বিশ্রাম, অলসতা ও নতুন শ্রম ধারণা: কর্ম-সংস্কৃতির নীরব বদল
বাংলাদেশে ছুটির খবর সবসময়ই এক ধরনের সামাজিক উল্লাস তৈরি করে। বিশেষ করে ঈদের দীর্ঘ ছুটি যেন আমাদের কর্মজীবনের এক অলিখিত উৎসব। এবারও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে টানা সাত দিনের ছুটি ঘোষণা করতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে চায়ের আড্ডা সবখানেই যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস।
সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি অফিস ২৫ মে থেকে ৩১ মে পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। খবরটি অনেকের কাছে আনন্দের, কারো কাছে ভ্রমণের পরিকল্পনা, আবার কারো কাছে বিশ্রামের মহাউৎসব।
কিন্তু এই দীর্ঘ ছুটির উচ্ছ্বাসের মধ্যেই নীরবে একটি প্রশ্ন সামনে আসে। আমরা কি সত্যিই কাজের চেয়ে বিশ্রামকে বেশি ভালোবাসতে শুরু করেছি? নাকি বদলে যাওয়া বিশ্ব-বাস্তবতায় আমাদের কর্ম-সংস্কৃতিই নিঃশব্দে পাল্টে যাচ্ছে?
কোভিড-পরবর্তী পৃথিবী, ডিজিটাল অফিস, ওয়ার্ক ফ্রম হোম, অনলাইন মিটিং, আর সার্বক্ষণিক সংযুক্ত জীবনের ভেতর দাঁড়িয়ে বাঙালির কর্ম-সংস্কৃতির চিত্র এখন আগের মতো নেই। বাইরে থেকে স্থির মনে হলেও ভেতরে ভেতরে ঘটছে এক নীরব রূপান্তর।
‘দিনভর বিশ্রামেই ক্লান্ত’। বাক্যটি শুনতে কৌতুকের মতো লাগলেও এর ভেতরে আজকের বাঙালির কর্ম-সংস্কৃতির এক গভীর সংকট লুকিয়ে আছে। আমরা এমন এক সমাজে বাস করছি, যেখানে কাজের চেয়ে কাজের অভিনয় অনেক সময় বেশি দৃশ্যমান। আবার অন্যদিকে এমনও অসংখ্য মানুষ আছেন, যারা সীমাহীন পরিশ্রম করেও কাঙ্ক্ষিত স্বীকৃতি বা জীবনমান পান না।
সরকারি অফিসের ঢিলেঢালা পরিবেশ, চাকরির নিশ্চিন্ত আরাম, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার সংস্কৃতি, বেসরকারি চাকরির অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, ডিজিটাল শ্রমের অদৃশ্য চাপ এবং কোভিড-পরবর্তী ওয়ার্ক ফ্রম হোম, সব মিলিয়ে আমাদের কর্মজীবনের ধারণাই পাল্টে গেছে। বাংলাদেশে এই প্রশ্নটি আবার আলোচনায় এসেছে।
রোজার সময়সূচি অনুযায়ী সকাল ৯টার আগেই প্রধানমন্ত্রী সচিবালয়ে উপস্থিত হওয়ায় অনেকেই বিস্মিত হয়েছিলেন। একজন প্রধানমন্ত্রীর সময়মতো অফিসে আসা যদি ‘অভিভূত হওয়ার’ ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে বুঝতে হবে আমাদের প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে সময়নিষ্ঠা কতটা ব্যতিক্রমী হয়ে গেছে। অথচ রাষ্ট্রযন্ত্রের শীর্ষ ব্যক্তি যদি সময়ানুবর্তিতার দৃষ্টান্ত তৈরি করেন, সেটি নিচের স্তরে কিছুটা হলেও মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
বাংলাদেশে সরকারি চাকরি দীর্ঘদিন ধরেই ‘নিরাপদ আশ্রয়’ হিসেবে বিবেচিত। সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি প্রচলিত ধারণা আছে, সরকারি দপ্তরে সময়মতো কেউ আসে না, কাজের গতি ধীর, ফাইলের চেয়ে চায়ের কাপ বেশি ঘোরে। ধারণাটি পুরোপুরি অসত্য নয়। বিশেষ করে ছুটির আগে বা উৎসবকেন্দ্রিক সময়গুলোতে সরকারি অফিসের কর্মচাঞ্চল্য প্রায় অদৃশ্য হয়ে যায়। কিন্তু এই চিত্রের পেছনে শুধু কর্মচারীর আলস্যকে দায়ী করলে বাস্তবতা আড়াল হয়।
একজন সরকারি কর্মচারী যদি প্রতিদিন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির মধ্যে অর্ধাহারে জীবনযাপন করেন, ভাঙা বাস বা ঝুলন্ত টেম্পোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যাতায়াত করে অফিসে পৌঁছান, তাহলে তিনি কতটা উদ্যম নিয়ে আট ঘণ্টা রাষ্ট্রকে শ্রম দিতে পারবেন? রাষ্ট্র কি তাকে এমন একটি কর্মপরিবেশ দিতে পেরেছে, যেখানে কাজের প্রতি স্বতঃস্ফূর্ত দায়বদ্ধতা তৈরি হয়? প্রণোদনা, সম্মান, দক্ষতার মূল্যায়ন কি বাস্তবেই কার্যকর?
আমাদের কর্ম-সংস্কৃতির বড় সমস্যা হলো, এখানে শ্রমের মর্যাদা নিয়ে আমরা মুখে যত কথা বলি, বাস্তবে ততটা বিশ্বাস করি না। কৈশোরে পড়েছি, বিশ্রাম কাজের অঙ্গ। কিন্তু আমাদের সমাজে অনেক সময় বিশ্রামই যেন মূল কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা কাজের শক্তি সঞ্চয়ের জন্য বিশ্রাম নেই না, বরং বিশ্রামের সুযোগ তৈরি করার জন্যই নানা ব্যস্ততা তৈরি করি। এই মানসিকতা কেবল ব্যক্তিগত নয়, প্রাতিষ্ঠানিকও।
অথচ পৃথিবীর উন্নত শ্রম-সভ্যতাগুলোর ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে কাজের মর্যাদার ওপর। সোভিয়েত রাশিয়ায় বলা হতো, ‘কর্মই আত্মসম্মানের ভিত্তি।’ জাপানে কর্মপাগল সংস্কৃতি প্রায় জাতীয় পরিচয়ের অংশ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে জাপান উঠে দাঁড়িয়েছিল শ্রমশক্তির শৃঙ্খলা দিয়ে। সেখানে সময়ানুবর্তিতা কেবল অফিস নীতি নয়, সামাজিক নৈতিকতা।
কর্ম-সংস্কৃতির সংকট শুধু সরকারিখাতে সীমাবদ্ধ নয়। বেসরকারিখাতে আবার উল্টো চিত্র। এখানে ‘অতিরিক্ত কাজ’ যেন দক্ষতার পরিচয়। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) বহু আগেই বলেছে, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। মানুষ যন্ত্র নয়। দীর্ঘ সময় কাজ করলে মনোযোগ কমে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দুর্বল হয়, ভুল বাড়ে। কিন্তু বাংলাদেশে ওভারটাইম এখন ব্যতিক্রম নয়, অনেক ক্ষেত্রে নিয়মে পরিণত হয়েছে।
বিশেষ করে করপোরেট ও প্রযুক্তিনির্ভর চাকরিতে ‘সর্বক্ষণ অনলাইন’ থাকার এক অদৃশ্য সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। অফিস শেষ হলেও কাজ শেষ হয় না। মুঠোফোন, মেইল, ভিডিও মিটিংসহ নানা কাজে সবসময় কর্মীকে সংযুক্ত থাকতে হয়। কোভিড-পরবর্তী ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ এই বাস্তবতাকে আরও জটিল করেছে।
কোভিড-পরবর্তী কর্ম-সংস্কৃতিকে ব্যাখ্যা করতে গেলে ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকোর ‘প্যানঅপটিকন’ তত্ত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফুকো বলেছিলেন, আধুনিক সমাজে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করা হয় দৃশ্যমান নজরদারির মাধ্যমে। একসময় অফিসে বস, হাজিরা খাতা কিংবা সিসিটিভি ছিল সেই নিয়ন্ত্রণ-ব্যবস্থার প্রতীক। কিন্তু কোভিডের পর এই নজরদারি ডিজিটাল রূপ নিয়েছে। এখন কর্মীকে অনলাইনে সক্রিয় থাকা, দ্রুত জবাব দেওয়া, ভার্চুয়াল মিটিংয়ে উপস্থিত থাকা কিংবা বিভিন্ন সফটওয়্যারের মাধ্যমে কাজের গতিবিধি জানান দিতে হয়। অর্থাৎ অফিসের শারীরিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বদলে গিয়ে তৈরি হয়েছে এক ধরনের ‘ডিজিটাল প্যানঅপটিকন’, যেখানে কর্মী সারাক্ষণ অদৃশ্য প্রযুক্তিগত নজরদারির মধ্যে অবস্থান করছে।
একইসঙ্গে কার্ল মার্ক্সের এলিয়েনশন থিওরি বা বিচ্ছিন্নতার তত্ত্বও কোভিড-পরবর্তী কর্ম-সংস্কৃতি বোঝার ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক। মার্ক্স বলেছিলেন, পুঁজিবাদী সমাজে শ্রমিক ধীরে ধীরে তার শ্রম, উৎপাদন ও ব্যক্তিগত জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
ওয়ার্ক ফ্রম হোম সংস্কৃতি এই বিচ্ছিন্নতাকে আরও জটিল করেছে। আগে অফিস ও ব্যক্তিগত জীবনের একটি স্পষ্ট সীমারেখা ছিল। এখন সেই সীমা প্রায় বিলীন। ঘরই অফিসে পরিণত হয়েছে। ফলে কর্মীকে দিন-রাত সবসময় কাজের জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়। কাজের সময় শেষ হলেও মানসিকভাবে কাজ শেষ হয় না। এই পরিস্থিতি তৈরি করেছে নতুন ধরনের ডিজিটাল ক্লান্তি ও মানসিক অবসাদ, যেখানে মানুষ নিজের ঘরেও অফিসের চাপ থেকে পুরোপুরি মুক্ত হতে পারছে না।
একসময় বাঙালি অফিস মানেই বুঝত নির্দিষ্ট ভবন, নির্দিষ্ট টেবিল, হাজিরা খাতা আর বিকেল ৫টার ছুটি। কিন্তু বিশ্বায়ন ও প্রযুক্তি সেই ধারণা ভেঙে দিয়েছে। এখন ঢাকার একজন তরুণ রাত ২টায় নিউইয়র্কের টিমের সঙ্গে মিটিং করছেন, আবার সকালে সিঙ্গাপুরের ক্লায়েন্টের জন্য রিপোর্ট পাঠাচ্ছেন। বাসা ও অফিসের সীমানা মুছে গেছে। কাজের সময়ও আর নির্দিষ্ট নেই।
এই নতুন সংস্কৃতিকে কি আমরা ‘আধুনিক কর্ম-দাসত্ব’ বলব, নাকি ‘ডিজিটাল স্বাধীনতা’? উত্তর সহজ নয়। ওয়ার্ক ফ্রম হোম একদিকে যাতায়াতের সময় ও খরচ কমিয়েছে, পরিবারকে সময় দেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে; অন্যদিকে কর্মঘণ্টাকে অস্পষ্ট করে তুলেছে। আগে অফিসের দরজা পেরোলেই কাজ শেষ হতো। এখন কাজ মানুষের ব্যক্তিগত ঘরে ঢুকে পড়েছে।
আবার আরেকটি বৈপরীত্যও আছে। বাংলাদেশে অনেক সরকারি অফিসে দক্ষ কর্মচারী আছেন, যারা কাজ করতে চান, কিন্তু তাদের কাজ নেই। দক্ষতাকে ব্যবহারের মতো কাঠামো নেই। অন্যদিকে কোথাও কোথাও অদক্ষতা, রাজনৈতিক আনুগত্য ও দলীয় বিবেচনায় পদোন্নতির সংস্কৃতি কর্মোদ্যম নষ্ট করে দেয়। ফলে একজন মেধাবী কর্মকর্তা ধীরে ধীরে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন।
বিশ্ব পরিস্থিতিও আশাব্যঞ্জক নয়। আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, বিশ্বজুড়ে বেকারত্ব, ঝুঁকিপূর্ণ কর্মসংস্থান, শিশুশ্রম ও জোরপূর্বক শ্রম বাড়ছে। অর্থাৎ প্রযুক্তি ও বিশ্বায়নের যুগেও ‘শোভন কাজ’ এখনো সবার নাগালে পৌঁছায়নি। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের কর্ম-সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণায় দেখা গেছে, সপ্তাহে ৫৫ ঘণ্টার বেশি কাজ করলে স্ট্রোক ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে। অর্থাৎ দীর্ঘ কর্মঘণ্টা সবসময় বেশি উৎপাদনশীলতা নিশ্চিত করে না; বরং ক্লান্তি ও মানসিক অবসাদ বাড়ায়।
কোভিড-পরবর্তী সময়ে ওয়ার্ক ফ্রম হোম কর্ম-সংস্কৃতিতে বড় পরিবর্তন এনেছে। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা যায়, বাসা থেকে কাজ উৎপাদনশীলতা কিছুটা বাড়ালেও দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও ডিজিটাল ক্লান্তি তৈরি করছে। একইসঙ্গে অনলাইন নজরদারির সংস্কৃতিও বেড়েছে। মাইক্রোসফটের জরিপ অনুযায়ী, কর্মীরা নিজেদের কার্যকর মনে করলেও অধিকাংশ ম্যানেজার এখনো কর্মীদের উৎপাদনশীলতা নিয়ে সন্দিহান। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার তথ্যে জানা যায়, বিশ্বে প্রায় ১৯ কোটি মানুষ বেকার এবং ১৫০ কোটির বেশি মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ কর্মসংস্থানে রয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে সরকারি চাকরি এখনো তরুণদের কাছে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ পেশা হিসেবে বিবেচিত হয়।
তবে বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, শ্রমঘন শিল্প বাড়লেও বাংলাদেশের শ্রম উৎপাদনশীলতা এখনো অনেক দেশের তুলনায় কম। ফলে এখন কেবল কর্মঘণ্টা নয়, কাজের গুণগত মান ও ফলাফলই কর্ম-সংস্কৃতির নতুন আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠছে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ডাকঘর নাটকে অমল ও প্রহরীর সংলাপটি সময়ের রহস্য ও মানবিক উপলব্ধিকে এক অসাধারণ প্রতীকে তুলে ধরে—
অমল: তুমি ঘণ্টা বাজাবে না প্রহরী?
প্রহরী: এখনো সময় হয়নি!
অমল: কেউ বলে সময় বয়ে যাচ্চে, কেউ বলে সময় হয়নি। আচ্ছা তুমি ঘণ্টা বাজিয়ে দিলেইত সময় হবে।
প্রহরী: সে কি হয়? সময় হলে তবে আমি ঘণ্টা বাজিয়ে দিই।
এই সংলাপে রবীন্দ্রনাথ আসলে সময়ের এক গভীর কুহেলিকাকে ধরতে চেয়েছেন। অমলের সরল বিশ্বাস ‘ঘণ্টা বাজালেই সময় হবে’ মানুষের সেই চিরন্তন প্রবণতার প্রতীক, যেখানে আমরা বাহ্যিক ঘটনাকেই সময়ের নিয়ন্ত্রক মনে করি। অথচ প্রহরী জানিয়ে দেয়, মানুষ সময় সৃষ্টি করে না। সময় নিজস্ব নিয়মে প্রবাহিত হয়, মানুষ কেবল তার ঘোষণা দেয়। ঘণ্টাধ্বনি তাই সময়ের জন্ম নয়, তার উপস্থিতির ইঙ্গিতমাত্র।
আধুনিক কর্ম-সংস্কৃতির ভেতরেও এই বিভ্রম স্পষ্ট। কেউ মনে করে অফিসে বসে থাকাই কাজ, কেউ ভাবে অনলাইনে সক্রিয় থাকাই উৎপাদনশীলতা। কিন্তু সময় তার নিজস্ব গতিতেই বয়ে যায়। মানুষ কেবল তার ভেতরে শ্রম, বিশ্রাম ও জীবনের অর্থ খুঁজে ফেরে।
আমাদের মূল সংকট সম্ভবত কাজের সময় নয়, কাজের দর্শনে। আমরা এখনো শ্রমকে মর্যাদা দেওয়ার চেয়ে চাকরিকে মর্যাদা দেই বেশি। কাজ নয়, পদমর্যাদা—এটিই সামাজিক সম্মানের প্রধান মাপকাঠি হয়ে উঠেছে। ফলে কর্মদক্ষতার চেয়ে চাকরির নিরাপত্তা, প্রভাব ও সুবিধা বড় হয়ে ওঠে।
একটি সুস্থ কর্ম-সংস্কৃতি গড়ে উঠতে হলে কেবল অফিস সময় কঠোর করলেই হবে না; প্রয়োজন ন্যায়সঙ্গত মূল্যায়ন, কাজের স্বীকৃতি, উপযুক্ত বেতন, মানসম্মত যাতায়াত, মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব ও দক্ষতাভিত্তিক পুরস্কার ব্যবস্থা। একইসঙ্গে দরকার ‘কম কাজ করাই বুদ্ধিমত্তা’, এই সামাজিক ধারণা থেকে বেরিয়ে আসা। কারণ শেষ পর্যন্ত সভ্যতার অগ্রগতি বিশ্রামের ওপর নয়, শ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। বিশ্রাম প্রয়োজন; কিন্তু বিশ্রামের জন্য জীবন নয়, জীবনের জন্যই কাজ।
শেষ পর্যন্ত হয়তো বাঙালির কর্ম-সংস্কৃতিকে পুরোপুরি অলসতা বলে উড়িয়ে দেওয়াও ঠিক হবে না। কারণ, পৃথিবীর বহু বড় আবিষ্কারের পেছনেও নাকি অলস মানুষের হাত ছিল। কথিত আছে, অলস মানুষই সবচেয়ে শর্টকাট বুদ্ধি বের করে। কম হাঁটতে চাকা বানায়, কম উঠতে রিমোট বানায়, আর কম অফিস করতে গিয়ে আবিষ্কার করে ওয়ার্ক ফ্রম হোম।
বাঙালিও হয়তো সেই ধারারই উত্তরসূরি। সে কম কাজ করে বেশি বাঁচতে চায়। আবার কম ঘাম ঝরিয়ে বড় সফলতার স্বপ্নও দেখে। সমস্যা হলো, সব অলস মানুষ সৃজনশীল নয়, কিন্তু সব সৃজনশীল মানুষের ভেতরে একটু অলসতা থাকে। তাই আমাদের কর্ম-সংস্কৃতির ভবিষ্যৎ হয়তো নির্ভর করছে এই সূক্ষ্ম পার্থক্যটা বোঝার ওপর—আমরা কি সত্যিই সৃজনশীলভাবে কম কাজ করতে চাই, নাকি কাজ এড়ানোর সৃজনশীল অজুহাত খুঁজছি!
রাজীব নন্দী: সহযোগী অধ্যাপক, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
rajibnandy@cu.ac.bd