ইতিহাসের আয়নায় আহমদ শরীফ: সত্য উচ্চারণে আপসহীন কণ্ঠস্বর

মোস্তফা মুশফিক
মোস্তফা মুশফিক

বাংলা ভাষায় একজন লেখক আছেন যিনি ১৯৬৫ সালে তার লেখা একটি প্রবন্ধে পূর্ব পাকিস্তানকে ‘বাংলাদেশ’ হিসেবে লিখেছেন। সেই একই প্রবন্ধে আবার ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ সংগীতও ছিল। নিজের সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা এই প্রাবন্ধিক হলেন, গত শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাঙালি চিন্তক আহমদ শরীফ।

বাংলা সাহিত্য ও বুদ্ধিবৃত্তির ইতিহাসে ড. আহমদ শরীফ এক বিরল ব্যক্তিত্ব। তিনি একাধারে মধ্যযুগের পাণ্ডিত্যপূর্ণ গবেষক, তীক্ষ্ণ সমাজ-সমালোচক এবং নিরলস মুক্তচিন্তার প্রবক্তা। আহমদ শরীফের রচনাবলী মাঝে ‘বাঙলার বিপ্লবী পটভূমি’ একটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এই বইটি কেবল ইতিহাসের বই নয়, এই বইটিকে বলা যায় একটি রাজনৈতিক-দার্শনিক জবানবন্দি। যেখানে লেখক অত্যন্ত সাহসী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বাংলার সামাজিক ও বৈপ্লবিক চেতনার শিকড় অনুসন্ধান করেছেন।

বইটি শুরু হয় ব্রিটিশ পর্ব দিয়ে, তারপর ধারাবাহিক তিন পর্বে বিভক্ত এবং সর্বশেষ পর্বটির নাম ‘বাঙলাদেশ পর্ব’। ইতিহাসের পাঠ যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে এই বইটিতে। প্রচলিত নানামাত্রিক রাজনৈতিক ইতিহাসে ভিন্ন বক্তব্য ও ব্যাখা এখানে পাওয়া যায়। তেমনই কয়েকটি বিষয় এখানে সংক্ষেপে আলোচনা করা যেতে পারে।

মুসলিম লীগের জনভিত্তি

আহমদ শরীফ লিখছেন, মুসলিম লীগকে এই উপমহাদেশে সমগ্র মুসলিম জনগোষ্ঠীর কন্ঠস্বর হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিল খোদ ব্রিটিশ সরকার। মাঠে মুসলিম লীগ ছিল জনবিচ্ছিন্ন। তার প্রমাণ মুসলিম লীগের সমগ্র রাজনৈতিক জীবনে ১৯৪৭ সালের একমাত্র বিজয়।

আহমদ শরীফ লিখছেন, ‘চৌধুরী রহমত আলী, কবি ইকবাল বা মুহম্মদ আলী জিন্নাহ মুসলিমদের জন্য পৃথক রাষ্ট্র কামনার মধ্যে ব্রিটিশের পরামর্শ ও প্ররোচনা ছিল কিনা জানি না, তবে ভেদনীতিনির্ভর কুট-কৌশল ব্রিটিশ সরকার প্রকাশ্যে মুসলিম লীগকে নিতান্ত অন্যায়-অযৌক্তিকভাবে  মুসলিমদের একমাত্র মুখপাত্র বা প্রতিনিধিত্বের অধিকারী বলে স্বীকৃতি দিয়ে কেবল যে নির্লজ্জ নির্বিবেক পক্ষপাতিত্ব দেখাল, তা নয়, রাজনীতির ধারাও গেল এত বদলে এবং অবাঞ্চিত পরিণামও করল তরান্বিত। অথচ বাঙলা-বিহার-উত্তর প্রদেশ ছাড়া ব্রিটিশ ভারতের কোথাও মুসলিম লীগের গণভিত্তি, প্রভাব বা জনপ্রিয়তা ছিলই না। ব্রিটিশ স্বীকৃতির ফলেই তথা পাকিস্তান প্রাপ্তির পরোক্ষ আশ্বাস ব্রিটিশ সরকারের কথায়-কর্মে-আচরণে আভাসিত হওয়ার ফলেই ১৯৪৬ সনের নির্বাচনে এবং ওই একবারই মুসলিম লীগ বিপুল ভোটে জয়ী হল বাঙলায় বিহারে উত্তর প্রদেশে পাঞ্জাবে ও সিন্ধে।’

একই সঙ্গে তিনি দেখিয়েছেন জিন্নাহ যে পাকিস্তানের স্বপ্ন দেখেছিলেন, পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের পর সেই আদর্শ থেকে তারা বিচ্যুত হয়েছিল।

‘এ জিন্নাহই গভর্নর জেনারেলরূপে প্রথম বক্তৃতাতেই সেক্যুলার রাষ্ট্র করে দিলেন পাকিস্তানকে, বললেন, রাষ্ট্রে সরকারের চোখে নাগরিক মাত্রই সমান। হিন্দু থাকবে না হিন্দু, মুসলিম থাকবে না মুসলিম, ধর্মবিশ্বাস হবে ব্যক্তিগত, সবাই পরিচিত হবে ‘পাকিস্তানী নাগরিক’ আখ্যায়।’

এরপরের লাইনে দেখা যায় ড. শরীফ পাকিস্তান রাষ্ট্র নিয়ে আফসোসের সুরে লিখছেন, ‘পাকিস্তান কথা রাখেনি, ইসলামী রাষ্ট্র হয়েছিল।’

হয়তো পাকিস্তান সৃষ্টির সময়ে দেশটির মূল স্বপ্নদ্রষ্টা যেভাবে ভেবেছিলেন, তা হতে বিচ্যুত হওয়াই দেশটির দুর্ভাগ্যের নিয়ামক। কারণ সৃষ্টির পর থেকে আজ পর্যন্ত পাকিস্তানে কোনো সরকার এখন পর্যন্ত পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ করতে পারেনি। সেই বিবেচনায় পাকিস্তান ভেঙে সৃষ্টি হওয়া বাংলাদেশ ভালো করেছে, শক্তিশালী গণতন্ত্র ও প্রশাসনে শক্ত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার মাপকাঠিতে আরও ভালো করেছে একই সঙ্গে ৪৭-এ ভাগ হওয়া ভারত।

ভারত নিয়ে গান্ধী ও রবীন্দ্রনাথ শঙ্কা

‘বাঙলার বিপ্লবী পটভূমি’ বইটিতে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের নায়ক মহাত্মা গান্ধী ও আধুনিক বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথের দুটো অদ্ভুত আশঙ্কা চোখে পড়ে। তারা দুইজনেই স্বাধীন ভারতের স্থায়ীত্ব ও বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন করেন। এক্ষেত্রে গান্ধী আরও নির্দিষ্টভাবে মুসলিমদের যোদ্ধা জাতি হওয়ার বিষয়টি নিয়ে এক ধরণের সতর্কতা দেখা যায়।

ভারতের চারপাশে মুসলিমদের রেখে হিন্দুদের স্বার্থের ওপর ভিত্তি করে ভারত রাষ্ট্র তৈরি করলে সেটি টিকবে কিনা তা নিয়েও ছিল শঙ্কা, ‘কেউ কেউ কদর্থ করে, তারা বলে গান্ধী মুসলিমদের যোদ্ধাজাতি বলে জানতেন ও মানতেন, ভারতীয় মুসলিমদের বাদ দিয়ে অতুষ্ট রেখে ভারত কেবল হিন্দুর দাবি-বিদ্রোহ-সংগ্রামে স্বাধীন করলে তাদের আহ্বানে মধ্য ও পশ্চিম এশিয়ার যোদ্ধা মুসলিমরা ভারত দখল করে নেবে পূর্বের মতোই—পরাক্রান্ত মারাঠার স্মৃতি জাগরূক থাকা সত্ত্বেও নাকি তাঁর মনে আশঙ্কা ছিল। তাঁর মুসলিম তোষণনীতির মূলে নাকি এ মনস্তত্ত্ব সক্রিয় ছিল। সত্য কি মিথ্যা জানি না। তবে রবীন্দ্রনাথের যে এমনি আশঙ্কা ছিল তা রম্যা রঁলার সাক্ষ্যে প্রমাণিত। রঁল্যার দিনলিপিতে [২৪.৬.১৯২৬ সন] পাই—“রবীন্দ্রনাথ” বিশ্বাস করেন না যে এই মুহূর্তে ভারতবর্ষের পক্ষে নিজেকে শাসন করা সম্ভব।—এ [ইংরেজ] যদি চলে যায়, ভারতে তার স্থান নেবে আফগান অথবা জাপানী শাসন।’

দেশভাগের দাঙ্গার বাস্তবিক ব্যাখা

আহমদ শরীফের লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, লেখার ধারা সম্পূর্ণ সরাসরি ধাঁচের। কোনো পাঠক যদি ড. শরীফের লেখার সঙ্গে পরিচিত না থাকেন, তাহলে তার লেখার এই ভঙ্গিটিকে বেশ নির্দয় মনে হতে পারে। কিন্তু তাতে কিছু করার নেই। ড. শরীফ যেটি সত্য মনে করেছেন, সেটি অকপটে বলছেন। তিনি দেখিয়েছেন দেশভাগের ফলে দাঙ্গা, হত্যাকাণ্ড, বিতাড়ণ-পলায়ন ছিল অবিসম্ভাবী। তিনি সরাসরি বলেছেন, মানুষের প্রবৃত্তিগত কারণে ও ইতিহাসের অমোঘ নিয়মেই এই ভয়াবহতা ঘটেছে।

তিনি লিখছেন, ‘কাজেই দ্বিজাতি তত্ত্বের রাজনীতিক স্বীকৃতির ভিত্তিতে বিভক্ত প্রাক্তন ব্রিটিশ ভারতে হিন্দু যদি অর্থ-সম্পদ-বিদ্যা-বুদ্ধি চাকরী নিয়ে পাকিস্তানের মুসলিমদের সঙ্গে নিরাপদে সহাবস্থান করে, মুসলিম যদি ধন-সম্পদ নিয়ে হিন্দুর নিঃশঙ্ক প্রতিবেশী থাকবে অর্থাৎ স্থিতাবস্থা থাকবে যদি, তা হলে ভারত বিভক্তি কেন? কাজেই প্রথম সুযোগেই জান-মাল-বৃত্তি-বিত্ত কাড়া শুরু হল। রক্তে রাঙা হল মাটি, সৃষ্টি হল নদী। মরল কয়েক লক্ষ, বৃত্তি-বিত্ত-বেসাত ও আত্মীয় হারাল কয়েক কোটি পরিবার। কাজেই ১৯৪৭ সনে হত্যাকাণ্ড ও বিতাড়ন-পলায়ন ছিল স্বাভাবিক এমনকি বাস্তবে আবশ্যিক। নইলে পাকিস্তানে হিন্দু জমিদার-মহাজন-উকিল-ডাক্তার বেণে-চাকুরে থেকে গেলে এবং পশ্চিমবঙ্গসহ গোটা উত্তর ভারতে মুসলিম জমিদার-চাকুরে প্রভৃতি বিত্তশালীরা থেকে গেলে স্বাধীনতার আশু ফল অর্থ-সম্পদ ও বৃত্তি-বেসাত লোভীরা কি পেত? কাজেই মানুষের প্রবৃত্তিগত কারণেই এবং ইতিহাসের অমোঘ নিয়মেই দাঙ্গায় হত্যায় বিধর্মী বিতাড়ন ঘটেছিল, অর্থ-সম্পদশালী বিত্তবান উনজন অধ্যুষিত অঞ্চলে, উত্তর ভারতে ও দুই বঙ্গে।’

বইটিতে বিশেষ সংযোজন হিসেবে আমজাদ হোসেনের লেখা ১৯৮৬ সালের ২৮ নভেম্বরের বিচিত্রা সংখ্যা থেকে ‘বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলন ১৯৪৮-৮৬, বিভক্তি ও ঐক্যের খতিয়ান’ নামে আক্ষরিক অর্থেই খতিয়ানের মতো করে সাজানো সমগ্র কমিউনিস্ট আন্দোলনের একটি সংযোজন আছে। আগ্রহী পাঠক এই খতিয়ানটি সংগ্রহে রাখার জন্যে হলেও বইটি সংগ্রহ করতে পারেন।

আহমদ শরীফের গদ্যকে অনেক পাঠকই বেশ কঠিন বলে পড়তে ভয় পান। তবে ড. শরীফের লেখার ধারাটিই এমন যে, কিছুদূর পড়তে পারলে লেখার সঙ্গে নিজের বোঝাপড়ার দারুণ একটা সংযোগ তৈরি হয় এবং বেশ সানন্দেই লেখার সাবলীলতা ও সরাসরি সত্য বলার চরিত্র পাঠককে আকৃষ্ট করে। ড. শরীফের লেখায় বেশ দীর্ঘ বাক্য পাওয়া যায়। তিনি হাইফেন ব্যবহার করে একই ধরণের একাধিক শব্দ এক সুতোয় গেঁথে ফেলেন। তার প্রবণতাটি লেখাকে বেশ প্রাঞ্জল করে, একই সঙ্গে মনে হয় এই কঠিন গদ্যের মাঝেও একটা সুর আছে।

যেমন, ‘তবু রক্তসংকর নিজিত বাঙালী কখনো বহির্বঙ্গীয় শাস্ত্র-সংস্কৃতি-দর্শনের কাছে পুরো আত্মসমর্পণ করেনি, তার স্বতন্ত্র চিন্তা-চেতনার, মনন-চিন্তনের সাক্ষ্য রয়েছে সাংখ্য-যোগ-তন্ত্র-মন্ত্র-তুক-তাক প্রভৃতিতে, বৌদ্ধমতের তান্ত্রিক বজ্রযানিক, সহজযানিক, মন্ত্রযানিক ও কালচক্রযানিক বিকৃতি-বিস্তারে ও দেহতত্ত্বে।’

একবার পড়ে হয়তো পাঠককে আবার দ্বিতীয়বার লাইনটিতে চোখ বুলাতে হয়। তবু লেখাটিতে যে সুর আছে তা একবার আত্মস্থ হলে পড়ে বেশ আনন্দেই পাবেন পাঠক।

‘বাঙলার বিপ্লবী পটভূমি’ বইটি প্রকাশ করেছে আগামী প্রকাশন। প্রথম প্রকাশ ১৯৯৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে। প্রচ্ছদ নিতান্তই সাধারণ, বইয়ের মূল শিরোনাম ছাড়া আর বিশেষ কিছু নেই। তবে বইটির মলাট পেরুলেই আছে অমূল্য রতন।

আজ ২৪ ফেব্রুয়ারি, আহমদ শরীফের ২৭ তম মৃত্যুদিবসে আগ্রহী পাঠককে এই বইটির মাধ্যমে তার চিন্তার জগতে আমন্ত্রণ জানালাম।