্গ রাখলে দুর্গন্ধ কমার পাশাপাশি শুকনো কাশিও কমে যায়।
লবঙ্গে অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এছাড়া এটি রক্তে সুগারের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। পাশাপাশি আমাদের যকৃত, হাড় ও পাকস্থলীর সুস্থতা বজায় রাখতেও ভূমিকা রাখে।
