হামের প্রাদুর্ভাবের মধ্যেও নিউমোনিয়ায় শিশুমৃত্যুর হার বেশি
বাংলাদেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুর প্রধান কারণ এখনো নিউমোনিয়া এবং চলমান হামের প্রাদুর্ভাবের মধ্যেও নিউমোনিয়াতেই বেশি শিশু মারা যাচ্ছে।
বক্ষব্যাধি চিকিৎসকদের দুই সংগঠন লাং ফাউন্ডেশন এবং চেস্ট অ্যান্ড হার্ট অ্যাসোসিয়েশন আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বিশেষজ্ঞরা এমন পর্যবেক্ষণের কথা জানিয়েছেন।
আজ শুক্রবার রাজধানীর আবু সাঈদ ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে দুই সংগঠনের যৌথ আয়োজিত অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এভারকেয়ার হাসপাতালের সিনিয়র কনসালটেন্ট ড. জিয়াউল হক।
তিনি জানান, গত দুই মাসে দেশে ৫৪ হাজার ৪১৯ জন শিশু হাম আক্রান্ত হয়েছে বা হামের উপসর্গে ভুগছে। তবে, তাদের মধ্যে ৪৩৯ জন মারা গেছে।
'অর্থাৎ, হামে মৃত্যুর হার শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ। প্রায় ৯২ দশমিক ২ শতাংশ শিশু সুস্থ হয়ে উঠছে,' বলেন তিনি।
এই বিশেষজ্ঞ আরও জানান, দেশে প্রতি বছর নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে প্রায় ২৪ হাজার শিশু মারা যায়, যা প্রতিদিনের হিসাবে ৬০ জনের বেশি।
লাং ফাউন্ডেশনের সিনিয়র সহ-সভাপতি অধ্যাপক ড. রুহুল আমিন বলেন, গণমাধ্যমে হামজনিত কারণে প্রতিদিন ৭-৮ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। কিন্তু, এ সময়েও নিউমোনিয়ায় মারা যাওয়া শিশুর সংখ্যা এরচেয়ে অনেক বেশি।
তিনি বলেন, 'যদিও ৯৫-৯৯ শতাংশ হাম রোগী ৭-১০ দিনের মধ্যে সুস্থ হয়ে যায়। কিন্তু, বাকি ৫ শতাংশ শিশুর ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও মস্তিষ্ক সংক্রমণের মতো মারাত্মক জটিলতা দেখা দেয়।'
চলমান সংকট মোকাবিলায় দুই সংগঠন সরকারের কাছে ৪টি সুপারিশ উপস্থাপন করেছেন।
এগুলো হলো—অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চলমান হামের টিকাদান কর্মসূচি অব্যাহত রাখা, দ্রুত স্ক্রিনিং বা পরীক্ষার জন্য জেলা ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে 'জ্বর কর্নার' স্থাপন, স্বাস্থ্যকর্মীদের কাছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুমোদিত চিকিৎসা নির্দেশিকা বিতরণ করা ও দেশব্যাপী ব্যাপক গণসচেতনতা তৈরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গত ২ বছর টিকাদান কর্মসূচিতে ব্যাঘাত ঘটায় এবার এমন প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে।
উচ্চ মৃত্যুহারের জন্য তিনি পুষ্টিহীনতা, মায়ের বুকের দুধের পরিবর্তে প্যাকেটজাত দুধের ওপর নির্ভরতা ও অনিয়মিত ভিটামিন 'এ' ক্যাম্পেইনকে দায়ী করছেন তারা।
শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা বলেন, 'হাম শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে দুর্বল করে দেয়। এতে ব্যাকটেরিয়াজনিত নিউমোনিয়ায় মৃত্যুর ঝুঁকি তৈরি হয়।'
বর্তমানে শিশুদের শুধু বুকের দুধ খাওয়ানোর হার ৫৬ শতাংশে নেমে এসেছে, যার ফলে ৯ মাসের কম বয়সী শিশুরাও ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
লাং ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. আসিফ মুজতবা মাহমুদ অ্যান্টিবায়োটিকের বিষয়ে সতর্ক করেন। তিনি বলেন, 'চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজে নিজে ওষুধ খাওয়ার মাধ্যমে চিকিৎসার কার্যকারিতা নষ্ট হচ্ছে।'
এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা শিশুদের নিয়মিত টিকাদান নিশ্চিত করা, ভিটামিন 'এ' খাওয়ানো ও শিশুর শ্বাসকষ্ট বা শরীর নীল হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া পরামর্শ দিয়েছেন।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করে চেস্ট অ্যান্ড হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ড. গোলাম সারওয়ার বিদ্যুৎ।