ভারতে জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে ধর্মীয় রাজনীতির উত্থান, বিস্তার ও ভবিষ্যৎ

তরুন ইউসুফ, কবি ও কলামিস্ট
তরুন ইউসুফ

পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির করতলগত হলো। অনেকদিন ধরেই এই ধরনের একটা আলামত ও আলোচনা ছিল, বিশেষ করে ২০২১ সালে মমতা ব্যানার্জি তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আসার পর থেকেই।

২০২১ সালের নির্বাচনে বিজেপি খুব বেশি সুবিধা করতে না পারলেও ভোটের শতকরা হারে অনেকাংশে এগিয়ে তৃণমূলের ঘাড়ে নিশ্বাস ফেলছিল, সেটা অনেক বিশ্লেষকই বলেছেন।

যদিও এই আলামতকে তৃণমূল কংগ্রেস এবং দলের বুদ্ধিজীবী ও মিডিয়া মহল কখনই সেভাবে স্বীকার করেননি বা করতে চাননি। কিন্তু, মানুষের মনোজগত ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়ে বিজেপির পরিবর্তনের ডাকে সারা দিয়েছে। যার ফল এবারের নির্বাচনে দেখা গেছে।

২০২১ সালের নির্বাচনে বিজেপির আসন সংখ্যা ছিল ৭৭টি। এবার সেটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০৬টি। অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেস ২১৩টির জায়গায় এবার পেয়েছে ৮৬টি আসন। ভোটের শতকরা হিসাবে বিজেপি ৪৬ শতাংশ ও তৃণমূল ৪১ শতাংশ পেয়েছে। গত নির্বাচনের চেয়ে এবার বিজেপির ভোট বেড়েছে আট শতাংশ।

বিজেপির নেতাকর্মীরা যতগুলো আসন পাওয়ার আভাস দিয়েছিলেন, তাদের প্রাপ্তি সে তুলনায় অনেক বেশি।

পশ্চিমবঙ্গে এই পরিবর্তনতে বলা যায় প্যারাডাইম শিফট। অর্থাৎ মধ্যপন্থী থেকে ডানপন্থী পশ্চিমবঙ্গে রূপান্তর। মধ্যপন্থীতে রূপান্তরিত হওয়ার আগে পশ্চিমবঙ্গ ছিল বামপন্থী।

মধ্য থেকে ডানে রূপান্তরের এই প্রক্রিয়াটা একদিনে যেমন হয়নি, তেমনি এর কারণও বহুমাত্রিক। এখানে শাসক দলের রাজনৈতিক ব্যর্থতা যেমন দায়ী, তেমনি দায়ী সংখ্যালঘুদের বিশেষত মুসলিম ভোটারদের আবেগ কাজে লাগিয়ে জেতা ও ক্ষমতায় থাকার কৌশল। এর বিপরীতে ভারতজুড়ে উত্থান ঘটেছে হিন্দুত্ববাদী মেরুকরণ বা সংখ্যাগুরুর পরিচিতি নিয়ে রাজনীতি।

সংখ্যালঘু পরিচয় নিয়ে রাজনীতি সাময়িকভাবে কিছুটা কাজ করলেও সেটা দীর্ঘমেয়াদে দুর্বল হয়ে পরে। যারা এ ধরনের রাজনীতি করে একসময় এটাই তাদের পরাজয়ের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সেইসঙ্গে রাজনৈতিক ব্যক্তি ও দলের চেয়েও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সেই সংখ্যালঘু গোষ্ঠী, যাদের আবেগকে কাজে লাগিয়ে রাজনীতি করা হয়।

এই রাজনীতি সংখ্যালঘুদের সরাসরি সংখ্যাগুরুদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। ফলে সংখ্যাগুরুদের মনে ধীরে ধীরে ক্রোধ জমতে থাকে। ধর্মকে কেন্দ্র করে যারা রাজনীতি করে, তাদের জন্য এই ক্রোধকে পূঁজি করা সহজ হয়। একপর্যায়ে তারা সফল হয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় চলে আসে এবং সংখ্যালঘুদের বিপদ তখন প্রকাশ্য হয়। তথাকথিত সুবিধাজনক অবস্থান থেকে তারা সবচেয়ে প্রান্তিক ও অরক্ষিত অবস্থানে চলে যায়। এই রাজনীতি তাদের প্রকৃত নাগরিকের পরিবর্তে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত করে।

রাজনীতিতে সংখ্যাগুরু পরিচিতি ব্যবহার নিয়ে আলোচনা করতে গেলে একটি মৌলিক বিষয় আগে পরিষ্কার করা দরকার। এই ধরনের রাজনীতি হঠাৎ উদ্ভূত ঘটনা নয়। বরং দীর্ঘ সময় ধরে জমে থাকা রাজনৈতিক কৌশল, সামাজিক অভিজ্ঞতা, অর্থনৈতিক অসন্তোষ ও মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়ার সম্মিলিত ফল এটি।

ভারত, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন এই বাস্তবতাকে স্পষ্টভাবে সামনে এনেছে। ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী ছিল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস (কংগ্রেস)। তারা নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষতার ধারক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একটি ধারণা সমাজে ছড়িয়ে পড়ে যে, সরকার সংখ্যালঘুদের প্রতি বিশেষভাবে সহানুভূতিশীল।

এর বাস্তবতা যতটা, তারচেয়ে এই ধারণাটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই ধারণাই ধীরে ধীরে সংখ্যাগুরুদের মধ্যে এক ধরনের বঞ্চনার অনুভূতি তৈরি করে, যা পরবর্তীতে রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত হয়।

এই জায়গাতেই উত্থান ঘটে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) মতো সংগঠনের, যারা এই ক্ষোভকে সাংগঠনিক রূপ দিতে সক্ষম হয়। কিন্তু এটাকে শুধুমাত্র প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক প্রক্রিয়া, যেখানে সাংস্কৃতিক নিরাপত্তাহীনতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

আমাদের ইতিহাসকে খাটো করা হচ্ছে, আমাদের সংস্কৃতি হুমকির মুখে—এই ধরনের বয়ান ধীরে ধীরে জনমনে জায়গা করে নেয়। ধর্মীয় রাজনীতি এই অনুভূতিকে সংস্কৃতি রক্ষার সংগ্রাম হিসেবে ফ্রেম করে এবং সেটিকেই রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত করে।

এই প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে রাজনৈতিক শূন্যতা। যখন কংগ্রেস নেতৃত্ব সংকট, দুর্নীতি ও সাংগঠনিক দুর্বলতায় ভুগতে থাকে, তখন বিকল্প শক্তির জন্য জায়গা তৈরি হয়। নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি এই শূন্যতাকে শুধু পূরণই করেনি, বরং নতুন রাজনৈতিক ধারায় রূপ দিয়েছে। এখন সেখানে পরিচয়, উন্নয়ন ও শক্তিশালী নেতৃত্ব—এই তিনটি উপাদান একসঙ্গে কাজ করেছে।

ফলে ২০১৪ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত মোদির নেতৃত্বে বিজেপি রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন। শুধু তাই নয় রাজ্য পর্যায়েও তাদের ক্ষমতা ধারাবাহিকভাবে বিস্তৃত হচ্ছে।

পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘদিনের বাম শাসনের পর তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসে এবং দ্রুতই বড় আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত হয়। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তৃণমূলের বিরুদ্ধেও দুর্নীতি, দলীয় দাপট ও প্রশাসনিক পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ ওঠে। একইসঙ্গে এই ধারণা ছড়িয়ে পড়ে যে সংখ্যালঘু ভোটব্যাংক ধরে রাখতে দলটি বিশেষ নীতি অনুসরণ করছে।

এই ধারণাকে কাজে লাগিয়ে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে নিজেদের অবস্থান শক্ত করে। বিশেষ করে ২০২১ সালের নির্বাচনে তারা যে ৭৭টি আসন পায়, তা কেবল সাংগঠনিক বিস্তার বা প্রচারের ফল নয়; বরং দীর্ঘদিনের জমে থাকা অসন্তোষ, বিরোধী শূন্যতা ও ধর্মীয় মেরুকরণের সম্মিলিত প্রতিফলন।

উত্তরবঙ্গ, জঙ্গলমহল বা প্রান্তিক অঞ্চলগুলোতে বিজেপির সাফল্য দেখিয়েছে যে অর্থনৈতিক বঞ্চনা ও পরিচয়ের রাজনীতি অনেক সময় একে অপরকে শক্তিশালী করে।

এখানে অর্থনৈতিক ও সামাজিক হতাশার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। বেকারত্ব, আঞ্চলিক বৈষম্য বা উন্নয়নের অসম বণ্টনের মতো সমস্যা যখন দীর্ঘদিন অমীমাংসিত থাকে, তখন মানুষ সহজ ব্যাখ্যা খোঁজে। রাজনৈতিক বয়ান তখন অনেক সময় এই জটিল সমস্যাগুলোকে অন্য কোনো গোষ্ঠীর উপস্থিতির সঙ্গে যুক্ত করে, যা পরিচিতি নিয়ে রাজনীতিকে আরও গ্রহণযোগ্য করে তোলে।

মিডিয়া ও ন্যারেটিভ নির্মাণ এই পুরো প্রক্রিয়াকে গতি দেয়। টেলিভিশন বিতর্ক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক প্রচারের মাধ্যমে একটি ধারাবাহিক গল্প তৈরি হয়, যেখানে সংখ্যাগুরুদের বঞ্চিত হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।

এই পুনরাবৃত্ত বয়ান মানুষের চিন্তায় গভীর প্রভাব ফেলে এবং ধীরে ধীরে সেটিই বাস্তবতার জায়গা দখল করে নেয়। ফলে একটি প্রতিক্রিয়াশীল চক্র তৈরি হয়। সংখ্যালঘু পরিচয়ে রাজনীতি করলে সংখ্যাগুরুদের মনে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। আবার সেই প্রতিক্রিয়া সংখ্যালঘুদের মধ্যে ভীতি বাড়ায়। সবমিলিয়ে নতুন মেরুকরণকে ত্বরান্বিত করে।

ভারত ও পশ্চিমবঙ্গ উভয় ক্ষেত্রেই এই চক্রের লক্ষণ দেখা যায়। যদিও এর রূপ ও মাত্রা ভিন্ন।

এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে আগে যে প্রশ্নটি সামনে আসে তা হলো, সংখ্যালঘুদের অবস্থান কী হবে?

এ ধরনের রাজনীতিতে রাষ্ট্র ও সমাজের ভেতরে ‘আমরা বনাম তারা’ বিভাজন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এর ফলে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা, সামাজিক আস্থার সংকট ও অর্থনৈতিক সুযোগে বৈষম্যের আশঙ্কা বাড়ে। অনেক ক্ষেত্রে তারা নিজেদের মতপ্রকাশ বা নাগরিক অংশগ্রহণে সতর্ক হয়ে পড়ে, যা গণতান্ত্রিক পরিবেশকে দুর্বল করতে পারে।

ভারতের প্রেক্ষাপটে হিন্দুত্ববাদকেন্দ্রীক পরিচয়ের রাজনীতি একেবারে নতুন নয়। তবে সম্প্রতি এটি আরও সংগঠিত রূপ পেয়েছে।

প্রশ্ন হলো, ভারত কি এই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে?

ইতিহাস বলছে, কোনো পরিচয়ের ভিত্তিতে যে রাজনীতি হয় তা স্থায়ী হয় না। সময়ের সঙ্গে অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি ও শাসনব্যবস্থার বাস্তবতাই বড় ইস্যু হয়ে ওঠে। যখন ভোটাররা জীবনযাত্রার উন্নতি নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তখন রাজনৈতিক দলগুলোও বাধ্য হয় পরিচয়ের বাইরে গিয়ে ফলাফল দেখানোর রাজনীতিতে মনোযোগ দিতে।

তবে এই পরিবর্তনও হঠাৎ ঘটে না। অর্থাৎ সামনের আরও বেশকিছু সময় ভারতে ধর্মীয় পরিচয়ে রাজনীতির বিস্তার ও প্রভাব নিশ্চিতভাবেই বজায় থাকবে।

এই প্রবণতার আঞ্চলিক প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ভারতের রাজনৈতিক ন্যারেটিভ সরাসরি প্রতিফলিত না হলেও পরোক্ষ প্রভাব পড়বে। সীমান্ত, অভিবাসন বা নিরাপত্তা সংক্রান্ত আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ হবে, যা অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ভাষ্যকেও প্রভাবিত করতে পারে।

মোটকথা ভারতে সংখ্যাগুরু পরিচয়ের রাজনীতির বিস্তার সংখ্যালঘুদের জন্য নিশ্চিতভাবেই ঝুঁকি তৈরি করবে। পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ রাজনীতি, আঞ্চলিক সম্পর্ক ও কূটনীতিতেও এর প্রভাব পড়বে।

তরুন ইউসুফ: কবি ও কলামিস্ট