এআই কি আমাদের দক্ষতা কেড়ে নিচ্ছে

রকিবুল হাসান
রকিবুল হাসান

আমার বয়স ৫৬। আমাদের তরুণ বয়সে কর্মজীবনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ছিল না বলে অফিসের ‘বোরিং’ কাজগুলোই করতে হতো। এখন বুঝি, একজন মানুষের ক্যারিয়ার গড়ে তোলের জন্য সেগুলো খুব দরকারি।

মিটিংয়ের কার্যবিবরণী লেখা, তথ্য যাচাই করা, স্লাইড তৈরি, বানান ঠিক করা—এ ধরনের কাজ করতে করতে একজন মানুষ আসলে শিখছে। কোথায় ভুল হয়, কোন নম্বরটা অস্বাভাবিক, কোন যুক্তি দুর্বল—এমন সূক্ষ্ম জিনিসগুলো তার মাথায় গেঁথে যাচ্ছে।

এখন এআই এই কাজগুলো করে দিচ্ছে সেকেন্ডের মধ্যেই। দেখতে ভালোই লাগছে। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়। মানুষ আর শিখছে না।

একটা উদাহরণ দিই। একজন জুনিয়র কনসালট্যান্ট ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে একটা প্রস্তাবনা বানাচ্ছে। সে ভুল করছে, ঠিক করছে, আবার ভুল করছে। এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সে শিখছে যে কীভাবে চিন্তা করতে হয়, কীভাবে সব সাজাতে হয়।

এখন সে এআইকে বলছে একটি প্রস্তাবনার খসড়া সাজিয়ে দিতে। এরপর সে সেটাকে হালকা ঘষেমেজে চূড়ান্ত করে ফেলছে। কাজটা হচ্ছে, কিন্তু শেখাটা হচ্ছে না।

হোয়াইট কলার কর্মীদের বেলায় নিয়মিত কাজেও এআইয়ের ওপর পূর্ণ নির্ভরশীলতা মানুষের বিবেচনা, পদ্ধতি বোঝার দক্ষতা, পেশাদার অন্তর্দৃষ্টি ধীরে ধীরে দুর্বল করে দিচ্ছে।

২০২৫ সালে মাইক্রোসফট রিসার্চ এবং কার্নেগি মেলন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব নলেজ ওয়ার্কার এআই ব্যবহার করছেন, তারা বলছেন কাজটা অনেক সহজ মনে হচ্ছে। কিন্তু আসলে তারা ধীরে ধীরে সমস্যা সমাধানের দক্ষতাটা এআইয়ের হাতে তুলে দিচ্ছেন। নিজেরা শুধু আউটপুট গুছিয়ে নেওয়ার কাজটা করছেন।

মজার বিষয় হলো, এই সময়ে তাদের এআইয়ের ওপর আস্থা বাড়ছে। মানে ব্যক্তি-দক্ষতা কমছে, কিন্তু আত্মবিশ্বাস বাড়ছে। এ এক বিপজ্জনক সমন্বয়।

২০২৫ সালে ল্যানসেট জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব চিকিৎসক কোলোনোস্কপিতে নিয়মিত এআই সাপোর্ট ব্যবহার করতেন, হঠাৎ সেই সাপোর্ট না পেলে তাদের পারফরম্যান্স খারাপ হচ্ছে। ক্যানসার-পূর্ব টিস্যু শনাক্তের হার ২৮ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে নেমে আসে ২২ দশমিক ৪ শতাংশে।

তবে একটু আশার কথাও আছে। জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলী বা অভিজ্ঞ কর্মীরা এআই ব্যবহার করে আরও ভালো করছেন। কারণ, তাদের ভিত্তিটা আগে থেকেই তৈরি। এআই তাদের উৎপাদনশীলতা বাড়াচ্ছে।

কিন্তু একই কাজ নতুন কর্মীদের ক্ষতি করছে। কারণ, তারা বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কাজ করে শেখার সুযোগটাই পাচ্ছে না।

আসল বিপদটা হলো, এই দুর্বলতা সহজে ধরা পড়ে না। এআই একটা আর্থিক বিবরণী বানাল। ভেতরে একটা সূক্ষ্ম অনুমানের ভুল আছে। কিন্তু যে এই বিবরণী দেখছে, সে কখনো নিজে এই কাজ করেনি। তাই তার কাছে কিছুই ‘অস্বাভাবিক’ মনে হচ্ছে না। এই ভুলটা পাস হয়ে গেলেই ভবিষ্যতে কোম্পানিটা বিপদে পড়বে।

এটাকে অর্থনীতিবিদরা বলছেন ডি-স্কিলিং বা দক্ষতা হ্রাস। প্রযুক্তি যখন মানুষের দক্ষতার জায়গা নিয়ে নেয়, তখন সেই কাজটা সাধারণ চেকবক্সে পরিণত হয়। বিচারবুদ্ধি লাগে না, অভিজ্ঞতা লাগে না। ফলে পুরো প্রফেশনটাই দুর্বল হয়ে যায়।

মনে হতে পারে এখানে বুঝি সমস্যাটা এআই। আসলে সমস্যাটা এআই না। সমস্যাটা হলো এআইয়ের ওপর অন্ধভাবে নির্ভর করা। ক্যালকুলেটর আসার পরেও আমরা বাচ্চাদের অংক শেখাই। কারণ, অংকের লজিকটা মাথায় না থাকলে ক্যালকুলেটরের ভুল ধরা যাবে না। এআইয়ের বেলায়ও একই কথা।

এআই বোদ্ধা হিসেবে আমার কথা, এআই ব্যবহার করুন, কিন্তু বুঝে।

 

রকিবুল হাসান টেলিকম, অটোমেশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাবিষয়ক ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় মানবিক রাষ্ট্র’ বইয়ের লেখক