হামের প্রকোপ এবং বরাবরের মতোই নারীর দোষ

কে এন দেয়া
কে এন দেয়া

‘সব থেকে ভয়াবহ ব্যাপার যেটা সেটা হলো, আমাদের মায়েরা ফিটনেস ধরে রাখার জন্য তাদের সন্তানকে বুকের দুধ পান করান না।’ নিজের কানকে বিশ্বাস না করে ভিডিওটি আবার শুরু থেকে দেখলাম। একবার… দুবার… পাঁচবার।

কথাটি বলা হয়েছে হামে শিশুমৃত্যুর চলমান সঙ্কট নিয়ে। বলেছেন একজন পুরুষ রাজনীতিবিদ।

দেশে কী হচ্ছে না হচ্ছে এ বিষয়ে ন্যুনতম খোঁজ রাখেন, এমন যে কেউ জানেন এই ভয়াবহ পরিস্থিতির ব্যাপারে। প্রতিষ্ঠিত খবরের কাগজ খুললে, অথবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চোখ রাখলেই সামনে আসে হাসপাতালে ভর্তি থাকা শিশুদের ছবি। সেই ছবিতে শিশুর সঙ্গে বেশিরভাগ সময়েই থাকেন তার মা।

সত্যি করে বলুন তো, দুশ্চিন্তায় বিধ্বস্ত নারীটিকে দেখে কখনো মনে হয়েছে, তিনি এতই সৌখিন যে ‘ফিটনেস’ ধরে রাখতে শিশুকে বুকের দুধ পান না করিয়ে ব্যয়বহুল টিনজাত শিশুখাদ্য খাওয়াচ্ছেন?

যেখানে শিশুর সুস্থতা প্রতিটি মায়ের কাম্য, সেখানে শিশু স্বাস্থ্যের এই সংকটে কী করে মায়েদের দিকে আঙ্গুল ওঠে? যেখানে মায়েরা সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মাসের পর মাস অসুস্থ থাকেন, গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস এমনকি প্রাণঘাতী এক্লাম্পশিয়ার মতো পরিস্থিতির শিকার হন, সেখানে তিনি ‘ফিটনেস’ ঠিক রাখতে বাচ্চাকে বুকের দুধ পান করাবেন না? এমন অদ্ভুত ধারণা কী করে তৈরি হয়?

ওই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের বক্তব্যের পর ‘মায়েরা শিশুদের বুকের দুধ পান করায় না, তাই হামে এত শিশু মারা যাচ্ছে’ এমন একটা আলাপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খুব ছড়িয়ে পড়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে চাউর হয়ে গেল ‘মায়ের বুকের দুধ কম খাওয়ানো হাম আক্রান্ত হওয়ার অন্যতম কারণ।’

তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম, ঠিক আছে, এটাই কারণ। কিন্তু, ঠিক কোন তথ্যের ভিত্তিতে ‘বিশেষজ্ঞরা’ মায়েদের ওপর দোষ চাপাচ্ছেন?

১৭ মে নিউ এজ পত্রিকার ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, শিশুদের বুকের দুধ পান করানোর হার কমে আসা, হামের টিকা দেওয়ায় ঘাটতি এবং ভিটামিন-এ দেওয়ায় দেরি করার কারণে বাচ্চাদের পুষ্টির অভাব হয় এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। ফলে শিশুদের মাঝে হামে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বাড়ে।

হামের টিকায় ঘাটতি থাকাটাও একটা কারণ। অথচ সেটাকে পাশ কাটিয়ে দোষ চাপানো হচ্ছে মায়েদের ওপর। হামের টিকা না দিয়ে শুধু মায়ের দুধ পান নিশ্চিত করলেই কি এই হামের প্রকোপ থেকে রেহাই পাওয়া যেত? বিশেষজ্ঞরা ভালো বলতে পারবেন!

কিন্তু মায়েরা কি আসলেই ‘ফিটনেস’ ধরে রাখতে বাচ্চাকে দুধ পান করান না?

নিউ এজের ওই প্রতিবেদনে ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ‘মাল্টিপল ইনডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে ২০২৫’ এর বরাত দিয়ে বলা হয়, বাংলাদেশের বাচ্চাদের ‘সব ধরণের’ বুকের দুধ পান করানো কমেছে। শিশুকে মা শুধুমাত্র বুকের দুধ পান করান; পানি, তরল বা শক্ত খাবার দেন না, এমনটা দেখা গেছে ৫৬ দশমিক ৬ শতাংশ ক্ষেত্রে। তবে শিশুকে কোনো না কোনো সময়ে মা বুকের দুধ পান করিয়েছেন, এমনটা দেখা গেছে ৯৭ দশমিক ৮ শতাংশ ক্ষেত্রে।

এই সার্ভে প্রতিবেদনের কোথাও বলা হয়নি যে ‘ফিটনেস’ ধরে রাখতে মায়েরা বাচ্চাকে বুকের দুধ পান করান না।

গত ১৭ মে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব) আয়োজিত ‘হাম ও ডেঙ্গুরোগ নিয়ন্ত্রণে জনসচেতনতা ও প্রতিরোধই সর্বোত্তম পন্থা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘হাসপাতালগুলোতে গিয়ে দেখেছি, অনেক মা নিজেই অপুষ্টিতে ভুগছেন। ফলে শিশুর শরীরে প্রয়োজনীয় রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হচ্ছে না। অনেক শিশু জন্মের পর শালদুধও পাচ্ছে না।’

যেখানে মায়েরা নিজেরাই ভুগছেন অপুষ্টিতে, সেখানে বাচ্চা বুকের দুধ পাচ্ছে না। এই দোষ মায়ের ওপর দেওয়া কতটুকু যুক্তিসঙ্গত?

নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির কারণে ছোঁয়াচে রোগ হাম বাংলাদেশ থেকে চলেই গিয়েছিল প্রায়। হামে বাচ্চারা আক্রান্ত হলেও তা থেকে সেরে উঠত সহজেই। যে টিকাদান কর্মসূচির কারণে এই সাফল্য, তা এলোমেলো হয়ে যায় বাংলাদেশে ১৮ মাস ক্ষমতায় থাকা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের হস্তক্ষেপে। ফলশ্রুতিতে হামের টিকার মজুদ কমে যায় এবং একটা সময় শেষ হয়ে যায়। গত ৭ মে দ্য ডেইলি স্টারের একটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই তথ্য।

শিশুস্বাস্থ্যের জন্য জরুরি টিকা নিয়ে এমন অব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা চাপা দিতেই কী মায়েদের দোষারোপ করা হচ্ছে? সে প্রসঙ্গে না গেলেও, আর কারো কী কোনো গাফিলতি নেই এই সংকটে?

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বা আইসিইউতে রয়েছে মাত্র ২০টি শয্যা। সেখানেও একটি যন্ত্রাংশে সমস্যা থাকায় হামে আক্রান্ত শিশুর বাবাকে পাঠানো হয় দামী যন্ত্রাংশটি কিনতে। তিনি শহর ঘুরে ঘুরে সেটা কিনে যখন হাসপাতালে ফিরলেন, ততক্ষণে পৃথিবীর মায়া ছেড়ে গেছে শিশুটি।

দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় সংকট আরও তীব্র। যাতায়াতের অসুবিধার কারণে সেখানে টিকা, স্বাস্থ্যসেবা দুটোই পৌঁছাতে অসুবিধা। আর এই অব্যবস্থাপনার দায়ে জীবন যাচ্ছে আদিবাসী শিশুদের।

সমকালে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত আড়াই দশকের সব রেকর্ড ভেঙে গত দুই মাসে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্তের সংখ্যা ৫৫ হাজার ছাড়িয়েছে। এর আগে ২০০০ সালের পর কোনো বছরই হামের সংক্রমণ ৫০ হাজারের ঘর স্পর্শ করেনি।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, চলমান সংকটে ১৭ মে পর্যন্ত দুই মাসে মারা গেছে ৪৫৯ শিশু। এর মধ্যে প্রতিটি মৃত্যুই ঠেকানো যেত, যদি টিকাদান কর্মসূচি নিয়মিত চলত, যদি বিভাগীয় শহরে শিশুদের আইসিইউগুলো ঠিকঠাক-মতো চলত, যদি প্রত্যন্ত এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া হতো গাফিলতি ছাড়াই।

কিন্তু না, দোষ মায়েদের। কারণ, কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহিতা করার চাইতে নারীর দিকে অপবাদের আঙ্গুল তোলা সহজ!

আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, এমনকি নিজের সবচেয়ে কাছের মানুষের থেকেও মায়েদের শুনতে হয় হাজারটা সমালোচনা। বাচ্চা খায় না? মায়ের দোষ। বাচ্চার ঘুম কম হয়? মায়ের দোষ। বাচ্চা কান্নাকাটি করে? মায়ের দোষ!

ইংরেজিতে এর একটা নাম আছে, ‘মম-শেমিং’। বাংলায় এর কোনো জুতসই প্রতিশব্দ নেই। কারণ, মায়ের দোষ দিয়েই সবাই অভ্যস্ত। আলাদা নামে কী আসে যায়!

এসব অভিযোগের থলিতে এখন নতুন করে যুক্ত হলো ‘মা বুকের দুধ পান করায় না বা করায়নি, তাই বাচ্চার অমুক অসুখ হয়েছে’। এই ধারণাটাকে আরও বেশি জনপ্রিয় করে তুলবে কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মন্তব্য এবং কিছু চটকদার হেডলাইন।

আসলেই যারা দোষী, যাদের জবাবদিহি করা জরুরি, তাদের ব্যাপারে সবাই ভুলেই যাবে। আর বরাবরের মতো মায়েরা চুপচাপ সয়ে যাবে অপবাদের বোঝা। মাঝখান দিয়ে লম্বা হবে নিষ্পাপ শিশুদের লাশের মিছিল।

 

কে এন দেয়া: সহ-সম্পাদক, দ্য ডেইলি স্টার