মৃত্যুর ১৪০ বছর

অক্ষয়কুমার দত্তকে জানা কেন জরুরি?

প্রশ্নহীন আনুগত্য নয়, বলতেন তিনি
ইমরান মাহফুজ
ইমরান মাহফুজ

বাংলা নবজাগরণের ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ আছেন, যারা কেবল নিজেদের সময়কে নয়, ভবিষ্যৎকেও ভাবতে শিখিয়েছিলেন। অক্ষয়কুমার দত্ত তাদেরই অন্যতম। 

অক্ষয়কুমার দত্ত শুধু একজন লেখক বা প্রাবন্ধিক ছিলেন না, ছিলেন যুক্তিবাদী মননের এক সাহসী নির্মাতা। এমন এক সময়ে তিনি মানুষকে প্রশ্ন করতে শিখিয়েছিলেন, যখন সমাজ অন্ধ বিশ্বাস ও কুসংস্কারের ঘোর অন্ধকারে ডুবে ছিল। তাই আজও তাকে জানা ও জানানো জরুরি।

এই চিন্তক বিশ্বাস করতেন, মানুষের মুক্তির পথ জ্ঞানের মধ্যেই নিহিত। ধর্ম, সমাজ কিংবা সংস্কার—কোনো কিছুকেই তিনি অন্ধভাবে মেনে নিতে বলেননি। তিনি চেয়েছিলেন মানুষ নিজের বুদ্ধি ও বিবেক দিয়ে সত্যকে যাচাই করুক। এই দৃষ্টিভঙ্গি তার সময়ের তুলনায় ছিল অনেক এগিয়ে। আজকের পৃথিবীতে যখন গুজব, বিভ্রান্তি ও অসহিষ্ণুতা নতুন রূপে ফিরে আসে, তখন অক্ষয়কুমার দত্তের চিন্তা আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।

তার জীবনদর্শনের কেন্দ্রে ছিল মানবকল্যাণ। তিনি মনে করতেন, মানুষের জীবনের আসল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত জ্ঞান অর্জন, নৈতিক উন্নতি এবং সমাজের উপকারে নিজেকে নিয়োজিত করা। ব্যক্তি মানুষ যদি কেবল নিজের সংকীর্ণ স্বার্থ নিয়ে বাঁচে, তবে সমাজ এগোয় না। এই ভাবনা আজও আমাদের জন্য শিক্ষণীয়। কারণ, আধুনিক জীবনে আমরা যত প্রযুক্তিনির্ভর হচ্ছি, ততই মানবিকতা ও আত্মজিজ্ঞাসা থেকে আমাদের দূরে সরে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

অক্ষয়কুমার দত্ত প্রকৃতিকে গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। তিনি মনে করতেন, প্রকৃতির নিয়ম বোঝার মধ্য দিয়েই মানুষ নিজের অবস্থান বুঝতে পারে। বিজ্ঞানমনস্কতা ছিল তার চিন্তার বড় ভিত্তি। বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চা ও জ্ঞানবিস্তারে তার অবদান অসাধারণ। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, মাতৃভাষাতেও গভীর জ্ঞানচর্চা সম্ভব। আজ যখন ভাষা ও জ্ঞানের সম্পর্ক নিয়ে নানা সংকট তৈরি হয়, তখন তার কাজ আমাদের নতুন করে আত্মবিশ্বাস জোগায়।

তার আরেকটি বড় শিক্ষা হলো আত্মসমালোচনার সাহস। সমাজের ভুল দেখেও নীরব থাকা তিনি সমর্থন করতেন না। সত্য উচ্চারণের জন্য তিনি বিরূপ সমালোচনার মুখোমুখি হলেও পিছিয়ে যাননি। এই সততা ও নৈতিক দৃঢ়তা তাকে অনন্য করে তুলেছে। বর্তমান সময়ে, যখন অনেকেই সুবিধাবাদী অবস্থানকে নিরাপদ মনে করেন, তখন অক্ষয়কুমার দত্তের জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—চিন্তার স্বাধীনতা ছাড়া প্রকৃত অগ্রগতি সম্ভব নয়।

অক্ষয়কুমার দত্তকে জানা মানে শুধু একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে স্মরণ করা নয়; বরং এমন এক জীবনদর্শনের মুখোমুখি হওয়া, যা মানুষকে মুক্ত ও সচেতন হতে শেখায়। তিনি আমাদের শেখান, প্রশ্নহীন আনুগত্য নয়, বরং যুক্তি, মানবিকতা ও জ্ঞানই সভ্যতার আসল শক্তি।

ভারতের বর্ধমান জেলায় নবদ্বীপের কাছে চুপী গ্রামে ১৮২০ সালের ১৫ জুলাই জন্মেছিলেন অক্ষয়কুমার দত্ত। ১৮৮৬ সালের আজকের দিনে তার মৃত্যু হয়।