বস্তিবাসীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে প্রয়োজন সমন্বিত পুষ্টি কার্যক্রম

এএসএম রিয়াদ আরিফ, ফাহমিদা দিল ফারজানা, অনুভব চক্রবর্তী, ফুয়াদ আল ফিদাহ

প্রতি বছরের মতো এবারও ২৩ থেকে ২৯ এপ্রিল দেশব্যাপী পালিত হলো ‘জাতীয় পুষ্টি সপ্তাহ ২০২৬’। এ বছর সপ্তাহটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘পুষ্টি বৈষম্যের দিন শেষ, গড়বো স্বনির্ভর বাংলাদেশ’।

একটি স্বনির্ভর দেশ গড়তে চাইলে বৈষম্যের দেয়াল ভেঙে সব নাগরিকের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি চাহিদা নিশ্চিত করতে হবে। কেননা পুষ্টির অভাবে শিশু খর্বকায় হয়, বাধাগ্রস্ত হয় মেধার বিকাশ, কমে যায় সৃজনশীলতা; সেইসঙ্গে বাধাগ্রস্ত হয় দেশের অগ্রগতি ও উন্নয়নের চাকা।

ঢাকা শহরের বস্তিগুলোতে বাস করা বিশাল একটি শ্রেণি তাদের প্রয়োজনীয় পুষ্টি চাহিদা থেকে বঞ্চিত। এটা নগর জনস্বাস্থ্যের জন্য এক গভীর ও ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গত কয়েক দশকে ঢাকাসহ দেশের বড় নগরগুলোতে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মানুষ। কেউ কাজের খোঁজে, কেউবা নদীগর্ভে নিজের ভিটেমাটি হারিয়ে, আবার কেউ ভাগ্য উন্নয়নের পরিক্রমায় এসে দাঁড়িয়েছে এই কংক্রিটের নগরে। এসব মানুষের একটি বড় অংশের ঠাঁই হচ্ছে শহরের বস্তিগুলোতে।

জাতিসংঘের পপুলেশন ডিভিশনের ২০২২ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৭০ সালে দেশের মোট জনসংখ্যার মাত্র ৫ শতাংশ বাস করতো শহরে, ২০২২ সালে এসে তা দাঁড়িয়েছে ৪০ শতাংশে।

বিশ্বব্যাংক ও ইউনিসেফের পরিসংখ্যান বলছে, ঢাকায় প্রায় ৫ হাজার বস্তিতে এই মুহূর্তে বসবাস করছে প্রায় ৪০ লাখ মানুষ। প্রতি বর্গ কিলোমিটারের হিসাবটা দেখতে কিছুটা অস্বাভাবিক লাগতে পারে—প্রায় ৫০ হাজার মানুষ।

এই জনগোষ্ঠীর প্রায় ৯০ শতাংশই পর্যাপ্ত স্যানিটেশন ও নিরাপদ পানির সুবিধা থেকে বঞ্চিত। প্রায় ৮০ শতাংশ পরিবারের বাসস্থান এককক্ষ বিশিষ্ট। ফলে সংক্রামক রোগের ঝুঁকি যেমন বাড়ে, তেমনি শিশুদের স্বাভাবিক বেড়ে ওঠাও বাধাগ্রস্ত হয়।

পুষ্টিহীনতা এখানে এক নীরব সংকট। বস্তিবাসীর অন্তত ৫২ শতাংশ খাদ্য-নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। শিশুদের প্রায় অর্ধেকই খর্বাকৃতির, যা তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশকে দীর্ঘমেয়াদে ব্যাহত করে।

সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকে নারীরা, বিশেষ করে সন্তানসম্ভবা মা ও কিশোরীরা। অথচ শহরে যেখানে ৫৩ শতাংশ নারী অন্তত চারবার প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মীর কাছ থেকে প্রসবপূর্ব সেবা পান, বস্তিতে এ হার নেমে আসে ৪০ শতাংশে।

এই বৈষম্য কেবলমাত্র পরিসংখ্যান নয়। এর পেছনে আছে অপুষ্টি, অনিরাপদ প্রসব ও নবজাতকের ঝুঁকিপূর্ণ জীবনের সূচনা। এ অবস্থায় বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন এক সমন্বিত পদ্ধতি। যেখানে পুষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা, সচেতনতা ও সামাজিক সহায়তা একসঙ্গে কাজ করবে।

সম্প্রতি ঢাকার বাউনিয়াবাঁধ এলাকায় বিজ্ঞানী মোস্তফা মাহফুজের নেতৃত্বে আইসিডিডিআর,বি-এর অ্যাডসার্চ প্রকল্পের আওতায় নিউট্রি-ক্যাপ শীর্ষক গবেষণায় একটি সমন্বিত পুষ্টি কর্মসূচির অভিজ্ঞতা এই দিকেই ইঙ্গিত দেয়। সন্তানসম্ভবা নারী-কিশোরী ও শিশুদের খাদ্য ও পুষ্টির জন্য বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ ও তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন কীভাবে হতে পারে, তা নিয়েই মূলত এই গবেষণা।

সন্তানসম্ভবা নারী, কিশোরী ও দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য একীভূত সেবা কাঠামোর মাধ্যমে সেখানে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে। নিয়মিত পুষ্টি পরামর্শ, আয়রন-ফলিক অ্যাসিড ও অন্যান্য মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট সরবরাহ, স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ এবং প্রসবপূর্ব সেবার মাধ্যমে মাতৃস্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটেছে।

প্রকল্পের প্রাথমিক ফলাফলে দেখা গেছে, সন্তানসম্ভবা নারী, কিশোরী ও দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি উন্নয়নে স্থানীয় জনগণ-নির্ভর একীভূত সেবা কাঠামো উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক পরিবর্তন আনে। অর্থাৎ প্রচলিত পুষ্টি কর্মসূচিগুলোতে স্থানীয়দের সম্পৃক্ত করা গেলে ভালো ফল পাওয়া যায়।

প্রকল্পটির  শুরুতে সন্তানসম্ভবা নারী, কিশোরী ও দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের উদ্দেশ্য করে একীভূত সেবা কাঠামো চালু করা হয়। আর স্থানীয়দের সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে বস্তিবাসীর কাছাকাছি থাকেন এবং তাদের ঘরে নিয়মিত যাতায়াত আছে কমিউনিটির এমন মানুষদের নিয়ে তৈরি হয় কাউন্সিলর বা পরামর্শক দল। মাসব্যাপী খাদ্য-পুষ্টি নিয়ে তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

পরবর্তীতে এই কাউন্সিলররা সন্তানসম্ভবা নারীদের বাড়ি গিয়ে পুষ্টি বিষয়ে নিয়মিত পরামর্শ দেন, সাধ্যের মধ্যে পুষ্টিসম্মত খাবারের ব্যাপারে সচেতনতা সৃষ্টি করেন, তাদের ওজন ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করেন।

এই কর্মসূচিতে বস্তির ৭২১ জন সন্তানসম্ভবা নারী, ৪ হাজার ২০০ কিশোরী ও দুই বছরের কম বয়সী প্রায় ২ হাজার ৫০০ শিশুকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত পরিবারগুলো নিয়ে বিশ্লেষণে উঠে আসে, প্রতিটা পরিবারের গড় আয় ২১ হাজার টাকা থাকা সত্ত্বেও প্রতি চারটি পরিবারের মধ্যে একটি পরিবার খাদ্য সংকটে ভুগেছে; সেখানে দরকারি পুষ্টি চাহিদা মেটানো বাহুল্য হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

পরবর্তীতে কর্মসূচির আওতায় থাকা সন্তানসম্ভবা নারীদের বাড়িতে গিয়ে প্রতি মাসে পুষ্টি বিষয়ক পরামর্শ দেন কাউন্সিলররা। সেইসঙ্গে তাদের শরীরে আয়রন, ফলিক এসিড, ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি-এর মতো পুষ্টি উপাদানের পরিমাণ পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। নিয়মিত তাদের ওজন, রক্তচাপ, হিমোগ্লোবিন ও রক্তে শর্করার পরিমাণ মাপা হয়। তাদের নিয়মিত প্রসব পূর্ব চেকআপ করাতে উৎসাহিত করা হয় ও যথাযথ বিশ্রামের কথা বলা হয়।

এর ইতিবাচক সাড়া হিসেবে কর্মসূচিভূক্ত নারীদের গড় ওজন বৃদ্ধি ছিল ৮ দশমিক ৯ কেজি এবং নিরাপদ প্রসব, হাসপাতালে সন্তান জন্মদানের হার বৃদ্ধি, গর্ভপাত হ্রাস, মৃতভ্রুণ ও নবজাতকের মৃত্যুহার কমে যায়। নির্ধারিত সময়ের আগেই গর্ভকালীন বয়সের তুলনায় কম ওজনের সন্তান জন্মের ঝুঁকি কমে গিয়েছে ১৬ শতাংশ।

কিশোরীদের ক্ষেত্রে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ গড়ে ১২ থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ১২ দশমিক ৮ গ্রাম/ডেসিলিটার হয়েছে। একপর্যায়ে দেখা যায়, খাদ্য-বৈচিত্র্য অপরিবর্তিত থাকলেও স্বাস্থ্য ও পুষ্টি নিয়ে তাদের সচেতনতা বেড়েছে।

শিশুদের স্বাস্থ্যেও আসে সুস্পষ্ট অগ্রগতি এবং তাদের উচ্চতা ও ওজনের উন্নতি ছাড়াও, হজম প্রক্রিয়া ও অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো হয়েছে।

পুষ্টি কর্মসূচির দৃশ্যমান শারীরিক অগ্রগতির পাশাপাশি অর্থনৈতিক সফলতাও পাওয়া গেছে। বিশেষ করে সন্তানসম্ভবা নারী ও শিশুদের ক্ষেত্রে ওষুধ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার খরচ কমেছে। এই মডেল প্রয়োগ ও বাস্তবায়িত হলে চিকিৎসা খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। তাই এটিকে পরীক্ষামূলক উদ্যোগ হিসেবে না রেখে বৃহত্তর পরিসরে সম্প্রসারণের কথা ভাবতে হবে।

নগর উন্নয়নের আলোচনায় বস্তিতে বসবাসরত এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে কোনোভাবেই উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। কারণ, এই জনগোষ্ঠী শহরের শ্রমশক্তির একটি বড় অংশ। তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি মানে পুরো শহরের ঝুঁকি, দেশের অগ্রগতি ও সমবৃদ্ধির অন্তরায়।

তাই এখনই সময়, বস্তিবাসীর জন্য পৃথক, লক্ষ্যভিত্তিক ও সমন্বিত পুষ্টি কর্মসূচি চালু ও বিস্তৃত করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার। স্বাস্থ্যসেবা কেবল হাসপাতালের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এই সেবা পৌঁছে দিতে হবে নগরের ছিন্নমূল মানুষদের কাছেও। সমন্বিত পুষ্টি কর্মসূচি সেই পথেরই একটা বাস্তবসম্মত ও কার্যকর সূচনা হতে পারে। তবেই পুষ্টি বৈষম্যের দিন শেষ হবে আর স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার পথে আমরা এগিয়ে যাব।

 

এএসএম রিয়াদ আরিফ, সিনিয়র কনটেন্ট ডেভেলপার; ফাহমিদা দিল ফারজানা, অ্যাসিস্ট্যান্ট সায়েন্টিস্ট; অনুভব চক্রবর্তী, কমিউনিকেশন স্পেশালিস্ট; ফুয়াদ আল ফিদাহ, রিসার্চ ইনভেস্টিগেটর, আইসিডিডিআর,বি